মহামারীর বিখ্যাত উপন্যাসগুলো আমাদের যা শেখায়

  মূল: ওরহান পামুক অনুবাদ: ডা. নাজিরুম মুবিন ১৫ মে ২০২০, ২১:২৪:১৬ | অনলাইন সংস্করণ

প্লেগ মহামারী নিয়ে লিখা সবচেয়ে বাস্তববাদী উপন্যাস ‘দ্যা বেট্রথেড’-এর অলংকরণ। ছবি: গেটি ইমেজ

গত চার বছর ধরে আমি ‘নাইটস অব প্লেগ’ নামে একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখছি। উপন্যাসটির পটভূমি ১৯০১ সালের তৃতীয় প্লেগ মহামারী। বুবোনিক প্লেগে সেবার এশিয়াতে লাখ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। সে তুলনায় ইউরোপে প্রাণহানির সংখ্যা ছিল কম। গত দুই মাস ধরে আমার বন্ধু, স্বজন, সাংবাদিক, সম্পাদক যারা নাইটস অব প্লেগের বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানেন, তারা মহামারী নিয়ে আমাকে একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছেন।

তাদের কৌতূহলের বিষয়বস্তু, অতীতের প্লেগ ও কলেরা মহামারীর সঙ্গে বর্তমানের করোনাভাইরাস মহামারীর সাদৃশ্য আছে কি না। হ্যাঁ, অনেক জায়গায় সাদৃশ্য আছে। ইতিহাস ও সাহিত্যের মহামারীগুলো একই রকম। এটা শুধু জীবাণু বা ভাইরাসের মিলের কারণে নয় বরং সব মহামারীর সম্মুখে আমাদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া সব সময় একই ছিল।

সব মহামারীর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল মহামারীকে অস্বীকার করা। প্রতিবারই জাতীয় এবং স্থানীয় সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নিতে দেরি করে। তথ্য উপাত্ত বিকৃত করে মহামারীর উপস্থিতিকেই নাকচ করে দেয়।

১৬৬৪ সালের প্লেগ মহামারী নিয়ে ড্যানিয়েল ডিফো লিখেন ‘এ জার্নাল অব দ্যা প্লেগ ইয়ার’। সংক্রমণ ও মানব আচরণের উপর সবচেয়ে ভালো সাহিত্যকর্ম বলা যায় এটিকে। বইটির শুরুর দিকে দেখা যায়, কীভাবে লন্ডনের আশপাশের এলাকার কর্তৃপক্ষ প্লেগের কারণে মৃতের সংখ্যা কমিয়ে দেখানোর জন্য মৃত্যুর কারণ হিসেবে নতুন নতুন রোগ আবিষ্কার করে ফেলে।

১৮২৭ সালে প্রকাশিত আলেসান্দ্রো মানজোনির ‘দ্যা বেট্রথেড’ খুব সম্ভবত প্লেগ মহামারী নিয়ে লিখা সবচাইতে বাস্তববাদী উপন্যাস। এই ইতালীয় লেখক ১৬৩০ সালের প্লেগ মহামারীর সময় মিলান কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে স্থানীয় জনগণের ক্ষোভকে তুলে ধরেছেন। তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মিলানের গভর্নর মহামারীর ভয়াবহতাকে আমলেই নেয়নি। এমনকি স্থানীয় রাজপুত্রের জন্মদিনের অনুষ্ঠানও বাতিল করেননি। মানজোনি দেখিয়েছিলেন, মহামারী মোকাবেলায় আরোপিত বিধি-নিষেধগুলো অপ্রতুল ছিল, যাইবা ছিল তার বাস্তবায়নেও ছিল ঢিলেঢালা ভাব, আর জনগণও এগুলোকে পাত্তা দেয়নি। তাই মহামারীটি খুব দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছিল।

মহামারীর উপর রচিত বেশির ভাগ সাহিত্যকর্মে জনরোষের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের উদাসীনতা, অযোগ্যতা ও স্বার্থপরতা। তবে ডিফো এবং কামুর মতো শক্তিমান লেখকরা এর বাইরে অন্য কিছুর সঙ্গে পাঠকের দেখা করিয়ে দিয়েছিলেন। মানব সত্ত্বার অন্তর্নিহিত এক দিকের সঙ্গে

ডিফোর উপন্যাস আমাদের দেখায়, জনগণের অন্তহীন প্রতিবাদ এবং সীমাহীন আক্রোশের পিছনে আরো কিছু ক্ষোভের জায়গা আছে। সব মৃত্যু যন্ত্রণা দেখে ও সমবেদনা জানাতে জানাতে সাধারণ জনগণের নিজের ভাগ্যের প্রতি তথা ঐশ্বরিক ইচ্ছার প্রতি এক ধরণের ক্ষোভের জন্ম হয়, তা থেকে সংগঠিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিও ক্ষোভ তৈরি হয়; যারা এই সংকট মোকাবেলায় কী করবে এ ব্যাপারে কোন কার্যকরী দিক নির্দেশনা দিতে পারে না।

মহামারীর সময় আরেকটি সার্বজনীন প্রতিক্রিয়া হলো গুজব এবং ভুল তথ্য ছড়ানো। অতীতের মহামারীগুলোতে গুজব ছড়িয়েছে কারণ তখন সঠিক তথ্য পাওয়া ও সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখতে পারাটা ছিল অসম্ভব।

ডিফো এবং মানজোনি দুজনেই লিখেছেন, মহামারীর সময় মানুষজন রাস্তায় একে অপরের সঙ্গে দেখা করার সময় নিজেদের মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখতো, তবে তারা অন্য শহর ও আশেপাশের এলাকার পরিস্থিতি কী তা জানতে চাইতো। এই ছোট ছোট তথ্য জোড়া লাগিয়ে তারা মহামারীর সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে আন্দাজ করতো। কোথায় নিরাপদ আশ্রয় পাওয়া যাবে তা জানার এটাই ছিল একমাত্র উপায়।

যখন সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন বা ইন্টারনেট কিছুই ছিল না, যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক ছিল নিরক্ষর, তখন কল্পনাশক্তিই ছিল একমাত্র সম্বল। যার দ্বারা বিপদটি কোথায় আছে, তার তীব্রতা কতটুকু এবং তার দ্বারা কতটা দুর্ভোগ হতে পারে সে সম্পর্কে আঁচ করতো তারা। কল্পনার ওপর এই নির্ভরতা প্রতিটি ব্যক্তির ভয়কে নিজস্ব স্বর দেয়। স্থানীকতা, আধ্যাত্মিকতা এবং পৌরাণিকতার মিশেলে সেই স্বরে সুর আসে।

মহামারীর সময় সবচেয়ে প্রচলিত দুটি গুজব হলো, কে এই রোগটি এনেছে এবং কোথা থেকে এই রোগটি এসেছে। মার্চের মাঝামাঝিতে যখন তুরস্কে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, তখন ইস্তাম্বুলে আমার প্রতিবেশী এবং সিহাঙ্গিরে আমার ব্যাংকের ম্যানেজার বিজ্ঞের মতো আমাকে বলেছিলেন যে ‘এই জিনিসটি’ আমেরিকা এবং বাকি বিশ্বের বিরুদ্ধে চীনের অর্থনৈতিক প্রতিশোধ।

বাকি সব অশুভ শক্তির মতো মহামারীকে সব সময় বহিরাগত হিসাবে চিহ্নিত করা হয়।

মনে করা হয়, প্রথমে এটা অন্য কোথাও আঘাত হেনেছিল এবং তারা সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি তাই আমার এলাকা আক্রান্ত হয়েছে। যেমন, অ্যাথেন্সে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার বিবরণের শুরুতে থুসিডিডিস লিখেন, এই মহামারী ইথিওপিয়া এবং মিসরের মতো অনেক দূরের দেশে প্রথম শুরু হয়েছিল।

মানব কল্পনায় মহামারী সব সময় বাইরের দেশ থেকে আসে। কেউ কোন অসৎ উদ্দেশ্যে এটি ছড়ায়। তাই মহামারীর উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত গুজবগুলো সবচাইতে বেশি জনপ্রিয়তা পায়।

‘দ্যা বিট্রথেড'-এ মানজোনি এমন এক অশুভ চরিত্র তুলে ধরেছেন, যা মধ্যযুগ থেকে প্রতিটি মহামারীতে মানুষের কল্পনায় একটি জায়গা দখল করে নিয়েছিল। প্রতিদিনই সেই রাক্ষুসের কথা শোনা যেত। সে রাতের অন্ধকারে কালো জীবাণুযুক্ত তরল দিয়ে দরজার হাতল আর পানির ফোয়ারা দূষিত করে দিয়ে যেত। কিংবা শোনা যেত এক ক্লান্ত বৃদ্ধের কথা, যিনি গির্জার মেঝেতে বসে বিশ্রাম নিতেন। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া কোন নারী অভিযোগ করত যে বৃদ্ধ রোগ ছড়িয়ে দিতে তার জামাটাকে সবকিছুতে ঘষে দিচ্ছে। মুহূর্তে জড়ো হয়ে যেত মারমুখী জনতা।

রেনেসাঁর পর থেকে মহামারীর বর্ণনায় সহিংসতা, জনশ্রুতি, আতঙ্ক এবং বিদ্রোহের এই অপ্রত্যাশিত এবং নিয়ন্ত্রণহীন বিস্ফোরণ চোখে পড়ে। মার্কাস অরিলিয়াস রোমান সাম্রাজ্যের খ্রিস্টানদের দোষারোপ করেছিলেন গুটি বসন্তের অ্যান্তোনিন মহামারীর জন্য, কারণ তারা রোমান দেবদেবীদের পূজার জন্য আয়োজিত আচার-অনুষ্ঠানে যোগ দেয়নি। আবার ঠিক পরের মহামারীর সময় অটোমান সাম্রাজ্য এবং খ্রিস্টান ইউরোপ উভয় পক্ষই ইহুদিদের বিরুদ্ধে কুয়ার পানি দূষিত করার অভিযোগ এনেছিল।

মহামারীর ইতিহাস ও সাহিত্যে আমরা দেখি, আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর ক্রোধ ও রাজনৈতিক অসন্তোষের গভীরতা নির্ধারিত হয় তাদের অনুভূত মৃত্যুর ভয় ও দুর্ভোগের তীব্রতা কতটুকু তার ওপর।

সেই পুরনো মহামারীগুলোর মতো এবারের করোনভাইরাস মহামারীতেও ভিত্তিহীন গুজব জায়গা করে নিয়েছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও আঞ্চলিক পরিচয়নির্ভর অভিযোগগুলি ঘটনাপ্রবাহের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। ডানপন্থী পপুলিস্ট প্রচারমাধ্যমগুলো মিথ্যাকে ফুলে ফেঁপে প্রচার করছে আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়ছে।

সলোমন ইগল, একজন কোয়াকার যিনি ১৬৬৫ সালের লন্ডনের প্লেগের সময় খারাপ দিনের ভবিষ্যদ্বাণী করছিলেন। গির্জার সামনে গণকবরে মৃতদেহ ফেলা হচ্ছে। ড্যানিয়েল ডিফোর ‘এ জার্নাল অব দ্যা প্লেগ ইয়ার’ থেকে নেয়া। ছবি: গেটি ইমেজ

বিস্তারিত নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার সুযোগ এখন আমাদের আছে, এটা কিন্তু আগের কোন মহামারীতে ছিল না। তাই যে ভয় এখন আমরা অনুভব করছি তা একদমই আলাদা। গুজবের কারণে নয় বরং সঠিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই আজ আমরা ভীতসন্ত্রস্ত।

যখন আমরা মানচিত্রের লালদাগগুলোকে প্রতিনিয়ত বাড়তে দেখি তখন আমরা বুঝতে পারি যে পালানোর আর কোনো জায়গা নেই। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির কথা ভেবে আতঙ্কিত হওয়ার জন্য এখন আমাদের কল্পনাশক্তি ব্যবহার না করলেও চলে। আমরা ভিডিওতে দেখছি ইতালির ছোট ছোট শহর থেকে বড় কালো সামরিক ট্রাকগুলো মৃতদেহ বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। এ যেন আমাদের নিজেদেরই শবযাত্রা।

যে ভয় আমরা এখন অনুভব করছি তা সব কল্পনা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্রকে এক পাশে ঠেলে দিয়ে আমাদের ভঙ্গুর জীবন এবং মানবতার অপ্রত্যাশিত অভিন্নতাকে ফুটিয়ে তুলছে। মৃত্যুচিন্তার মতো ভয় আমাদের একাকী করে তোলে, তবে আমরা সকলেই যখন একইরকম যন্ত্রণার মুখোমুখি হচ্ছি তখন এই উপলব্ধি আমাদের একাকীত্বকে ঘুচিয়ে দেয়।

থাইল্যান্ড থেকে নিউইয়র্ক গোটা মানব সমাজ আজ একই রকম বিষয়ে উদ্বিগ্ন – কোথায়, কখন মাস্ক ব্যবহার করতে হবে, মুদি দোকান থেকে আনা খাদ্যদ্রব্য কীভাবে নিরাপদে ব্যবহার করতে পারি, নিজ উদ্যোগে কোয়ারেন্টাইনে যাবো কি না। এই চিন্তাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা একা নই। আমরা আর ভীত হই না বরং নিজেদের আবিষ্কার করি পারস্পারিক বোঝাপড়ার জন্য প্রস্তুত অবস্থায়।

টিভি পর্দায় যখন বিশ্বের বড় বড় হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষমাণ মানুষদের দেখি তখন বুঝতে পারি আমার এই ভীতি শুধু আমার একার না, এটি সারা বিশ্ব মানবতার, তখন আমি আর একা অনুভব করি না। ভয় পাওয়ার জন্য আমার লজ্জাবোধও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে বরং এটিকে একটি সঠিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখতে পাই। মহামারী নিয়ে সেই প্রবাদটি আমার মনে পড়ে যায়, ‘যারা ভয় পায় তারাই বেঁচে যায়’।

অবশেষে আমি বুঝতে পারি যে ভয় বা আতঙ্ক আমার মধ্যে এবং সম্ভবত আমাদের সকলের মধ্যে দুটি স্বতন্ত্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কখনও কখনও এটি আমাকে অন্তর্মুখি করে তোলে, একাকীত্ব এবং নীরবতার দিকে টেনে নিয়ে যায়। তবে অন্য সময় এটি আমাকে নম্র হতে এবং সংহতি অনুশীলন করতে শেখায়।

আমি মহামারী নিয়ে একটি উপন্যাস লেখার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম আজ থেকে ৩০ বছর পূর্বে। সেই সময় আমার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল মৃত্যুভয়। ১৫৬১ সালে সুলাইমান দ্যা ম্যাগনিফিসেন্ট (সুলতাল সুলেমান) এর শাসনামলে ওজিয়ার গিসিলিন ডি বুসবেক ছিলেন অটোমান সাম্রাজ্যে হ্যাপসবার্গ সাম্রাজ্যের দূত। তিনি মহামারী থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ইস্তাম্বুল থেকে ছয় ঘন্টা দূরে প্রিনকিপো দ্বীপে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এটি ইস্তাম্বুলের দক্ষিণ-পূর্বে মর্মর সাগরে অবস্থিত দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে সবেচেয়ে বড় দ্বীপ। ইস্তাম্বুলের ঢিলেঢালা কোয়ারেন্টাইন আইনের কথা ওজিয়ার লিখেছিলেন। তিনি আরো লিখেন, তুর্কিরা তাদের ধর্ম ইসলামের কারণেই ‘অদৃষ্টবাদী’।

দেড়শ বছর পর প্রাজ্ঞ ডিফোও তার লন্ডন প্লেগ বিষয়ক উপন্যাসে লিখেন, তুর্কি ও মোহামেডানরা অদৃষ্টবাদ প্রচার করছে, তারা বলছে প্রতিটি মানুষের শেষ পরিণতি পূর্ব নির্ধারিত। মহামারী নিয়ে আমার উপন্যাসটি ধর্মনিরপেক্ষতা ও আধুনিকতার প্রেক্ষাপটে ‘অদৃষ্টবাদী’ মুসলিম নিয়ে ভাবতে সাহায্য করবে।

যে কারণেই হোক অটোমান সাম্রাজ্যে খ্রিস্টানদের তুলনায় মুসলমানদের কোয়ারেন্টাইনের নিয়ম মানাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। অর্থনৈতিক কারণে দোকানদার বা গ্রামীণ জনগোষ্ঠী কোয়ারেন্টাইন মানতে চাইতো না, তারা যে ধর্মেরই হোক না কেন। আবার মুসলমান মহিলাদের পর্দাপ্রথা ও পারিবারিক গোপনীয়তার প্রশ্নে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠতো। উনিশ শতকের শুরুর দিকে যখন বেশিরভাগ ডাক্তার ছিল খ্রিস্টান এমনকি অটোমান সাম্রাজ্যেও ছিল একই চিত্র তখন মুসলিম সম্প্রদায়গুলো ‘মুসলিম ডাক্তার’ এর দাবি জানিয়েছিল।

১৮৫০ সালের পর থেকে স্টিমবোটে ভ্রমণ সস্তা হয়ে গেলে মুসলমানদের পুণ্যভূমি মক্কা মদিনাগামী হজযাত্রীরা বিশ্ব জুড়ে সংক্রামক ব্যাধির ধারক ও বাহকে পরিণত হয়। হজযাত্রীদের আসা-যাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে ব্রিটিশরা মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় বিশ্বের প্রথম একটি কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্র স্থাপন করেন।

এই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর ফলে কিছু বদ্ধমূল ধারণা ছড়িয়ে যায় যে মুসলিমরা এবং এশিয়ানরা সব সংক্রামক রোগের ধারক ও বাহক।

সাহিত্যও সেই একই ধারা অনুসরণ করে। ফিওদর দস্তয়ভস্কি তার 'ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট' উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র রাসবনিকভের দুঃস্বপ্নের বর্ণনায় লিখেছেন, “সে স্বপ্নে দেখল পুরো পৃথিবী নতুন এক মহামারীতে আক্রান্ত, যা এশিয়ার গহিন থেকে এসে ইউরোপকে আক্রান্ত করেছে।”

১৭ ও ১৮ শতকের মানচিত্রসমূহে অটোমান সাম্রাজ্যের সীমানাকে বিবেচনা করা হতো পাশ্চাত্যের ওপাশে বাকি পৃথিবীর শুরু হিসেবে। দানিয়ুব নদী দ্বারা এটিকে চিহ্নিত করা হতো। কিন্তু মহামারী প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক ও নৃ-তাত্ত্বিক সীমারেখা টেনে দিয়েছিল। কারণ দানিয়ুবের পূর্ব পাশেই মহামারী আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল বেশি। সব মিলিয়ে এই ধারণা জোরদার হয় যে, অদৃষ্টবাদ প্রাচ্য এবং এশীয় সংস্কৃতির একটি সহজাত বৈশিষ্ট্য। তখন আরো একটি ভ্রান্ত ধারণা জায়গা করে নেয় যে প্লেগ ও অন্যান্য মহামারী সব সময় প্রাচ্যের কোনো অন্ধকার স্থান থেকে আসে।

অসংখ্য ঐতিহাসিক বিবরণে দেখা যায়, বড় বড় মহামারী চলাকালীন সময়ে ইস্তাম্বুলের মসজিদে জানাজার নামাজ হয়েছে, শোক সন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে তারা বাড়ি বাড়ি যেত, অশ্রুসজল চোখে একে অপরকে আলিঙ্গন করতো। রোগটি কোথা থেকে এলো, কীভাবে ছড়াচ্ছে এসবের চেয়ে তারা চিন্তিত ছিল পরবর্তী জানাজা ও দাফনের আয়োজন সঠিকভাবে হচ্ছে কি না তা নিয়ে।

অথচ এবারের করোনাভাইরাস মহামারীতে তুরস্ক সরকার একটি সেক্যুলার পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। যারা এই রোগে মারা গিয়েছে তাদের জানাজায় জনসমাগম নিষিদ্ধ করেছে। আবার শুক্রবারে মসজিদে জুমার নামাজও নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু তুর্কিরা এর বিরোধিতা করেনি। আমাদের ভয় যতটা বড় হয় আমাদের সহনশীলতা ও বিবেচনাবোধও তার সঙ্গে বাড়ে।

এই মহামারীতে আমাদের যে নম্রতা ও সংহতির অনুভূতি জেগে উঠেছে, মহামারী শেষে একটি সুন্দর পৃথিবীর জন্য সেই অনুভূতিকেই আঁকড়ে ধরতে হবে, লালন করতে হবে।

[ওরহান পামুক ২০০৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। মূল নিবন্ধটি টার্কিশ ভাষায় লেখা। মূল থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন একিন ওকলাপ। প্রকাশিত হয়েছে দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমসে ২৩ এপ্রিল, ২০২০ তারিখে। বাংলা অনুবাদটি ইংরেজি থেকে ভাষান্তর করা]

ভাষান্তর: ডা. নাজিরুম মুবিন

চিকিৎসক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত