অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে অ্যাসিটেট টো আমদানি, বিপুল রাজস্ব আদায়
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে সিগারেটের ফিল্টার তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল সেলুলোজ অ্যাসিটেট টো আমদানি করে অবৈধভাবে বিক্রি বা হস্তান্তরের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির সম্ভাব্য চিত্র উদঘাটন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)।
সংস্থাটির ঝুঁকিভিত্তিক যাচাই ও হস্তক্ষেপে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের একটি চালানের খালাস স্থগিত করে ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ওই চালানের অ্যাসিটেট টো স্থানীয়ভাবে সিগারেট উৎপাদনে ব্যবহৃত হলে প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা রাজস্ব সংশ্লিষ্ট হতে পারত বলে প্রাথমিক হিসাবে জানা গেছে। তবে উচ্চ সেগমেন্টের সিগারেটের হিসাবে সম্ভাব্য রাজস্বের পরিমাণ ৫৬৪ কোটি টাকা হতে পারে বলেও জানিয়েছে সিআইসি।
সিআইসি সূত্রে জানা যায়, সিগারেটের ফিল্টার তৈরিতে ব্যবহৃত সেলুলোজ অ্যাসিটেট টো সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর একটি কাঁচামাল। সম্প্রতি বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের মাধ্যমে এ পণ্যের আমদানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এর প্রকৃত ব্যবহার, আমদানির পরবর্তী সরবরাহ এবং ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে তথ্য বিশ্লেষণ শুরু করে সিআইসি।
তথ্য বিশ্লেষণে ইউনিক ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অ্যাসিটেট টো আমদানির বিষয়টি বিশেষভাবে নজরে আসে। প্রতিষ্ঠানটির আমদানি করা পণ্য কোথায় সরবরাহ করা হচ্ছে, তা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ভ্যাট বিভাগে তথ্য চাওয়া হয়।
জবাবে ভ্যাট বিভাগ জানায়, প্রতিষ্ঠানটি তার নিবন্ধিত ঠিকানায় কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছে না। এমনকি প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত অনলাইন বা অফলাইনে ভ্যাট রিটার্ন ও সংশ্লিষ্ট দলিলাদিও দাখিল করছে না। ফলে প্রতিষ্ঠানটিকে অস্তিত্বহীন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকার চালান আটকে রাজস্ব আদায়
সিআইসির যাচাইয়ে আরও দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দিয়ে দুই কনটেইনারে মোট ৪৮ হাজার ১৪৩ কেজি অ্যাসিটেট টো আমদানি করেছে।
আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব না থাকার তথ্য পাওয়ার পর সরকারের রাজস্ব সুরক্ষার স্বার্থে সিআইসির উদ্যোগে চালানটির খালাস কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। চালানটিতে আমদানি পর্যায়ে প্রায় ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা রাজস্ব জড়িত ছিল, যা পরবর্তীতে আদায় নিশ্চিত করা হয়েছে।
তবে আমদানি পর্যায়ের রাজস্বের বাইরেও এ পণ্যের স্থানীয় ব্যবহারের সঙ্গে আরও বড় অঙ্কের রাজস্ব সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।
এক চালানেই সম্ভাব্য ৩২৪ কোটি টাকার রাজস্ব
সিআইসি জানিয়েছে, সিগারেট উৎপাদনকারী দুটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের মূসক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতি এক কেজি অ্যাসিটেট টো থেকে প্রায় ৮ হাজার ৯৩৭ শলাকা সিগারেট উৎপাদন করা সম্ভব।
সে হিসাবে ৪৮ হাজার ১৪৩ কেজি অ্যাসিটেট টো দিয়ে প্রায় ৪৩ কোটি ২ লাখ ৫৪ হাজার শলাকা সিগারেট উৎপাদন করা সম্ভব। ১০ শলাকার প্রতি প্যাকেট হিসাবে এ পরিমাণ কাঁচামাল দিয়ে প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ ২৫ হাজার প্যাকেট সিগারেট উৎপাদন করা যেত।
মাঝারি শ্রেণির সিগারেটের প্রতি প্যাকেটের খুচরা মূল্য ৯২ টাকা এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও সম্পূরক শুল্কসহ প্রযোজ্য রাজস্বের হার প্রায় ৮২ শতাংশ বিবেচনায় নিলে এই পরিমাণ সিগারেটের সঙ্গে প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা রাজস্ব সংশ্লিষ্ট হতে পারে বলে প্রাথমিক হিসাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, উচ্চ শ্রেণির সিগারেটের প্রতি প্যাকেটের খুচরা মূল্য ১৬০ টাকা এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে মূসক ও সম্পূরক শুল্কসহ প্রযোজ্য রাজস্বের হার প্রায় ৮২ শতাংশ বিবেচনায় নিলে এই পরিমাণ সিগারেটের সঙ্গে প্রায় ৫৬৪ কোটি টাকা রাজস্ব সংশ্লিষ্ট হতে পারে।
অর্থাৎ, অস্তিত্বহীন একটি প্রতিষ্ঠানের নামে আমদানি করা ওই চালানটি অবৈধভাবে বাজারজাত বা ব্যবহৃত হলে আমদানি পর্যায়ের রাজস্বের পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়েও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ঝুঁকির মুখে পড়তে পারত।
এক অর্থবছরে আমদানি ৩ লাখ ৬২ হাজার কেজির বেশি
সিআইসির তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউনিক ট্রেডার্স আলোচ্য চালানসহ মোট ৩ লাখ ৬২ হাজার ৮৩৭ কেজি অ্যাসিটেট টো আমদানি করেছে।
প্রতি কেজি অ্যাসিটেট টো থেকে প্রায় ৮ হাজার ৯৩৭ শলাকা সিগারেট উৎপাদনের হিসাব বিবেচনায় নিলে এত বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের প্রকৃত ব্যবহার, ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান এবং পরবর্তী সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এসব আমদানির প্রকৃত ব্যবহার ও সরবরাহের বিষয়ে আরও যাচাই-বাছাই করছে সিআইসি।
আরও চার অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের সন্ধান
অ্যাসিটেট টো আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সিআইসি আরও চারটি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পেয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত ঠিকানায় বাস্তব ব্যবসায়িক কার্যক্রম না থাকার তথ্য সংশ্লিষ্ট ভ্যাট বিভাগ থেকে পাওয়া গেছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং আমদানি করা পণ্যের বিক্রয় ও ব্যবহার সম্পর্কে সিআইসির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট বিভাগে তথ্য চাওয়া হলে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিবন্ধিত ঠিকানায় প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছে না।
একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত অনলাইন বা অফলাইনে দাখিলপত্র জমা দেয় না এবং ভ্যাট-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় দলিলাদিও সংশ্লিষ্ট বিভাগে দাখিল করছে না।
নামমাত্র নিবন্ধন নিয়ে উচ্চ রাজস্বের পণ্য আমদানি
সিআইসির প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিছু প্রতিষ্ঠান নামমাত্র নিবন্ধন গ্রহণ করে এই রাজস্ব সংশ্লিষ্ট অ্যাসিটেট টো আমদানি করে পরবর্তীতে তা অবৈধভাবে বিক্রি বা হস্তান্তর করে থাকতে পারে। এর ফলে আমদানি পর্যায়ের পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়েও বিপুল রাজস্ব ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা অ্যাসিটেট টো’র প্রকৃত ব্যবহারকারী, সরবরাহের গন্তব্য, বিক্রয়, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। একই সঙ্গে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে প্রযোজ্য আইনে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উচ্চ রাজস্ব সংশ্লিষ্ট অ্যাসিটেট টো’র আমদানি ও সরবরাহ নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেটগুলোকে এ পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা যাচাই করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে।
রাজস্ব-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, আমদানিকারকের অস্তিত্ব ও প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম যাচাইয়ের পাশাপাশি আমদানি করা পণ্যের প্রকৃত ব্যবহারকারী, সরবরাহের গন্তব্য এবং পরবর্তী বিক্রয় বা হস্তান্তর অনুসরণ করা হলে এ ধরনের রাজস্ব ঝুঁকি আরও কার্যকরভাবে শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা সম্ভব।
