Logo
Logo
×
   

Advertisement

সারাদেশ

গৃহহীনদের ঘর পাচ্ছেন স্বচ্ছলরা!

Advertisement

Icon

তাবারক হোসেন আজাদ, রায়পুর (লক্ষ্মীপুর)

প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২১, ১০:২৬ এএম

গৃহহীনদের ঘর পাচ্ছেন স্বচ্ছলরা!

ছবি: যুগান্তর

Advertisement

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর স্বচ্ছল পরিবারের লোকজন ও জনপ্রতিনিধিদের আত্মীয়-স্বজনরা পেয়েছেন বলে অভিযোগে জানা গেছে।

এছাড়া এ কাজে ইউপি সদস্যরা ঘর পাওয়া ২৫ জনের কাছ থেকে ৬-১০ হাজার টাকা করে নিয়েছেন। উপজেলা ভূমি অফিস দলিল রেজিস্ট্রি খরচ হিসেবে নিয়েছে ১২০০ টাকা।

শুধু তা-ই নয়; ঘর পাওয়াদের পরিবারের সদস্যদের দিয়ে বিনাপয়সায় মাটি কাটা ও মাটি ভরাটের কাজসহ শ্রমিক হিসেবেও খাটানো হচ্ছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রায়পুরের ২৫টিসহ জেলার ২০০ ঘর বরাদ্দের দলিল হস্তান্তর করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এজন্য ইতোমধ্যে স্থানীয় প্রশাসনও সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় এ ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে।

দক্ষিণ চরবংশি ইউনিয়নে ঘর বরাদ্দে অনিয়ম ও অর্থ-বাণিজ্যের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। চেয়ারম্যানের অনুসারীদের টাকার বিনিময়ে ভূমিহীন পরিবারের পরিবর্তে জমি-ঘর-বাড়ি আছে—এমন মানুষদের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

এ ইউনিয়নের দুলাল মেম্বারকে দিয়ে ঘর বরাদ্দ দেওয়া পরিবারগুলোর কাছ থেকে ৬-১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে।

ওই ইউনিয়নের ইউনুসের পোলের গোড়া নামক এলাকার আবদুর রহিম ভুঁইয়ার স্ত্রী লাকি বেগমকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ইউপি সদস্য লিটন গাইনের বোন হন লাকি বেগম।

তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ২০ শতাংশ জমিজুড়ে একটি টিনশেড ঘর ও বাগান রয়েছে। তার বাবারবাড়ি থেকেও সম্পদের ভাগ পেয়েছেন। স্বামী থাকে সোনাপুর ইউপির রাখালিয়া গ্রামে।

তালিকার নাম রয়েছে এ ইউনিয়নের কালু বেপারির হাট এলাকার মুনর্শিদা ও তার স্বজন আয়েশা বেগমের নাম, যারা সম্পর্কে আপন নানি ও নাতিন। তাদের উভয় পরিবারের বসতভিটায় টিনশেড ঘর রয়েছে। আবাদি জমি ও কর্মজীবী হওয়ায় তাদের পরিবারে সচ্ছলতা আছে। অথচ ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তাদের নামে।

কালু বেপারির হাট গ্রামের ইউপি সদস্য দুলালের বসতঘরের সামনে জয়নালের স্ত্রী তাজিয়া বেগম ও তার ২০০ গজ পাশেই মমিন তালুকদার। তারা দুজনের নামেও ঘর বরাদ্দ হয়েছে, যারা মূলত সচ্ছল এবং তাদের ঘর ও জমি রয়েছে।

আখনবাজার এলাকার লোকমান ফরাজি ও শুক্কর সর্দারের অবস্থাও একই। শুক্কর সর্দারের মেয়েই জানে না তাদের নামে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

ঘর বরাদ্দে অনিয়মের কারণে ক্ষুব্ধ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মারুফ বিন জাকারিয়াসহ ইউনিয়নের সদস্যরাও। তাদের অভিযোগ, ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রকৃত ভূমিহীনদের নামে ঘর বরাদ্দের কথা থাকলেও তা তারা জানেন না।

এ ব্যাপারে দক্ষিণ চরবংশি ইউপির আ.লীগের সহসভাপতি মনির হোসেন মোল্লা বলেন, ঘর বরাদ্দেই অনিয়ম হয়েছে। উপজেলা ভূমি অফিস ও ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বাররা টাকা নিয়ে ঘর বরাদ্দ দিয়েছেন। ইউনিয়নে খোঁজ নিলে এর সত্যতা পাওয়া যাবে।

দক্ষিণ চরবংশি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু সালেহ মিন্টু ফরাজি বলেন, অপ্রতুল বরাদ্দের কারণে নিম্নমানের কাজ হচ্ছে। মেঝে ও বারান্দায় মাটি ভরাটের জন্য বরাদ্দ পাওয়াদের কাছ থেকে ৬-১০ হাজার টাকা করে মেম্বারদের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে। নিজেদের ঘর হওয়ায় আবার অনেকেই বিনাপারিশ্রমিকে শ্রমিকের কাজ করছেন। রেজিস্ট্রির জন্য ভূমি অফিস ১২০০ টাকা নিয়েছে।

রায়পুরের ইউএনও সাবরিন চৌধুরি বলেন, ঘর বরাদ্দে কোনো অনিয়মের অভিযোগ আমার জানা নেই। এ নিয়ে কেউ অভিযোগও করেনি। অনিয়মের অভিযোগ যাচাই-বাছাই করা হবে। তালিকায় সচ্ছল ব্যক্তি থাকলে তাদের বাদ দিয়ে প্রকৃত গৃহহীনদের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগও তদন্ত করা হবে। এ ছাড়া বরাদ্দের অর্থে প্রতিটি ঘর নীতিমালা অনুযায়ী নির্মাণ করা হবে।

‘এসব ঘর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করার জন্য চেয়ারম্যানদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রড, সিমেন্ট, ইট, বালু উপজেলা কার্যালয়ের দায়িত্বে কিনে দেওয়া হয়েছে। এরপরও কোনো অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে তালিকা দেয়া যাবে না।’

এ ব্যাপারে উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মামুনুর রশিদ বলেন, ঘর বরাদ্দের অনুমোদন ও তালিকার বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। এসব ঘর বরাদ্দ অনেক আগেই হয়েছে। যেহেতু অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, সেহেতু ইউএনওকে তদন্তের জন্য বলা হবে। যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের মধ্যে ঘর বরাদ্দ এবং সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি খাস জমিতে প্রায় ৫০০ বর্গফুটের প্রতিটি বাড়িতে রয়েছে দুটি বেড রুম, একটি করে রান্না ঘর, ইউটিলিটি রুম, টয়লেট ও বারান্দা। দুর্যোগসহনীয় এসব ঘর হবে টেকসই এবং প্রতিটি ঘরেই থাকবে সোলার সিস্টেম আর বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থা।

প্রতিটি সেমিপাকা ঘরের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার টাকা। ইটের দেয়াল, কংক্রিটের মেঝে এবং রঙিন টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি সব বাড়ি সরকার নির্ধারিত একই নকশায় হচ্ছে।

শনিবার প্রথম ধাপের ঘর বরাদ্দের উদ্বোধন অনুষ্ঠানটির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলা সম্মেলন কক্ষে প্রেস ব্রিফিং করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অধীনে রায়পুর উপজেলার ‘যার জমি আছে, ঘর নেই’ তাদের জন্য ১১৫টি ঘর নির্মাণ বাবদ বরাদ্দ আসে। প্রতিটি ঘর নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় এক লাখ টাকা ৭০ হাজার টাকা।

যার মধ্যে প্রথম শ্রেণির ঘর পাবেন, যাদের জমি নেই ও ঘরও নেই তারা। উপজেলা কার্যালয় থেকে ইতোমধ্যে বরাদ্দের অর্থ তুলে গৃহ নির্মাণ সামগ্রী তৈরি শুরু করেন সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিরা।

Advertisement

লক্ষ্মীপুর গৃহহীন ঘর স্বচ্ছল

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম