Logo
Logo
×

পরবাস

প্রবাসীদের ঈদ : উৎসবের হাসির আড়ালে গভীর শূন্যতা

Icon

আহমাদুল কবির, মালয়েশিয়া

প্রকাশ: ২৪ মার্চ ২০২৬, ১০:২৬ পিএম

প্রবাসীদের ঈদ : উৎসবের হাসির আড়ালে গভীর শূন্যতা

ছবি: এআই

সিয়াম সাধনার দীর্ঘ এক মাস শেষে যখন ঈদের চাঁদ আকাশে ধরা দেয়, তখন পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দ, ভালোবাসা আর আত্মত্যাগের অনন্য এক বার্তা। সেই আনন্দের ঢেউ এসে লাগে বাংলাদেশি প্রবাসীদের মনেও। তবে রঙিন উৎসবের আড়ালেও জমে থাকে অজস্র না বলা গল্প, বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস আর প্রিয়জনদের জন্য এক অদৃশ্য টান।

মালয়েশিয়ার ব্যস্ত শহরগুলো বিশেষ করে কুয়ালালামপুর ঈদের সকালে যেন অন্য এক রূপ নেয়। নতুন পোশাকে সেজে প্রবাসীরা ছুটে যান ঈদের নামাজে। নামাজ শেষে কোলাকুলি, শুভেচ্ছা বিনিময় সব মিলিয়ে মুহূর্তগুলোয় গড়ে ওঠে এক টুকরো বাংলাদেশ।  ক্ষণিকের জন্য ভুলে যান দূরত্ব, ভুলে যান একাকিত্ব।

কিন্তু এ হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে গভীর এক শূন্যতা। কারো বাবা আর নেই, কারো মা হারিয়ে গেছেন না ফেরার দেশে, কেউবা হারিয়েছেন প্রিয় ভাই-বোন। অথচ শেষবারের মতো মুখ দেখা হয়নি, জানাজায় যাওয়া হয়নি, একমুঠো মাটি দেওয়াও হয়নি। এ না-পারার বেদনা প্রবাস জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্য।

নির্মাণশ্রমিক রফিকুল ইসলামের কণ্ঠে সেই বেদনার ভার স্পষ্ট। তিনি বলেন, বাবা মারা গেলেন, আমি যেতে পারলাম না। ভিডিও কলে জানাজা দেখেছি, নিজের বাবার কবরে মাটি দিতে পারিনি। এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে? ঈদ এলে সবকিছু আবার মনে পড়ে।

রেস্টুরেন্ট কর্মী শরিফ মিয়ার চোখেও একই হাহাকার। তিনি বলেন, মা অসুস্থ ছিলেন, পরে চলে গেলেন। ছুটি পাইনি, একবার যদি মায়ের হাতটা ধরতে পারতাম! ঈদের দিনে সবাই খুশি থাকে, আর আমার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যায়।

তবুও জীবন থেমে থাকে না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ, দায়িত্ব আর টিকে থাকার লড়াই চলতেই থাকে। ঈদের দিনটুকুতে একটু সময় বের করে ভিডিও কলে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন তারা। পর্দার ওপাশে হাসিমুখ, এপাশে নীরব চোখের জল স্পর্শহীন ভালোবাসা যেন আরও বেশি কষ্ট দেয়।

অন্যদিকে কিছু প্রবাসী চেষ্টা করেন একাকিত্ব ভাঙতে। মালয়েশিয়ায় কর্মরত তথ্য প্রযুক্তি পেশাজীবী পাভেল সারওয়ার বলেন, আমরা চেষ্টা করি একসঙ্গে রান্না করে খেতে, গান গাইতে, ছবি তুলতে। এতে করে একাকিত্বটা কিছুটা কমে যায়। কিন্তু ভেতরের শূন্যতা পুরোপুরি কমে না।

দেশে থাকা পরিবারগুলোর অবস্থাও ভিন্ন নয়। কুমিল্লার গৃহিণী নাজমা বেগম বলেন, ঈদে স্বামী পাশে না থাকলে আনন্দ পূর্ণ হয় না। বাচ্চারা নতুন জামা পরে, কিন্তু বার বার বাবাকে খোঁজে, তখন কিছু বলার থাকে না, খুব কষ্ট লাগে। 

রফিকুল ইসলামের মা বলেন, ছেলেটা কষ্ট করে টাকা পাঠায়, তাই কিছু বলি না। কিন্তু ঈদের দিন ঘরটা ফাঁকা লাগে, খুব ফাঁকা।

শিশুদের ঈদও যেন অপূর্ণ। ভিডিও কলে বাবাকে দেখে তারা হাসে, হাত নাড়ায়, কিন্তু সেই হাসিতে নেই ছোঁয়ার উষ্ণতা। তবুও এ ভার্চুয়াল মুহূর্তই তাদের ঈদের সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।

মালয়েশিয়ায় অতিরিক্ত ছুটির ঘোষণা অনেকের মনে আনন্দ বাড়ালেও অবৈধ প্রবাসীদের জন্য ঈদ যেন ভয় আর অনিশ্চয়তার। ঈদের আনন্দের মাঝেই চলে তল্লাশি, আতঙ্ক আর লুকিয়ে থাকার জীবন।

তবুও বিকাল গড়ালে পার্ক, লেক আর পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ভিড় জমে প্রবাসীদের। কেউ ছবি তোলেন, কেউ গল্প করেন, কেউ চুপচাপ বসে থাকেন। হয়তো তারা কল্পনায় ফিরে যান দূরের সেই বাড়িতে, যেখানে অপেক্ষা করে আছে প্রিয় মুখগুলো অথবা এমন কিছু স্মৃতি; যাদের কাছে আর কোনোদিন ফেরা হবে না।

ঈদকে ঘিরে প্রবাসীদের এ মিলনমেলা শুধু আনন্দের নয় বরং ভাগাভাগি হয় দুঃখ, কষ্ট আর আশার। এখানে কেউ নতুন কাজের কথা বলেন, কেউ দেশের খবর আনেন। অনেকেই ঈদের দিনও কাজ করেন; যাতে পরিবারের জন্য আরও কিছু টাকা পাঠাতে পারেন। 

প্রবাসীদের চোখ ভিজে থাকলেও ঠোঁটে থাকে হাসি। কারণ তারা জানেন- তাদের এ ত্যাগই একদিন পরিবারকে এনে দেবে স্বস্তি, স্বচ্ছলতা আর নতুন এক সুখের সকাল।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম