করোনা সংক্রমণে ভেঙে না পড়ে সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন
jugantor
করোনা সংক্রমণে ভেঙে না পড়ে সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন

  ডা. মোহাম্মদ জোবায়ের মিয়া  

০৫ মে ২০২০, ২২:২৭:৩৯  |  অনলাইন সংস্করণ

কোয়ারেন্টিনে থাকার সময় এমন কিছু দেখা যাবে না যাতে মানসিক চাপ বেড়ে যায়।

করোনা আক্রান্ত কোনো দেশ ঘুরে আসার পর বা আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসার পর এই ভাইরাস সংক্রমণের আশংকা থাকে। সেসব লোকদের কমপক্ষে দুই সপ্তাহ একটি ভবনে অথবা নিজ বাড়িতে সকল স্বাস্থ্যবিধি মেনে আবদ্ধ থাকাকে কোয়ারেন্টিন বলে।

সেই সময় সেই ব্যক্তির ব্যবহার করা টয়লেট, পোশাক, বিছানাপত্র, খাবার প্লেট, পান পাত্র যাবতীয় সবকিছু আলাদা থাকবে। সে বাইরে বের হবে না কেউ তার সঙ্গে দেখাও করবেনা। প্রয়োজনে তার কাছে অন্তত ৩ ফুট দূরত্বে থেকে মাস্ক ব্যবহার করে কথা বলতে হবে।

অনেকে মনে করেন জ্বর, সর্দি, কাশি নেই তবে কোয়ারেন্টিনে কেন থাকতে হবে? কোয়ারেন্টিনে সেই সব লোকদের থাকতে হবে কারণ করোনাভাইরাসের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করার পরপরই তার শরীরে উপসর্গ দেখা দেয় না।

রোগ শরীরে প্রবেশ করার দুই থেকে চৌদ্দ দিনের মধ্যে এই উপসর্গ প্রকাশ পায়। এই সময়কে ইনকিউবিশন পিরিয়ড বলে। তাই কমপক্ষে দুই সপ্তাহ কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে।

আইসোলেশন: কারও শরীরে যদি করোনাভাইরাস ইনফেকশনের লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং নমুনা পরীক্ষার ফল পজিটিভ হয় অর্থাৎ কারও যদি করোনাভাইরাস ধরা পড়ে তবে তাকে আইসোলেশনে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এই সময় অবশ্যই তাকে নির্দিষ্ট হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেখানে যথেষ্ট পরিমাণ নিরাপত্তা পোশাক (পিপিই) পরিধান করে চিকিৎসক, নার্স বা অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা রোগীর পরিচর্যা করবেন।

লক্ষণ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। এই মেয়াদ কমপক্ষে চৌদ্দ দিন। রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে এই মেয়াদ বাড়ানোও যেতে পারে। মনে রাখতে হবে সেই হাসপাতালে অবশ্যই আইসিইউ(ভেন্টিলেটরসহ) ব্যবস্থা থাকতে হবে।

কোয়ারেন্টাইন এ থাকাকালীন কিছু মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন উদ্বিগ্নতা, দুঃশ্চিন্তা, নিদ্রাহীনতা, বিষন্নতা, আচরণগত সমস্যা(খিট খিটে মেজাজ), মাদকাসক্তি, আত্মহত্যা ইত্যাদি।

এইসব প্রতিরোধে আমরা কিছু সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবো। যেমন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নিয়মিত পুষ্টিকর স্বাভাবিক খাবার, বেশি বেশি তরল খাবার, হালকা কুসুম গরম পানি পান করবো।

বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। আর চোখে মুখে হাত না লাগানো পরিহার করতে হবে। সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, ইত্যাদি কাজগুলি করে যেতে হবে।

এসবের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থের উন্নতির জন্য নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করতে হবে। ঘরে হাটিহাটি করবেন। শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করবেন ৫ মিনিট ধরে অন্তত দিনে তিন বার। যোগ ব্যায়াম, ইয়োগাও করতে পারেন।

এছাড়া পছন্দের গান শুনতে পারেন, নাটক, মুভি কিংবা ডকুমেন্টারি দেখতে পারেন। এই সময় মনকে শান্ত রাখার জন্য প্রার্থনা, নামাজ একাকী পড়তে পারেন।

করোনায় ভেঙে না পড়ে মোকাবেলার জন্য অন্য মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। প্রিয়জনদের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলতে পারেন। ই মেইলে চিঠি লিখতে পারেন। ফেসবুক-মেসেঞ্জারে, হোয়াটসঅ্যাপে, ইমু, ভাইবারে ভিডিওকলে বন্ধু-বান্ধব, প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।

তবে কোয়ারেন্টিনে থাকার সময় এমন কিছু দেখা যাবে না যাতে মানসিক চাপ বেড়ে যায়। এজন্য মানসিকভাবে উদ্বিগ্ন ও দুশ্চিন্তায় ফেলতে পারে এমন খবর দেখা, পড়া ও শোনা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

তাছাড়া করোনাভাইরাস নিয়ে বেশি বেশি খবর পড়লে মানসিকভাবে আতংকিত হওয়ার আশংকা তৈরি হয়। তখন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করাও অসম্ভব হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদিতে হ্যাশট্যাগ বা কী-ওয়ার্ড মিউট করে রাখতে পারেন যেন সেগুলি সামনে না আসে।

এছাড়া অতিরিক্ত হাত ধোয়া থেকে বিরত থাকুন। যাদের সূচিবায় (ওসিডি) রোগ রয়েছে তারা এমনিই পরিষ্কার -পরিচ্ছন্নতা নিয়ে অতিরিক্ত সতর্ক' থাকেন। করোনাভাইরাস থেকে বাঁচার জন্য বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার প্রচারের কারণে তারা আরও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে পারেন। অনেক সময় সাবান ও স্যানিটাইজার ব্যবহার আসক্তিও হতে পারে। সেই দিকটিও খেয়াল করতে হবে।

পরিশেষে এই মহামারীর হাত থেকে বাঁচার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে সবাই সাহায্য চাই। যেন খুব তাড়াতাড়ি আমরা এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে পারি।

লেখক: ডা. মোহাম্মদ জোবায়ের মিয়া

সহকারী অধ্যাপক, মনোরোগ বিদ্যা বিভাগ, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ, গাজীপুর।

করোনা সংক্রমণে ভেঙে না পড়ে সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন

 ডা. মোহাম্মদ জোবায়ের মিয়া 
০৫ মে ২০২০, ১০:২৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
কোয়ারেন্টিনে থাকার সময় এমন কিছু দেখা যাবে না যাতে মানসিক চাপ বেড়ে যায়।
কোয়ারেন্টিনে থাকার সময় এমন কিছু দেখা যাবে না যাতে মানসিক চাপ বেড়ে যায়। ফাইল ছবি

করোনা আক্রান্ত কোনো দেশ ঘুরে আসার পর বা আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসার পর এই ভাইরাস সংক্রমণের আশংকা থাকে। সেসব লোকদের কমপক্ষে দুই সপ্তাহ একটি ভবনে অথবা নিজ বাড়িতে সকল স্বাস্থ্যবিধি মেনে আবদ্ধ থাকাকে কোয়ারেন্টিন বলে।

সেই সময় সেই ব্যক্তির ব্যবহার করা টয়লেট, পোশাক, বিছানাপত্র, খাবার প্লেট, পান পাত্র যাবতীয় সবকিছু আলাদা থাকবে। সে বাইরে বের হবে না কেউ তার সঙ্গে দেখাও করবেনা। প্রয়োজনে তার কাছে অন্তত ৩ ফুট দূরত্বে থেকে মাস্ক ব্যবহার করে কথা বলতে হবে।

অনেকে মনে করেন জ্বর, সর্দি, কাশি নেই তবে কোয়ারেন্টিনে কেন থাকতে হবে? কোয়ারেন্টিনে সেই সব লোকদের থাকতে হবে কারণ করোনাভাইরাসের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করার পরপরই তার শরীরে উপসর্গ দেখা দেয় না।

রোগ শরীরে প্রবেশ করার দুই থেকে চৌদ্দ দিনের মধ্যে এই উপসর্গ প্রকাশ পায়। এই সময়কে ইনকিউবিশন পিরিয়ড বলে। তাই কমপক্ষে দুই সপ্তাহ কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে।

আইসোলেশন: কারও শরীরে যদি করোনাভাইরাস ইনফেকশনের লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং নমুনা পরীক্ষার ফল পজিটিভ হয় অর্থাৎ কারও যদি করোনাভাইরাস ধরা পড়ে তবে তাকে আইসোলেশনে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এই সময় অবশ্যই তাকে নির্দিষ্ট হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেখানে যথেষ্ট পরিমাণ নিরাপত্তা পোশাক (পিপিই) পরিধান করে চিকিৎসক, নার্স বা অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা রোগীর পরিচর্যা করবেন।

লক্ষণ  অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। এই মেয়াদ কমপক্ষে চৌদ্দ দিন। রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে এই মেয়াদ বাড়ানোও যেতে পারে। মনে রাখতে হবে সেই হাসপাতালে অবশ্যই আইসিইউ(ভেন্টিলেটরসহ) ব্যবস্থা থাকতে হবে।

কোয়ারেন্টাইন এ থাকাকালীন কিছু মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন উদ্বিগ্নতা, দুঃশ্চিন্তা, নিদ্রাহীনতা, বিষন্নতা, আচরণগত সমস্যা(খিট খিটে মেজাজ), মাদকাসক্তি, আত্মহত্যা ইত্যাদি।

এইসব প্রতিরোধে আমরা কিছু সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবো। যেমন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নিয়মিত পুষ্টিকর স্বাভাবিক খাবার, বেশি বেশি তরল খাবার, হালকা কুসুম গরম পানি পান করবো।

বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। আর চোখে মুখে হাত না লাগানো পরিহার করতে হবে। সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা,  ইত্যাদি কাজগুলি করে যেতে হবে।

এসবের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থের উন্নতির জন্য নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করতে হবে। ঘরে হাটিহাটি করবেন। শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করবেন ৫ মিনিট ধরে অন্তত দিনে তিন বার। যোগ ব্যায়াম, ইয়োগাও করতে পারেন।

এছাড়া পছন্দের গান শুনতে পারেন, নাটক, মুভি কিংবা ডকুমেন্টারি দেখতে পারেন। এই সময় মনকে শান্ত রাখার জন্য প্রার্থনা, নামাজ একাকী পড়তে পারেন।

করোনায় ভেঙে না পড়ে মোকাবেলার জন্য অন্য মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। প্রিয়জনদের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলতে পারেন। ই মেইলে চিঠি লিখতে পারেন। ফেসবুক-মেসেঞ্জারে, হোয়াটসঅ্যাপে, ইমু, ভাইবারে ভিডিওকলে বন্ধু-বান্ধব, প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।

তবে কোয়ারেন্টিনে থাকার সময় এমন কিছু দেখা যাবে না যাতে মানসিক চাপ বেড়ে যায়।  এজন্য মানসিকভাবে উদ্বিগ্ন ও দুশ্চিন্তায় ফেলতে পারে এমন খবর দেখা, পড়া ও শোনা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

তাছাড়া করোনাভাইরাস নিয়ে বেশি বেশি খবর পড়লে মানসিকভাবে আতংকিত হওয়ার আশংকা তৈরি হয়। তখন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করাও অসম্ভব হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদিতে হ্যাশট্যাগ বা কী-ওয়ার্ড মিউট করে রাখতে পারেন যেন সেগুলি সামনে না আসে।

এছাড়া অতিরিক্ত হাত ধোয়া থেকে বিরত থাকুন। যাদের সূচিবায় (ওসিডি) রোগ রয়েছে তারা এমনিই পরিষ্কার -পরিচ্ছন্নতা নিয়ে অতিরিক্ত সতর্ক' থাকেন। করোনাভাইরাস থেকে বাঁচার জন্য বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার প্রচারের কারণে তারা আরও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে পারেন। অনেক সময় সাবান ও স্যানিটাইজার ব্যবহার আসক্তিও হতে পারে। সেই দিকটিও খেয়াল করতে হবে।

পরিশেষে এই মহামারীর হাত থেকে বাঁচার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে সবাই সাহায্য চাই। যেন খুব তাড়াতাড়ি আমরা এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে পারি।

লেখক: ডা. মোহাম্মদ জোবায়ের মিয়া

সহকারী অধ্যাপক, মনোরোগ বিদ্যা বিভাগ, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ, গাজীপুর।