ক্যামোথেরাপি দিতে কত টাকা লাগে?

  ডা. মো. সাঈদ এনাম ১৬ আগস্ট ২০১৯, ১৯:১৩ | অনলাইন সংস্করণ

ক্যামোথেরাপি

পরিচিত এক রোগীর একরকম প্রশ্নে কিছুটা বিব্রত হয়ে যাই। ক্যামোথেরাপি দিতে দিতে টাকা কেন লাগবে? আমিতো কখনো ক্যামো দিতে টাকা লাগতে দেখিনি।

আমার মুহূর্তেই মনে পড়লো ঢাকা মেডিকেলে ইন্টার্নিশিপের কথা। ইন্টার্নিশিপ করার সময় কয়েকদিনের প্লেস ম্যান্ট ছিল পিডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে। সেখানে ছিল একটি কর্নার, ব্লাড ক্যান্সার/লিউকেমিয়া কর্নার।

ব্লাড ক্যান্সার বা লিউকেমিয়ার শিশুগুলোকে সেখানে ক্যামোথেরাপি দেওয়া হতো। ঢাকাসহ সারা দেশ থেকে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুরা ক্যামো দিতে আসতো। তাদের হাতের থাকতো কার্ড, ক্যামোথেরাপির সিডিউল আর নিজেদের কিনে আনা ক্যামোথেরাপির ঔষধ। (দু' তিনটি ইঞ্জেকশনের সমষ্টি মাত্র)।

নতুন ইন্টার্নদের আইএমও'রা প্রথম দিন ক্যামো দেওয়ার নিয়ম দেখিয়ে দিতেন। পরের দিন থেকে ইন্টার্নরা নিজেই দিতেন।

আমি অনেক বাচ্চার ক্যামো দিয়েছি। বাচ্চাগুলো বিছানায় শুয়েই এক হাতে ধরিয়ে দিতো বাটার ফ্লাই নিডল (ছোট সুঁই যার ভেতর দিয়েই ইঞ্জেকশন যায়) বা ক্যানোলা, আরেক হাতে দিতো তার ইঞ্জেকশনগুলো। নিস্পাপ বাচ্চাগুলো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বলতো, 'দেন৷ ভয়ের কিছু নেই। আমরা মাসে মাসে এসে দিয়ে যাই..'।

পাশে বসে থাকা মায়েদেরর হাতে কার্ড এবং সিডিউল।

তিন চার দিন কয়েকটা ইঞ্জেকশন, স্যালাইনের সঙ্গে মিশিয়ে পুশ করে দিয়ে দিলেই শেষ হয়ে যেতো একেকটি ক্যামোথেরাপির মেইনটেনেন্স সাইকেল। বেশিরভাগ ছেলেমেয়েরা নেহায়েত দরিদ্র শ্রেণির থাকতো।

সরকারি হাসপাতাল তাদের এই ক্যামোথেরাপি দিতে কোন খরচই লাগতো না। কেবল ইঞ্জেকশনগুলো কিনে আনতে হতো তাদের।

ইন্টার্নিশিপ শেষ হবার পর আর ক্যামো দেয়া হয়নি। মহাখালীর এক ক্লিনিকে কয়েকদিন ডিউটি অফিসার হিসেবে ছিলাম। সেখানে একজন অনকোওলজিস্ট (ক্যান্সার স্পেশালিস্ট) তার ক্যান্সারের রোগীদের ক্যামো দিতেন।

একদিন এক রোগী ব্রেইনের ক্যান্সারের ইন্ট্রাথিকাল ক্যামো দিতে আসলো। স্যার ডিউটি ডাক্তার কল করলেন। স্যারসহ আমরা দু'জনে মিলে এল.পি (লাম্বার পাংচার) করে ক্যামো দিলাম। সেই ক্লিনিকে স্যার খুব কম টাকা রাখতেন। প্রতি ক্যামোতে বড়জোর দেড় থেকে দুই হাজার। গরিব মধ্যবিত্ত আর স্যারের আত্মীয় পরিজনই বেশি ছিল।

এরপর ওভাবে আর রোজ রোজ ক্যামো দেয়া হয়নি।

একদিন সাব সেন্টারে এক গরিব রোগী আসে। হাতে ক্যামোর ইঞ্জেকশন। Ing. 5-FU। বললো, "স্যার এ ইঞ্জেকশন দিতে হয় আমাকে ক'দিন পর পর। আমি গরিব, এখন হাসপাতালে যাবার পয়সাটুকু নেই। এখানে কি এটা দেয়া যাবে? মরি যদি তবে আপনার হাতেই মরবো, দুঃখ থাকবে না তাতে"।

কোন রোগী ডাক্তারকে এভাবে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা নিয়ে কথা বললে তার জন্যে অনেক কিছুই করতে ইচ্ছে করবে। অসহায় রোগীর কেমো দেবার ব্যবস্থা করি মফস্বলের হেলথ কমপ্লেক্সেই।

কেমোথেরাপি দিতে সরকারি হাসপাতালে কোন টাকা খরচ হয় না। বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালে বিনে পয়সায় অনকোলজিস্টরা প্রতিদিন শত শত, হাজার হাজার ক্যান্সার রোগীর ফ্রি ক্যামোথেরাপি দিচ্ছেন।

ক্যামোথেরাপি শিডিউল, ইঞ্জেকশন সারা বিশ্বের, যেখানেই যান একই রকম। এক গ্লাস কোক রাস্তায় ঝটপট দাঁড়িয়ে খেলে হয়তো ১৫ টাকা খরচ হবে, আর রেডিসন বা সোনারগাঁও হোটেলে খেলে আরেক দর পড়বে। খাবেন কিন্তু সেই একই জিনিস, কোক।

দুই.

রোগীর প্রশ্ন শুনে তার হাত থেকে ক্যামোর সিডিউলটা নেই। পাকস্থলীতে ক্যান্সার। প্রথম সাইকেল ঢাকা দিয়েছে, খরচ ৬০ হাজার টাকা। পরবর্তী সাইকেলগুলার সিডিউল ও মোট দর ২ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা!

ক্যামো যেখানেই দেন তার ইঞ্জেকশনগুলো একই হলেও স্থান ভেদে দর একেক জায়গায় একেক রকম। সরকারি হাসপাতালে ফ্রি। দেশের প্রাইভেট ক্লিনিকে লাখ টাকা। বিদেশের হাসপাতালে তার চেয়ে ও ঢের ঢের বেশি। ওই যে বললাম, পুরো ব্যপারটা আসলে কোক খাবার মতো। একেক জায়গায় একেক দর।

রোগীর ক্যামোথেরাপি দিতে কত লাগে তার উত্তরে বললাম, 'সরকারি হাসপাতালে দিয়ে দাও, আমি বলে দেবো। এক টাকাও লাগবে না'। তিনি এটা বিশ্বাসই করতে চাইলেন না। কোথায় আড়াই লাখ টাকার মামলা আর কোথায় ফ্রি!

তার চোখেমুখে বিস্ময়।

জিজ্ঞাস করলাম, এক কাপ চায়ের দাম পাশের রেস্ট্রুরেন্টে কত? সে বললো, '১০ টাকা'। এই চা যদি ফাইভ স্টার হোটেলে বসে খান তাহলে কত? তিনি বললেন, 'ওখানে তো স্যার অনেক অনেক বেশি হবে'।

ঠিক, তাদের সাইনবোর্ডের একটা দাম আছে, তাদের এজেন্ট বা দালালদের একটা দর আছে, তাদের ব্যবসার প্রসার, প্রচার, প্রচারণার, তাদের পরিবেশ, পরিবেশনার সব করা কিছুরই একটা রেট আছে। এক কাপ চায়ে হয়তো এক চামচ চা পাতা আর চিনি ছাড়া এর বেশি কিছু খাওয়া হয় না। কিন্তু বিশ্বাস-অবিশ্বাস আর স্থান-কাল-পাত্র ভেদে তার মূল্যটা আলাদা হয়ে যাচ্ছে।

লেখক: ডা. মোহাম্মদ সাঈদ এনাম, সাইকিয়াট্রিস্ট

এমবিবিএস (ডিএমসি), এমফিল (সাইকিয়াট্রি), বিসিএস (স্বাস্থ্য)

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, সিলেট।

ঘটনাপ্রবাহ : ডা. সাঈদ এনামের লেখা

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

 
×