ছবি : যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যশোরের অভয়নগর উপজেলার ডহর মশিয়াহাটি বাড়েদাপাড়া গ্রামে অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত ১৩টি পরিবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। আগুনে পুড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত প্রতিটি বাড়িতে চলছে বাড়িঘর সংস্কারের কাজ। বাড়ির মহিলারা ঘরের ভেতর থেকে পোড়া জিনিসপত্র বের করছেন। আবার কারো বাড়ির উঠানে মিস্ত্রিরা বাঁশ কাঠ দিয়ে ঘরের চালা নির্মাণ করছেন। কেউ বা ঘরের চালাতে উঠে বাঁশ কাঠ বসাচ্ছেন।
কোনো কোনো নারী রান্নাঘর না থাকায় উঠানে রান্নার উনুন তৈরি করছেন। সব
মিলিয়ে এতোদিন যেসব বাড়িতে পোড়া গন্ধের সঙ্গে নিস্তব্ধ ছিল, সেসব বাড়িতে নতুন কর্মযজ্ঞ
শুরু হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি মিস্ত্রিদের ঠুকঠাক শব্দে যেন নতুন করে জেগে
উঠছে বাড়েদাপাড়ার হিন্দুপল্লী।
মঙ্গলবার ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়ি পরিদর্শন করেছেন ঢাকার একটি নাগরিক প্রতিনিধিদল।
এ সময় তারা দোষীদের শাস্তি ও ক্ষতিগ্রস্তদের পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তার আহ্বান জানান।
জানা যায়, গত ২২ মে যশোরের অভয়নগর ডহর মশিয়াহাটী গ্রামের একটি বাড়িতে
উপজেলার পৌর কৃষক দলের সভাপতি তরিকুল ইসলামকে কুপিয়ে গুলি করে দুবৃর্ত্তরা। ঘেরের ইজারা
নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে গ্রামটির বাড়েদাপাড়ার পিল্টু বিশ্বাসের বাড়িতে ডেকে নিয়ে তাকে
হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ স্বজনদের। এ ঘটনার পর রাতে একদল লোক পিল্টু বিশ্বাসের প্রতিবেশীদের
১৮ বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। তার আগে চলে লুটপাট, ভাঙচুর ও মারধর। এ সময় আহত হন অন্তত
১০ জন।
নিহতের পরিবার ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা করেছেন। দুটি মামলায়
অন্তত ১১ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
আগুনে বাড়ি পুড়ে যাওয়ায় খোলা আকাশের নিচে মানবেবতর জীবনযাপন করেছেন পাড়ার
বাসিন্দারা। রাতে ঘুমানোর জায়গা না থাকায় এখনো পাড়ার সদস্যরা কেউ অর্ধপোড়া গোয়ালঘর
কিংবা মন্দিরে থাকছেন। এখনো বাড়িতে জ্বলেনি উনুন আর বিদ্যুতিক বাতি। এখন বাড়ি মেরামত
করে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা চলছে তাদের।
বাড়ির উঠানে মাটির উনুন তৈরি করছিলেন পান্না বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘ঘরের
সব কিছু পুড়েছে। মেয়ের স্বপ্ন ছিলো শিল্পী হবে। তার হারমনিয়াম, তবলাসহ সংগীতের যন্ত্রপাতি
পুড়ছে। তার সঙ্গে পুড়েছে আমাদের স্বপ্ন। বাড়িঘর ধান, চাল টাকা পয়সা সোনা দানা। মনে
পুড়া দাগ নিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছি। কি আর করা, তবে সরকারের কাছে দাবি,
এই হামলা যেন আর না হয়।’
বাড়েদাপাড়ার আরেক বাসিন্দা বর্ণালী বিশ্বাস বলেন, ‘গায়ের কাপড় ছাড়া কিচ্ছু
ছিলো না। ঝড় বৃষ্টিতে আধাপুড়া গোয়ালঘরে বা কারও বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। ১৩ দিন এভাবে
পরের বাড়িতে কেটে গেল। এখন নতুন করে ঘর মেরামতের কাজ শুরু করেছি। বছরের পর বছর সাজানো
সংসার পুড়ে গেছে। সেসব তো আর ফিরে পাবো না। আমরা এখন শান্তি চাই, বাঁচতে চাই।’
কপালটা একটু মুছে আবার বলতে লাগলেন, ‘যা গেছে তা গেছেই। ধান গেছে ৪০
মণ, দোকান ছিলো একটা, সেটাও পুড়েছে। গোয়ালঘর গেছে। বিছুলি ঘর গেছে। আমার সাতটি ঘর সাতটিই
পুড়েছে। এখন শুধু ছাই। সারা জীবন খেটে হাতে দিয়ে গেল এক মুঠো ছাই।’
এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত পাড়াটি পরিদর্শন করেছেন ঢাকার একটি নাগরিক প্রতিনিধিদল।
মঙ্গলবার দুপুরে আসা প্রতিনিধি দলে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা
বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, নারী
ঐক্য পরিষদের সভানেত্রী সুপ্রিয়া ভট্টাচার্য, মানবাধিকার কর্মী দীপায়ন খীসা, বাংলাদেশ
ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীল, অধিকারকর্মী ও আইপিনিউজের নির্বাহী সম্পাদক
সতেজ চাকমা। তারা আক্রান্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন। ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন পোড়া বাড়িঘর
পরিদর্শন ও ঘটনার দিনের বর্ণণা শোনেন।
নারী ঐক্য পরিষদের সভানেত্রী সুপ্রিয়া ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাংলাদেশের
বিগত ৫৩ বছরে সবসময় ক্ষমতাবান জনগোষ্ঠী সবসময় সংখ্যালঘুদের টার্গেট করেছে। ক্ষমতার
পালাবদলে কিংবা ক্ষমতা ও আধিপত্যের দ্বন্দ্বে ভুক্তভোগী হয় জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা।
আমরা আশা করবো আক্রান্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা, বিচার ও যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদানে প্রশাসন
যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।’
নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন, ‘আমরা দেখলাম যাদের
ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা এখন সর্বশান্ত। আমাদের পর্যবেক্ষণে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি
আমরা লক্ষ্য করলাম সে পরিমাণ ত্রাণ সহায়তা তারা পাচ্ছে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে
পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে সেটা খুবই নগণ্য৷ আমরা
আশা করি. প্রশাসন এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ
করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত
ফেরদৌস বলেন, ‘আমাদের মনে হয়েছে, এ হত্যাকাণ্ড ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব
নিয়ে। তবে এ হত্যাকাণ্ডকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য নিরীহ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের
ওপর অগ্নিসংযোগ ও বাড়িঘরে লুটপাট চালানো হয়েছে। দুটি ঘটনায় যারা সত্যিকারের আসামি তাদেরকে
ধরতে হবে। যাদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে, তারা নিরীহ। আগুনে মানুষের স্বপ্ন পুড়িয়ে
দেওয়া হয়েছে এখানে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে।’
ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর পরিদর্শনের পর হত্যাকাণ্ডের শিকার কৃষকদল নেতা তরিকুল
ইসলামের বাড়িতে যান নাগরিক প্রতিনিধি দল। সেখানে নিহতের ভাই এবং পরিবারের সদস্যদের
সঙ্গে কথা বলেন তারা।
