মঞ্চায়ন হলো দুই পাখি ও নন্দিনী
Advertisement
সাংস্কৃতিক প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১২ এএম
প্রায় দেড় ঘণ্টার এ নাটকের মাধ্যমে দর্শক বিনোদনের পাশাপাশি মুক্তি ও মানবিকতার বোধের মুখোমুখি হবেন—এমন প্রত্যাশা লাকী ইনামের।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রাচুর্য, বিলাসিতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিনিময়ে পরাধীনতা, নাকি অনিশ্চয়তা ও কষ্টের মধ্যেও স্বাধীন জীবন—এই দ্বন্দ্বকে সামনে রেখে মঞ্চে এসেছে নাগরিক নাট্যাঙ্গনের নতুন প্রযোজনা ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই পাখি’ কবিতা এবং ‘রক্তকরবী’ নাটকের নন্দিনী চরিত্রকে আশ্রয় করে নাটকটি নির্মিত হয়েছে।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল হলে নাটকটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
নাটকটির পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন নাট্যশিল্পী, নাট্যকার ও নির্দেশক ষড়ৈশ্বর্য লাকী ইনাম। নাগরিক নাট্যাঙ্গনের ২৮তম প্রযোজনা এটি।
ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং শোষণ-শাসন ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বাস্তবতায় মানুষের জীবন যখন ক্রমেই যান্ত্রিক হয়ে উঠছে, তখন স্বাধীনতার অর্থ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে নতুনভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে প্রযোজনাটি।
একদিকে সোনার খাঁচায় নিরাপদ অথচ পরাধীন জীবন, অন্যদিকে ঝুঁকি-কষ্টের মধ্যেও মুক্ত বনের পাখির মতো স্বাধীন জীবন—এই দুই বিপরীত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে নাটকের দুই পাখিকে।
নাটকের ভাবনায়, খাঁচার পাখি ও বনের পাখির সাক্ষাতে স্বাধীনতা ও পরাধীনতার দুই সত্তা মুখোমুখি হয়। কিন্তু তাদের দ্বন্দ্ব যখন নিজস্ব শক্তিতে মুক্তির পথ খুঁজে পায় না, তখন আবির্ভাব ঘটে ‘রক্তকরবী’র নন্দিনীর। যক্ষপুরীর মকররাজের শোষণ ও ভয়ভীতির মধ্যে কিশোর, ফাগুলালের মতো অসংখ্য মানুষ যখন খনিতে শ্রম দিতে দিতে যন্ত্রে পরিণত হয়, তখন নন্দিনী তাদের মানবিক অস্তিত্ব ও মুক্তির পথের সন্ধান দেন। সেই ভাবনাকেই সমকালীন বাস্তবতায় নতুন শিল্পরূপ দিয়েছেন লাকী ইনাম।
প্রযোজনাটি নিয়ে ষড়ৈশ্বর্য লাকী ইনাম বলেন, ‘দুই পাখি’ ও ‘রক্তকরবী’ রবীন্দ্রনাথের একই বক্তব্যের দুই ধরনের শিল্পরূপ। সেই বক্তব্য হলো সর্বপ্রাণী ও সব মানুষের স্বাধীনতা। তার মতে, স্বাধীনতা শুধু আবদ্ধ প্রাচীর বা খাঁচা ভাঙার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রকৃত স্বাধীনতা হলো অন্যকে প্রাচীরের মধ্যে আটকে রাখার কিংবা খাঁচায় পুরে রাখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা। নিজের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বাঁচা এবং অন্যকে নিয়েও বাঁচার সুযোগ তৈরি করাই প্রকৃত স্বাধীনতা।
এ প্রযোজনার সঙ্গে তার ব্যক্তিজীবনেরও একটি বিশেষ যোগ রয়েছে। গত ৪ সেপ্টেম্বর ৭৫ বছরে পদার্পণ করেছেন লাকী ইনাম। দলীয় কর্মীরা জন্মদিনটি বিশেষভাবে উদযাপন করতে চাইলেও তিনি বেছে নিয়েছেন নতুন নাটক সৃষ্টি ও মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে নিজের শিল্পজীবন উদযাপনকে।
লাকী ইনাম বলেন, শৈশব থেকে আবৃত্তি, গান, নৃত্য ও অভিনয়সহ তার শিল্পচর্চার বিভিন্ন পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তার আশ্রয়। তাই জীবনের ৭৫ বছরে এসে নতুন প্রযোজনার জন্যও রবীন্দ্রনাথের কাছেই ফিরে গেছেন তিনি। ‘দুই পাখি’র মুক্তির পথ খোঁজা এবং ‘রক্তকরবী’র নন্দিনীর দেওয়া উত্তরের সমন্বয়েই তৈরি হয়েছে ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’।
নাটকের পাণ্ডুলিপি রচনার ক্ষেত্রে হৃদি হক তাকে ভাবনা দিয়ে অনুপ্রাণিত করেছেন বলে জানান নির্দেশক। প্রযোজনার অভিনয়, মঞ্চসজ্জা, আবহসংগীত, পোশাক ও দ্রব্যসম্ভারের কাজে নাগরিক নাট্যাঙ্গনের নাট্যকর্মীদের সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। মঞ্চের আলোর পুরোধা ঠান্ডু রায়হান এ প্রযোজনায় আলোকবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত হয়েছেন।
১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত নাগরিক নাট্যাঙ্গন এ পর্যন্ত পথনাটক ও মঞ্চনাটক মিলিয়ে ২৭টি প্রযোজনা মঞ্চে এনেছে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য অবলম্বনে এর আগে দলটি ড. ইনামুল হকের ‘বৈকুণ্ঠের খাতা’ এবং লাকী ইনামের ‘মুক্তির উপায়’ মঞ্চস্থ করেছে। নতুন প্রযোজনাটিকে প্রয়াত ড. ইনামুল হকের থিয়েটারচর্চার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেও দেখছেন লাকী ইনাম।
প্রযোজনাটিতে অভিনয় করেছেন প্রলয় জামান, জুয়েল জহুর, সুমন আহমেদ, হিল্লোল সরকার, মোসাদ্দীক শাহীন, পারিশা আফরোজ, লায়লা পলি, ফারিন তামান্না, স্মৃতি সরকার, ফজলে রিফাত রাব্বী, নাজমুল, বিশাল, ইমদাদসহ আরও অনেকে।
সংগীতে আসমা দেবযানী, আবহসংগীতে বিশ্বজিৎ বাদল, কোরিওগ্রাফিতে সুমন আহমেদ এবং রূপসজ্জায় শংকর দাশ কাজ করেছেন।
নির্দেশকের ভাষ্য, বর্তমান সময়ে একটি নাট্যদলের জন্য অনেক অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলী নিয়ে দলগত প্রযোজনা তৈরি করা নানা সীমাবদ্ধতার কারণে কঠিন। তারপরও প্রায় ৩৫ জন নাট্যকর্মীর অংশগ্রহণে প্রযোজনাটি মঞ্চে আনতে পারাকে তিনি বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখছেন।
প্রায় দেড় ঘণ্টার এ নাটকের মাধ্যমে দর্শক বিনোদনের পাশাপাশি মুক্তি ও মানবিকতার বোধের মুখোমুখি হবেন—এমন প্রত্যাশা লাকী ইনামের। তার মতে, প্রযোজনাটির অন্তর্নিহিত বোধ যদি বিনোদন ও প্রজ্ঞার সঙ্গে দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারে এবং তাদের মুক্তির স্বাদ দিতে পারে, তাহলেই এ প্রচেষ্টা অর্থপূর্ণ হবে।


