Logo
Logo
×

Advertisement

পরবাস

আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে দালালচক্রের বিস্তার, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা

Advertisement

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০১ পিএম

আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে দালালচক্রের বিস্তার, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা

মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়।

Advertisement

এক হাজার বছরেরও অধিক সময় ধরে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের অবিচল কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় আজ এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি। 

যে প্রতিষ্ঠানের নাম একসময় ছিল আলোকবর্তিকা, আজ সেই নামকেই ঢাল বানিয়ে এক শ্রেণির অসাধু দালালচক্র প্রতারণা, জালিয়াতি ও অপরাধের সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে—যার অভিঘাত কেবল ব্যক্তি বা পরিবারে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি জাতির সম্মান, একটি ঐতিহ্যের মর্যাদা এবং একটি বৈশ্বিক ইসলামী প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও আঘাত করছে। 

তদন্তে উঠে এসেছে, মিশরে অবস্থানরত কিছু বাংলাদেশি ‘নামধারী ছাত্র’ নিজেদের পরিচয়কে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে দেশে বসে থাকা নিরীহ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। 

তাদের কৌশল সুপরিকল্পিত ‘নিশ্চিত ভর্তি’, ‘সহজ মিনহা (স্কলারশিপ)’, ‘দ্রুত প্রতিষ্ঠা’ এসব লোভনীয় প্রতিশ্রুতির ফাঁদে ফেলে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। 

অথচ বাস্তবতা হলো, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়-এ ভর্তি একটি কঠোর একাডেমিক প্রক্রিয়া, যেখানে যোগ্যতা, যাচাই ও আনুষ্ঠানিকতার প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। 

প্রতারণার ধরণও ক্রমশ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ভুয়া সিল-স্ট্যাম্প ব্যবহার করে জাল সার্টিফিকেট তৈরি, তথাকথিত স্কলারশিপের নামে অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ ডলার লেনদেন এসব যেন এখন নিয়মিত চিত্র। 

আরও উদ্বেগজনক অভিযোগ রয়েছে এই চক্রের একটি অংশ ইউরোপমুখী মানবপাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যেখানে ‘আজহারের ছাত্র’ পরিচয়কে ব্যবহার করা হচ্ছে বিশ্বাস অর্জনের ছদ্মবেশ হিসেবে। অর্থাৎ, শিক্ষা ও ধর্মীয় আবেগ দুটোকেই তারা বাণিজ্যের নিষ্ঠুর পণ্যে পরিণত করেছে। 

বিশেষভাবে টার্গেট করা হচ্ছে সদ্য হিফজ সম্পন্ন করা তরুণ এবং আলিম ও দাওরা পরীক্ষার্থীদের। পরিবারগুলোর ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে ‘আজহারে ভর্তির নিশ্চয়তা’র প্রলোভন দেখিয়ে তাদের মিশরে নিয়ে আসা হচ্ছে। এরপর শুরু হয় বাস্তবতার নির্মমতা ভর্তি অনিশ্চিত, থাকার ব্যবস্থা অনিরাপদ, আইনি কাগজপত্র জটিল, অনেকেই পড়ে যাচ্ছে আর্থিক ও মানসিক সংকটে। 

কিছু ক্ষেত্রে তথাকথিত ‘মারকাজ’ খুলে এই দালালি কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। 

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মিশরে অধ্যয়নরত প্রকৃত শিক্ষার্থীরা। তাদের ওপর বাড়ছে প্রশাসনিক নজরদারি, জটিল হচ্ছে ‘একামা’ বা বৈধ আবাসনের প্রক্রিয়া, আর একটি অসাধু গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের দায়ভার এসে পড়ছে পুরো কমিউনিটির ওপর। 

ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়-এ অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, এই দালালচক্র কেবল প্রতারণা করছে না, তারা আজহারের মর্যাদাকেই পরিকল্পিতভাবে ক্ষুণ্ন করছে। 

শিক্ষার্থী মুহাম্মদ আম্মার হোসাইন বলেন, ‘আমরা আলিম শেষ করে এখানে এসে কত কষ্ট করে মুয়াদালা (সমমান) সম্পন্ন করেছি এটা সহজ কোনো বিষয় নয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে, কঠোর যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে এখানে পড়ার সুযোগ পাওয়া যায়। অথচ দালালরা দেশে বসে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে আজহারিদের সম্মান নষ্ট করছে। আমি সবাইকে সতর্ক করছি এই প্রতারণার ফাঁদে পা দেবেন না।”’

শিক্ষার্থী শরীফ সালাউদ্দিনের কণ্ঠে ছিল তীব্র ক্ষোভ। তিনি বলেন, এই দালালদের কারণে দেশে আল-আজহারের মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটি কেবল ব্যক্তিগত প্রতারণা নয়, এটি একটি ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে অপরাধ। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। 

আরও কঠোর ভাষায় সতর্ক করেন আবু সুফিয়ান মোহাম্মদ ইয়াসিন। তিনি বলেন, এদের বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে দেশে আজহারিদের কোনো সম্মান অবশিষ্ট থাকবে না। যারা ছাত্র পরিচয়ে মানবপাচারের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িত, তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে। 

বিশ্লেষকদের মতে, এই দালালচক্রের কর্মকাণ্ড কেবল প্রতারণার সীমায় আবদ্ধ নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈশ্বিক আস্থাকেও দুর্বল করে দিচ্ছে। 

ইতোমধ্যে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ধরনের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে এবং জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে কোনো অবৈধ কার্যক্রম সহ্য করা হবে না। 

এই প্রেক্ষাপটে সময়ের দাবি স্পষ্ট সচেতনতা, যাচাই-বাছাই এবং আইনগত পদক্ষেপ। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে, জ্ঞানের পথে কোনো শর্টকাট নেই, আল-আজহারের মতো প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের প্রতিটি ধাপই স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক। 

অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি ও আইনি ব্যবস্থা, যাতে এই প্রতারণা-চক্রের শিকড় উপড়ে ফেলা যায়। কারণ একটি ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানকেন্দ্রের নামকে ব্যবহার করে প্রতারণা শুধু অপরাধ নয়, এটি ইতিহাসের সঙ্গে প্রতারণা, বিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। 

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কেবল দালালদের নয়, প্রশ্নটি আমাদের সম্মিলিত দায়বদ্ধতার আমরা কি ঐতিহ্যকে রক্ষা করব, নাকি প্রতারণার কাছে তা সমর্পণ করব? 

লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

বিদেশে পিএইচডি করতে গিয়ে নারীর সঙ্গে প্রতারণা

বিদেশে পিএইচডি করতে গিয়ে নারীর সঙ্গে প্রতারণা

হজ এজেন্সির প্রতারণা, হাজিদের থাকা, খাওয়া ও যাতায়াতে ভোগান্তি

হজ এজেন্সির প্রতারণা, হাজিদের থাকা, খাওয়া ও যাতায়াতে ভোগান্তি

অনলাইনে পার্টটাইম চাকরির ফাঁদে ২৪ লাখ টাকা খোয়ালেন ব্যবসায়ী, গ্রেফতার তরুণী

অনলাইনে পার্টটাইম চাকরির ফাঁদে ২৪ লাখ টাকা খোয়ালেন ব্যবসায়ী, গ্রেফতার তরুণী

থাই নারী ভারতে এসে জানলেন স্বামীর ঘরে তিন সন্তান, প্রতারণা নিয়ে চাঞ্চল্য

থাই নারী ভারতে এসে জানলেন স্বামীর ঘরে তিন সন্তান, প্রতারণা নিয়ে চাঞ্চল্য

মার্কিন ডাক বিভাগে ১২৬ মিলিয়ন ডলারের প্রতারণা

পাকিস্তানি নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা মার্কিন ডাক বিভাগে ১২৬ মিলিয়ন ডলারের প্রতারণা

নারীর গোসলের ছবি ছড়ানোর ভয় দেখিয়ে ১৫ লাখ টাকা দাবি

নারীর গোসলের ছবি ছড়ানোর ভয় দেখিয়ে ১৫ লাখ টাকা দাবি

আরও পড়ুন

মালয়েশিয়ায় নির্মাণাধীন ভবনে অভিযান, ১৯৯ বাংলাদেশিসহ আটক ৬৩০

মালয়েশিয়ায় নির্মাণাধীন ভবনে অভিযান, ১৯৯ বাংলাদেশিসহ আটক ৬৩০

ফ্রান্সে গণদাবি পরিষদের আহ্বায়ক কমিটি গঠন

ফ্রান্সে গণদাবি পরিষদের আহ্বায়ক কমিটি গঠন

সৌদিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য দূতাবাসের জরুরি সতর্কবার্তা

সৌদিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য দূতাবাসের জরুরি সতর্কবার্তা

সৌদিতে হামলায় হতাহত বাংলাদেশিদের পরিচয় জানা গেছে

সৌদিতে হামলায় হতাহত বাংলাদেশিদের পরিচয় জানা গেছে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম