Logo
Logo
×
   

Advertisement

ডাক্তার আছেন

বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ‘এএসডি আক্রান্ত’ শিশুদের ঘুমের সমস্যা

Advertisement

Icon

ডা. সেলিনা সুলতানা

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৬ পিএম

বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ‘এএসডি আক্রান্ত’ শিশুদের ঘুমের সমস্যা

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

এএসডি (অটিজম স্পেক্ট্রাম ডিজঅর্ডার) আক্রান্ত শিশুদের ঘুমের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই চলমান ও দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের ব্যাঘাত শিশু, তার বাবা-মা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। অটিজম শিশুদের মধ্যে কিছু সমস্যা থাকে, যা নিয়ে বাবা মায়েরা সবসময় চিন্তিত থাকেন। সাধারণ শিশুদের তুলনায় ভাষার ও যোগাযোগ দক্ষতা, আচরণগত দিক দিয়ে আলাদা হয় অটিজম আক্রান্ত শিশুরা। বিশেষত, অটিস্টিক শিশুদের অন্যান্য বাচ্চাদের তুলনায় বেশি যত্ন ও ভালবাসার প্রয়োজন হয়। অনেক সমস্যার মধ্যে অন্যতম হল এই ঘুমের সমস্যা, যার মধ্যে রয়েছে ঘুম না আসা, দুঃস্বপ্নের কারণে ঘন ঘন জেগে ওঠা, বিছানায় প্রস্রাব করে ফেলা, নাক ডাকা, অস্থিরতা বা ভালোভাবে ঘুম না হওয়া, ঘুমের রুটিন ঠিক না থাকা এবং ঘুমের জন্য কম  সময় পাওয়া।

এএসডিতে ঘুমের সমস্যাগুলো মায়ের বর্ধিত মানসিক চাপ এবং পিতামাতার ঘুমের ব্যাঘাতের ঘটায়। এসময় শিশুদের মধ্যে ঘুমের  সমস্যার কারণে কেবল শিশুর জীবনযাত্রার মান এবং দিনের বেলার কার্যকলাপের উপরই নয়, পরিবারের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যার ফলে মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়। এটি শিশুদের দিনের বেলায় আরও সমস্যাজনক আচরণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার উপর প্রভাব ফেলে।

অটিস্টিক শিশুদের ঘুমের সমস্যা খুবই সাধারণ— যার মধ্যে রয়েছে

> বিকাশগত দুর্বলতা,

> মেলাটোনিন, একটি পিনিয়াল হরমোন যা সার্কাডিয়ান রিদম নিয়ন্ত্রণ করে বা শরীরকে ঘুমের সময় বলে দেয়। একটি গবেষণায়, এক থেকে তিন বছর বয়সী  ২৪ জন এএসডি শিশুকে ১ মিলিগ্রাম বা ৩ মিলিগ্রাম মেলাটোনিন দিয়ে চিকিৎসা করার পর অ্যাকটিগ্রাফি দ্বারা পরিমাপ করা ঘুমের বিলম্বের উন্নতি দেখা গেছে। এই চিকিৎসা শুধুমাত্র শিশুদের ঘুমের ধরণেরই উন্নতি দেখায়নি বরং তাদের আচরণ এবং পিতামাতার মানসিক চাপও কমিয়েছে।

অন্য একটি গবেষণায়, ১০৭জন এএসডি শিশুকে ( দুই থেকে আঠারো বছর)  ০.৭৫ - ৬ মিলিগ্রাম মেলাটোনিন দেওয়ার পর ২৫% পিতামাতার ঘুমের সমস্যা দূর হয়েছিল, ৬০% ঘুমের উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন, ১৩%এর ঘুম একটি বড় সমস্যা হিসাবে রয়ে গেছে, ১%এর মেলাটোনিন শুরু করার পর ঘুমের অবনতি হয়েছে এবং  ১%এর প্রতিক্রিয়া নির্ধারণ করতে পারেনি। (সংগৃহীত)

> ঘুমের সমস্যা হওয়ার কারণের মধ্যে অটিজমের জেনেটিক কারণগুলো শিশুর ঘুমিয়ে পড়ার, ঘুমিয়ে থাকার এবং সতেজ হয়ে ওঠার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে।

> অনেক সময় অটিজম আক্রান্ত বেশিরভাগ শিশুর বাইরের উদ্দীপনার প্রতি সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ঘুমাতে অসুবিধা হয়, যেমন স্পর্শ,আলো বা শব্দ, যার জন্য ঘুমটা ঠিকমত হয় না।

> প্ররোচনাকারী  কারণসমূহ বা মোটিভেটিং ফ্যাক্টর (যেমন— শারীরিক অসুস্থতা বা ঔষধের সূত্রপাত; ঘুমের অনিয়ম)।

দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবকসমূহ বা লং লাস্টিং এফেক্টস (যেমন— দিনের বেলা ঘুমানো, শিশুর সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমানো এবং অভিভাবকত্বের আচরণ)। ঘুমের একটি লগ বা ডায়েরি রাখলে তা ঘুমের সমস্যার সম্ভাব্য কারণগুলো নির্ধারণে সাহায্য করতে পারে। তারা অন্যদের মতো ‘ক্লান্ত বোধ’ করতে পারে না, অথবা তারা হয়তো জানে না যে কীভাবে এই অনুভূতির উপর কাজ করতে হয় (যেমন— শুয়ে থাকা, চোখ বন্ধ করা)।

> সহ-ঘটনাজনিত অবস্থা বা কো অকারিং কন্ডিশনস যেমন— এডিএইচডি, উদ্বেগ, মৃগীরোগ, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা (রিফ্লাক্স বা কোষ্ঠকাঠিন্য), অথবা ব্যথা ঘুমের উপর প্রভাব ফেলতে পারে— এবং এর মধ্যে অনেকগুলো অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

উদাহরণস্বরূপ— কোষ্ঠকাঠিন্য বা রিফ্লাক্স ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে যদিও আপনার শিশু এটি ব্যাখ্যা করতে পারে না। অন্ত্রের স্বাস্থ্যের খারাপ অবস্থাও খারাপ ঘুমের সাথে যুক্ত।

> খাদ্যাভ্যাস এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য

কিছু শিশু চিনি, রঞ্জক পদার্থ বা নির্দিষ্ট খাবারের (যেমন— দুগ্ধজাত পণ্য বা গ্লুটেন) প্রতি সংবেদনশীল, যা তাদের আচরণ এবং ঘুমকে প্রভাবিত করতে পারে।

> তাদের সময়সূচিতে যে কোনো বিঘ্ন অত্যন্ত বিরক্তিকর হতে পারে এবং তাদের ঘুমকে প্রভাবিত করার জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এ সব কারণের জন্য অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে সাধারণত ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়।

তাই আপনার শিশুর ঘুমকে নিশ্চিত করতে তাকে পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ান। আর তার সঙ্গে তাকে নিয়মিত ব্যায়াম বা যোগাসনের অভ্যাস করান। এতেও ঘুমের ওপর প্রভাব পড়বে এবং ভাল ঘুম হবে।

অটিজমে আক্রান্ত অনেক শিশুর নিজের বিছানায় ঘুমাতে অসুবিধা হয়, তারা তাদের বাবা মার সঙ্গে থাকে। শিশুদের তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমানোটা অস্বাভাবিক কিছু নয়— যারা ভালোবাসা ও যত্ন দেয়, তাদের ঠিক পাশে থাকাটা স্বস্তি দেয়।

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারযুক্ত শিশুদের ঘুমের ব্যাঘাতের ফলে পরিচর্যাকারীদের বা মায়ের বাড়তি মানসিক চাপ বাড়ে। যা কেবল শিশুর জীবনযাত্রার মান এবং দিনের বেলার কার্যকলাপের উপরই নয়, পরিবারের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যার ফলে মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়।

ঘুমের ইতিহাস একজন চিকিৎসকের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে, বিকাশগত দুর্বলতা, প্ররোচনাকারী কারণসমূহ (যেমন— শারীরিক অসুস্থতা বা ঔষধের সূত্রপাত; ঘুমের অনিয়ম)

দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবকসমূহ (যেমন— দিনের বেলা ঘুমানো, শিশুর সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমানো এবং অভিভাবকত্বের আচরণ)। ঘুমের একটি লগ বা ডায়েরি রাখলে তা ঘুমের সমস্যার সম্ভাব্য কারণগুলো নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ছোট শিশুদের জন্যও ঘুমের একটি ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহায়ক কৌশলগুলোর মধ্যে

টনসিলাইটিস, অ্যাডেনয়েড, পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা এবং খিঁচুনির মতো কোনো অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান, ঘুমানোর রুটিনের যথাযথ ব্যবহার,

স্লিপ অ্যাপনিয়া, রেস্টলেস লেগস সিনড্রোম বা পিরিয়ডিক লিম্ব মুভমেন্ট ডিসঅর্ডারের মতো সহজাত ঘুমের ব্যাধিগুলোর জন্য স্ক্রিনিং, এএসডি-তে সচরাচর দেখা যায় এমন খাদ্য ও পরিবেশগত অ্যালার্জির সঠিক চিকিৎসা ব্যবস্থা।

শিশুর ঘুমের উপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন পারিপার্শ্বিক উপাদানগুলোর মূল্যায়ন  করতে হবে, যেমন— ঘরের তাপমাত্রা, পর্দা, বিছানাপত্র এবং ঘুমের পোশাক। নির্দিষ্ট কিছু স্পর্শ বা অনুভূতি আপনার শিশুকে শান্ত বা উত্তেজিত করতে পারে, যা তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। ঘরের শব্দের মাত্রা, দৃশ্যমান উদ্দীপনা এবং সেগুলো শিশুকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা বিবেচনা করতে হবে।

বেশিরভাগ শিশুর জন্য ঘুমানোর আগের নিয়মকানুন খুব গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো ঘুমের ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে। ঘুমানোর একটি দৃশ্যমান সময়সূচি তৈরি করুন এবং ঘুমানোর জন্য একটি যুক্তিসঙ্গত নির্দিষ্ট সময় বেছে নিতে হবে যা পুরো পরিবারের জন্য প্রযোজ্য ও এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। ঘুমানোর একটি ভালো রুটিন শিশুকে শান্ত হতে, বিশ্রাম নিতে এবং ঘুমানোর জন্য প্রস্তুত হতে শেখাতে সাহায্য করবে।

ঘুমের প্রশিক্ষণ খুবই জরুরি যেমন— শোবার সময়ের রুটিন শেষ হওয়ার পর শিশুটি তার বিছানায় বা খাটে থাকার পরেও যদি সে অস্থির থাকে এবং স্পষ্টতই না ঘুমায়, তবে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করতে হবে এবং তারপর তাকে দেখতে আবার তার ঘরে ফিরে যেতে হবে। এই খোঁজের মধ্যে রয়েছে শিশুর ঘরে ফিরে গিয়ে অল্প সময়ের জন্য (এক মিনিটের বেশি নয়, সম্ভব হলে তারও কম) তাকে স্পর্শ করা, আদর করে দেওয়া বা বড় শিশুদের ক্ষেত্রে যারা এই অঙ্গভঙ্গিগুলোতে ভালোভাবে সাড়া দেয়, তাদের জন্য একটি ‘হাই ফাইভ’, ‘থাম্বস আপ’ বা আলিঙ্গন করা। আলতোভাবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে বলুন— ‘ঠিক আছে, এখন ঘুমানোর সময়, তুমি ঠিক আছো’ বা এই ধরনের কোনো কথা।  তারপর পরবর্তী খোঁজের সময় না হওয়া পর্যন্ত বা শিশুটি ঘুমিয়ে না পড়া পর্যন্ত বাহিরে অপেক্ষা করা ভালো। এটা জানা গুরুত্বপূর্ণ যে, শিশুর আচরণের উন্নতি হওয়ার আগে কয়েকদিন বা তার বেশি সময় ধরে তা আরও খারাপ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে যা পরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

অটিস্টিক শিশুকে  তার নিজের বিছানায় ঘুমাতে অভ্যস্ত করা যায় কিনা এই চেষ্টা করতে হবে। তাদেরকে একা ঘুমানোর প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার আগে একটি সহায়ক ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা অপরিহার্য।

একটি ধারাবাহিক ঘুমের রুটিন প্রতিষ্ঠা করা। ... একটি আরামদায়ক ঘুমের পরিবেশ তৈরি করা ... ধীরে ধীরে পরিবর্তনের পদ্ধতি ... ভিজ্যুয়াল শিডিউল এবং সোশ্যাল স্টোরিজ বা গল্প... ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এএসডি আক্রান্ত শিশুকে আরও ভালোভাবে ঘুমাতে সাহায্য করার উপায়গুলো হলো— বাড়ির কোলাহল দূর করতে হবে, শোবার ঘরে আলোর প্রবেশ কমাতে হবে, শোবার ঘর ঠান্ডা রাখতে হবে, পায়জামা ও বিছানার চাদরের কাপড়ের মান যাচাই করা ভালো।

এএসডি আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ঘুমের এই সমস্যা তাদের সামাজিক মেলামেশা, পড়াশোনার ফলাফল এবং যত্নকারীদের সুস্থতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।ওষুধ-বহির্ভূত ব্যবস্থা, যেমন ঘুমানোর নির্দিষ্ট রুটিন এবং ঘুম-সচেতন পদ্ধতির বাস্তবায়নই এই সমস্যা সমাধানের মূল ভিত্তি।

এ কৌশলগুলো সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত ঔষধ চিকিৎসার পাশাপাশি এএসডি আক্রান্ত শিশুদের জীবনমান উন্নত করতে এবং পরিবার ও পিতামাতার মানসিক কষ্ট কমাতে সাহায্য করতে পারে।

লেখক: কনসালটেন্ট: নিউরোডেভলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার এবং চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট এন্ড পেডিয়াট্রিক ডিপার্টমেন্ট, বেটার লাইফ হসপিটাল। প্রাক্তন অটিজম বিশেষজ্ঞ: ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটাল।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম