ধর্মঘট উপেক্ষা করে সদরঘাটে চলছে লঞ্চ
Advertisement
কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:৫৬ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মজুর ভাতা বৃদ্ধিসহ ১১ দফা দাবিতে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকে শুক্রবার মধ্যরাত থেকে শুরু হয়েছে নৌযান ধর্মঘট। এতে দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো সদরঘাটেও যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে ধর্মঘট উপেক্ষা করে কয়েকটি রুটে কিছু সংখ্যক লঞ্চ চলাচল করছে। এদিকে ধর্মঘটকে অযৌক্তিক দাবি করে বাংলাদেশ লঞ্চ মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, শ্রমিকদের বেশিরভাগ দাবি ইতিমধ্যে পূরণ করা হয়েছে। নতুন করে এসব দাবির মাধ্যমে নৌযান সেক্টরকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত করছে নামধারী কিছু শ্রমিক নেতা। এরা নিজেরা শ্রমিক না হয়েও শ্রমিকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, মানুষকে জিম্মি করে ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের পায়তারা করছে।
শনিবার দুপুরে সদরঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ঘাটে সারিবদ্ধ করে বিভিন্ন রুটের লঞ্চগুলো বাঁধা রয়েছে। তবে যাত্রীদের চাপ অন্য দিনের তুলনায় কম। ধর্মঘটের কারণে লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন অনেক যাত্রী। এনিয়ে ভুক্তভোগী যাত্রীদের ক্ষোভও অনেক।
গাজীপুরের মাওনা থেকে স্বস্ত্রীক সদরঘাট টার্মিনালে এসেছেন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী মো. সোহাগ। তিনি রবিশাল গ্রামের বাড়িতে যাবেন। কিন্তু এখানে আসার পর জানতে পারেন ধর্মঘটের কথা। এব্যাপারে ক্ষোভ জানিয়ে সোহাগ বলেন, সকাল ৭টায় মাওনা থেকে রওনা হয়ে সদরঘাটে এসেছি। এখন শুনি লঞ্চ নাকি ছাড়বে না। তবে কিছু লঞ্চ চলছে। এজন্য বসে আছি। যদি রবিশালের লঞ্চ ছাড়ে তবে বাড়িতে যেতে পারবো। না হলে পুনরায় মাওনা (গাজীপুর) ফেরত যেতে হবে।
পটুয়াখালীর আইনজীবী নুরুল ইসলাম ঢাকায় এসেছেন আইনে একটি পরীক্ষা দিতে। শনিবার সদরঘাটে এসে তিনি জানতে পারেন লঞ্চ ছাড়বে না। এনিয়ে তার ক্ষোভের অন্ত নেই। নুরুল ইসলাম বলেন, পটুয়াখালী যাওয়াটা জরুরী। আদালতে তার মক্কেলের শুনানি আছে। কিন্তু ধর্মঘটের কারণে লঞ্চ ছাড়বে কিনা জানি না।
তিনি আরও বলেন, কোন নোটিশ ছাড়াই এরকম ধর্মঘটের কারণে জনদুর্ভোগ তৈরি হয়। এটা শ্রমিক নেতাদের মাথায় রাখা উচিত। দাবি আদায় করার জন্য তারা আলোচনায় বসতে পারেন। কিন্তু তা না করে কিছু হলেই ধর্মঘট ডেকে সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেয়ার মানে হয় না। আমরা যদি আগে জানতে পারতাম তাহলে ঘাটেই আসতাম না।
ধর্মঘটের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, বিভিন্ন সময় আমরা সরকার ও নৌযান মালিকদের কাছে বেশ কিছু দাবি দাওয়া পেশ করেছিলাম। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন সেগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। কিছু দাবি বাস্তবায়ন করা হলেও বেশিরভাগ দাবি এখনও পূরণ হয়নি। আমরা বার বার তাদের বলার পরও তারা কর্ণপাত করছে না। যে কারণে আমরা বাধ্য হয়ে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছি এবং শান্তিপূর্ণভাবে ধর্মঘট চলছে।
এদিকে ধর্মঘটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে শনিবার দুপুরে টার্মিনালে মিছিল করে ঘাট শ্রমিকরা। শতাধিক শ্রমিক এসময় ধর্মঘটকে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার দাবি করে বিভিন্ন শ্লোগান দেন। এবিষয়ে ঘাট শ্রমিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধায়ক মো. ফিরোজ বলেন, ধর্মঘটের কারণে ঘাটের শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে পড়ে। না খেয়ে তাদের জীবনযাপন করতে হয়। একারণে ঘাটের শ্রমিকরা ধর্মঘটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাছাড়া ধর্মঘটের কারণে যাত্রীদের দুর্ভোগ হয়, সরকারের রাজস্ব আদায় কম হয়, নৌযান মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এজন্য আমরা ধর্মঘটের পক্ষে নই। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চাই।
নদী বন্দরের ট্রাফিক পরিদর্শক হুমায়ূন কবির জানান, দেশের ৪১টি রুটে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ৮২টি লঞ্চ যাতায়াত করে। শনিবার দুপুর পর্যন্ত চাঁদপুর শরীয়তপুরসহ বিভিন্ন রুটে ২০টি লঞ্চ ছেড়ে গেছে। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৫৭টি লঞ্চ ঘাটে এসে ভিড়েছে।
বাংলাদেশ লঞ্চ মালিক সমিতির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান বাদল বলেন, দুইদিন পরপর বিভিন্ন সংগঠন নৌযান ধর্মঘট ডেকে বসে। এতে করে যাত্রীদের যেমন ভোগান্তি হয়, আমরাও বিব্রত হই। এবারের ধর্মঘটের বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। যে সংগঠন এই ধর্মঘট ডেকেছে তার সঙ্গে সাধারণ শ্রমিকরা সংযুক্ত নয়। নিজে শ্রমিক না হয়েও কিছু নামধারী শ্রমিক নেতা ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে শ্রমিকদের ব্যবহার করে, যাত্রীদের জিম্মি করে এই ধর্মঘট ডেকেছে।
লঞ্চ মালিক সমিতির সদস্য গাজী সালাউদ্দিন বাবু বলেন, যে সমস্ত দাবি নিয়ে বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশন নামের সংগঠনটি এই ধর্মঘট আহ্বান করেছে তাদের নেতৃস্থানীয় কেউই শ্রমিক নয়। তাছাড়া তারা যে সব দাবি কথা বলছে সেগুলোর বেশিরভাগই ইতিমধ্যে পূরণ করা হয়েছে।
এর আগে ২৭ নভেম্বর চারটি সংগঠন নৌযান ধর্মঘট এর ডাক দিলেও ওইদিন বিকালেই আবার তা প্রত্যাহার করা হয়। তবে ওই দিনের ধর্মঘটে নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের অংশগ্রহণ ছিল না। অন্যদিকে আজকের (শনিবার) ধর্মঘটে নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন ছাড়া অন্য সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ নেই। বরং শ্রমিকলীসহ অন্যান্য সংগঠনগুলো এবারের ধর্মঘটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
নৌযান শ্রমিকদের একটি অংশ বলছে, ইতিমধ্যে সরকার নৌযান মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে তাদের দাবি দাওয়া বিষয়ে ফলপ্রসু সমাধান হয়েছে। সরকার ও মালিকপক্ষ ৩ মাসের সময় নিয়েছে সব দাবি পূরণের প্রক্রিয়া হিসেবে। তাই এখনই আর কোন ধর্মঘটের প্রয়োজন ছিল না।
ঢাকা নদী বন্দরের নৌ নিরাপত্তা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, শ্রমিকদের একটি অংশ ধর্মঘটের কথা বন্দর এলাকায় ছড়িয়ে দিলেও বেশিরভাগ শ্রমিকরাই ধর্মঘটের বিপক্ষে। তবে বন্দর এলাকায় যেকোনো ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত রয়েছে।
সদরঘাট নৌ থানার ওসি রেজাউল কবির জানান, ধর্মঘটের কারণে যাত্রী সংখ্যা কিছুটা কম। তবে বেশিরভাগ লঞ্চই যাতায়াত করছে। টার্মিনাল এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
