'যিনি সংসার ভাঙছেন ঈশ্বর তাকে দেখে নেবেন'
Advertisement
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৬ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নেমপ্লেটে জ্বলজ্বল করছে গোবিন্দের নাম, তার নিচেই সুনীতা আহুজার। বেডরুমে খাটের পাশেই রাখা দুজনের ছবি। কলকাতায় গোবিন্দ-সুনীতার ঠিকানা। বাইপাস লাগোয়া স্ট্যান্ডঅ্যালোন অ্যাপার্টমেন্টের ফ্ল্যাটে দেড় বছর বাদে পা রাখলেন গোবিন্দপত্নী সুনীতা আহুজা। বাড়ির আনাচে কানাচে যুগলের নানা স্মৃতিচিহ্ন। দেওয়ালে টাঙানো দুই ছেলেমেয়ের ছবি। সিংহাসনে রাখা দুর্গামূর্তি। আসবাব থেকে ঘর সাজানোর সরঞ্জাম— সবেতেই বাঙালিয়ানার ছোঁয়া। আধ্যাত্মিকতা থেকে কাজের ইচ্ছা, ছেলেবেলার প্রেম থেকে গোবিন্দের সঙ্গে মনোমালিন্য— সবকিছু নিয়ে একটি গণমাধ্যমের এক সাক্ষাৎকারে জানালেন গোবিন্দপত্নী সুনীতা আহুজা।
সুনীতা আহুজার কলকাতায় আস্তানার কথা অনেকেরই অজানা। সে প্রসঙ্গ উঠতেই গোবিন্দপত্নী জানালেন, ‘এ বাড়ি আমি আমার মায়ের জন্য কিনেছিলাম। আমার মায়ের যেহেতু বিয়ে হয়েছিল কলকাতায়, আমার দিদি-দাদারা এখানেই জন্মেছেন। আগে ফ্রি-স্কুল স্ট্রিটে আমাদের বাড়ি ছিল। বাবা ছিলেন চলচ্চিত্রের পরিবেশক। মাসির ক্যানসার ধরা পড়ে। সেই থেকেই মা আর মাসি একসঙ্গে এ বাড়িতে থাকতেন।’
কলকাতা শহরটাকে বরাবর খুবই ভালো লাগে সুনীতা আহুজার। তিনি বলেন, ‘মুম্বাইয়ে যখনই ক্লান্ত হয়ে যাই, এখানে এসে আরাম করি। এখানকার মানুষ খুব মিষ্টি। কলকাতা তো মা কালীর শহর, আর আমি নিজে খুব মা কালীর ভক্ত। আজ মাসি নেই, কিন্তু আমি এই ফ্ল্যাট রেখে দিয়েছি। আগে কোনো সংবাদমাধ্যমে এ বাড়িতে আসেননি, এই প্রথম কেউ এলেন। আমার এই বাড়ি খুব ছোট। কিন্তু খুব শান্তির জায়গা।’
ফ্ল্যাটে ঢুকেই রয়েছে গৃহদেবতার ছোট্ট সিংহাসন। সুনীতা আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাসী। সাই বাবার মূর্তির পাশাপাশি রাখা একটি দুর্গামূর্তিও। তিনি বলেন, ‘আমার সব বাড়িতে সাই বাবা থাকেন। আমার মন্দিরেও মা দুর্গা আছেন। আমি খুব আধ্যাত্মিক। দেখুন সোনা, হীরা, মোতির থেকে ঈশ্বর বেশি আছেন। আসলে দেবেন তো ঈশ্বরই! একটা বয়সের পর আধ্যাত্মিকতা খুব জরুরি।’
একবার মাথায় হাত ঠেকিয়ে নেন সুনীতা আহুজা। এর পর না অনর্গল বলে চলেন তিনি, ‘মানুষ সব মিথ্যা বলে, শেষে তো ভগবানের কাছেই যেতে হবে আমাদের সবাইকে। পঞ্চাশ বছর বয়সে মনে হলো, এবার আধ্যাত্মিকতায় মন দিই। আমি সকাল ৪টায় ঘুম থেকে উঠি, যে সময়টাকে ব্রহ্মমুহূর্ত বলা হয়। ওই সূর্যোদয়ের আগে ওঠা খুব জরুরি, ভগবানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারবেন। ৪টায় উঠে আমার মন্দিরে ধ্যান করি। কিন্তু ঈশ্বর সবটাই জানেন, কে ঠিক কে ভুল— সব তিনিই জানেন।’
কলকাতায় ঝটিকা সফরে এসেছেন সুনীতা। দেড় বছর পর এই ফ্ল্যাটে এলেন। সন্ধ্যাবেলায় এদিন তার পছন্দের খাবার ছিল ফুচকা। সেটা খেয়েই বাড়িতে এসে বসলেন। বাড়ির খেয়াল রাখেন যিনি তাকে একটু পরে চা খাবেন বলে রাখলেন। গাঢ় দুধ চা খাবেন বলেই আড্ডায় বসলেন তিনি। সুনীতা বলেন, ‘আমার খুব ভালো লাগল কলকাতায় এসে। আমি কলকাতাতেও কাজ করতে চাই। আমি ‘লকআপ’ করেছি, মুম্বাইয়ে অন্য কাজও করেছি এবং কলকাতাতেও কাজ করতে চাই। শুধু কলকাতাতেই নয়, হায়দরাবাদ, তামিল, তেলুগুতেও কাজ করতে চাই। কাজে মন থাকলে অন্য কোনো ভাবনা মাথায় আসে না, আমি ভালোবেসে কাজ করতে চাই।’
এত বছর পর সুনীতার কাজের ইচ্ছে হলো কেন? কখনো কি গ্ল্যামার জগতের আকর্ষণ অনুভব করেছেন?—এমন প্রশ্নের উত্তরে গোবিন্দপত্নী বলেন, ‘গোবিন্দর আগে আমার কাছে ছবির প্রস্তাব ছিল। গোবিন্দের সঙ্গেই অবশ্য। ‘তন বদন’ সিনেমাটির প্রস্তাব এসেছিল আমার কাছে। আমি করিনি তখন। এখন তো ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেছে। আমার ১৫ বছর বয়সে আংটিবদল হয়েছিল বলে ক্লাস টেনে পড়াশোনা শেষ করতে পারিনি। ১৮-তে বিয়ে হয়েছে। ওই সময় বিয়ে হয়ে যাওয়ায় আর কাজ করিনি। কারণ মা বলেছিলেন— গোবিন্দ খুব ভালো ছেলে, মন দিয়ে সংসার করো। আর আমিও ছোট থেকে মাকে দেখেই বড় হয়েছি। ওই ভালোবাসা অন্ধ হয় না। তখন সংসার করছিলাম, তাই করিনি। তবে তাতে কী? বয়স তো সংখ্যা মাত্র!’
সব নারীর উদ্দেশে সুনীতার বার্তা—‘পজিটিভ থাকতে হবে জীবনে। সব নারীর নিজের পায়ে দাঁড়ানো প্রয়োজন। নিজেকে ভালোবাসুন আর ভগবানের ওপর বিশ্বাস রাখুন। পুরুষের ওপর একেবারে পুরো নির্ভরশীল হবেন না। আমি কাঁদিও ভগবানের কাছে, একা। আমি এত বছর পর গোবিন্দের স্ত্রী থেকে সুনীতা হয়েছি।’
পছন্দের চা আসতেই তার রাঁধুনীকে প্রশ্ন— ‘রান্না হচ্ছে তো’? তিনি উত্তর দেওয়ার আগে নিজেই বলে উঠলেন, ‘ও হ্যাঁ! মাছ হচ্ছে তো।’ নিজে থেকেই সুনীতা বলেন, ‘আমার বাঙালি খাবার খুব পছন্দের। আজ তাই সব বাঙালি রান্না খাব। সর্ষে মাছ, ভাপা ইলিশ, পুঁইশাক ঝিঙের তরকারি রান্না হচ্ছে। এ ছাড়া সন্দেশ, রসগোল্লা, মিষ্টি, দই সব এনেছি। আমি রান্নাও করতাম একসময়, গোবিন্দর জন্যও রান্না করেছি। এখন তো আর হয় না।’
তিনি গান শুনতে ভালোবাসেন, নিজের আলমারি থেকে বার করে তার সঞ্চয়ের সিডি দেখালেন। বললেন, ‘আমি ভজন শুনতে ভালোবাসি। লতাজি, আশাজির গান শুনি আর জপ করি। আমার কাছে ভালো থাকার মন্ত্র হলো নিজেকে ভালোবাসা। নিজের জন্য ভাবো, নিজের জন্য বাঁচো আর আনন্দ করো, ভালোবেসে থাকো। আমি মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। অনেকেই আমাকে ট্রল করেন। যারা ট্রল করেন, তারা অবশ্য মিথ্যা কথা বলেন। আমার বয়স এখন ৫৬। আমার মতো বয়সের মানুষ অনেকেই ভাবেন, কাজ করে আর কী হবে। কিন্তু আমি কাজ করতে চাই।’
গোবিন্দ এবং তার বান্ধবী কোমল রানিকে নিয়ে দিকে দিকে নানা আলোচনা, অস্বস্তিতে সুনীতা? গোবিন্দের বিষয় প্রশ্ন করতেই তার তাৎক্ষণিক জবাব, ‘আমার গোবিন্দকে নিয়ে কিছু বলার নেই। ওর জীবন নিয়েও কিছু বলার নেই। শুধু সুনীতার বিষয়ে কথা বলব। হ্যাঁ আমিও মানুষ, আমার খারাপ লাগলে ভগবানের কাছে গিয়ে বসি। আর আমি কর্মে বিশ্বাসী। ভালো মানুষকে যে দুঃখ দিচ্ছেন, যিনি আমাকে কাঁদাচ্ছেন, যিনি আমার সংসার ভাঙছেন, ভগবান তাকে দেখে নেবেন। তার ওপর সব ছেড়ে দিয়েছি।’
যখন গোবিন্দের সঙ্গে আংটি বদল হয়, তখন সুনীতার বয়স ১৫ বছর। ৪০ বছর তারা একসঙ্গে আছেন। স্মৃতিকাতর গলায় সুনীতা আহুজা বলেন, ‘১৮ বছরে বিয়ে হয়েছে আমার, ১৯-এ মেয়ে হয়। জীবনের সব লড়াই আমরা একসঙ্গে লড়েছি। এটা গোবিন্দেরও ভাবা উচিত। সব কিছু নারীই কেন ভাববে? তারাই কেন মন খারাপ করে থাকবে সবসময়? নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সুনীতা বলে চলেন, ‘‘এক হাতে তো তালি বাজে না, এটা তাঁর সমস্যা। যেখানে তাঁর খুশি তিনি থাকুন। আমি চাই তিনি ভাল থাকুন। নিশ্চয় চল্লিশ বছরে আমার কাছে তিনি কিছু পাননি, যা এখন তিনি পাচ্ছেন। ভগবান ওঁদের আশীর্বাদ দিক। গোবিন্দ আমার তো ছোটবেলার প্রেম, আমি তো তাও শক্ত হয়ে আছি, কাজ করে যাচ্ছি। যাঁর সেখানে সুখ, খুশি সেখানেই থাকুন, সকলের মুখের হাসি অটুট থাক।’’
তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলের সঙ্গে সদ্য একটি ছবিতে কাজ করেছেন। সে বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে চোখ ছলছল মা সুনীতার। তিনি বলেন, ‘‘আমি বাচ্চাদের কখনও বলি না, বাবাকে ছেড়ে দাও। কোনও মানেই হয় না। ওদের বাবা গোবিন্দ। আমি শুধু বলি, আমার মতো শক্ত হও। আমার ছেলে সিনেমায় আসছে, ও খুব পরিশ্রম করেছে। আমি চাই ওর ছবি সুপারহিট হয়ে যাক। আমি চাই ওর উন্নতি হোক।’’
সম্প্রতি সুনীতাকে কোর্টের বাইরে দেখা গেলে, খবর রটে যে গোবিন্দকে নাকি বিচ্ছেদের জন্য আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন সুনীতা। খবরের সত্যতা জানতে চাইলে তিনি খানিক বিরক্ত হয়েই বলেন, ‘‘কোর্টে যাওয়া মানেই বিচ্ছেদ চাইতে যাওয়া নয়। সম্পত্তি বাচ্চাদের নামে করার জন্যও যেতে পারি। আসলে ম্যানেজারদের তো মাসে লক্ষ টাকা বেতন পান, তিনি তো অভিনেতার পক্ষেই কথা বলবেন। সেক্রেটারি তো কারও হন না।’’
এত সমস্যার মধ্যেও এত পজ়িটিভ থাকা, কী ভাবে ম্যানেজ করেন সবটা? সোফায় হেলান দিয়ে সুনীতা ফের হাসতে হাসতে বলে ওঠেন, ‘‘কত সুন্দর অভিনয় করছি দেখুন। জীবনে এত চিন্তা, আমি এত হাসছি। একটাই তো জীবন দিয়েছেন ভগবান, সকলকে বলি খুব আনন্দ করুন। নিজের কথা ভাবুন। ভালবাসা, সম্পর্ক সব মিথ্যা হতে পারে। আর জীবনে টাকা সবচেয়ে বড়, আর নিজের নাম। এখন শুধু সুনীতা সুনীতা।’’
সুনীতার শখ গান শোনা। আর অভিনয়ের আদর্শ মীনাকুমারী। সাক্ষাৎকারের শেষে গোবিন্দকে একটি গান ‘ডেডিকেট’ করতে বললে তিনি বলেন, ‘গোবিন্দকে কিছুই ডেডিকেট করার নেই। নিজেকে করতে পারি। তবে সেই গানেও যেন সূক্ষ্ম কটাক্ষও ছিল। তিনি বলেন, ‘মীনাকুমারী আমার খুব পছন্দের শিল্পী। তার ‘পাকিজা’র গান নিজেকে ডেডিকেট করব। বলেই গেয়ে ওঠেন ‘চলতে চলতে মুঝে কোই মিল গয়া থা।’

-6ac2310b2c081.jpg)
