আবার হবে তো দেখা, নাকি এ দেখাই শেষ দেখা?

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১৩:০৬ | অনলাইন সংস্করণ

স্পেনের মালাগা

স্পেনের মালাগা প্রদেশের এক ট্রেডিশন্যাল ব্রেকফাস্ট হলো সুরর্স (Churros)। সুরর্সের বর্ণনা দিতে গেলে বলতে হয় দেখতে জিলেপির মতো তবে আকারে মোটা।

গরম চকলেটের মধ্যে ডুবিয়ে এ সুরর্স খেতে প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে ১২টা পর্যন্ত প্রচুর ভিড় জমে সুরেরিয়া (Churreria) বা সুরর্সের রেস্টুরেন্টে।

এ খাবার স্প্যানিশদের কাছে যেমন ট্রেডিশন্যাল এবং মজার, তেমনই ট্যুরিস্টদের বেলায়ও একই অবস্থা। আমি আর মারিয়া (আমার স্ত্রী) সকালে বাসা থেকে বের হয়েছি সুরর্স খেতে। এসে দেখি পুরো রেস্টুরেন্ট লোকে ভরা, বসার কোন জায়গা নেই।

হঠাৎ চোখ পড়লো দূরের এক টেবিলে। যেখানে চারজনের বসার ব্যবস্থা রয়েছে অথচ মাত্র দুই রমণী বসে দিব্বি মজা করে সুরর্স খাচ্ছে। আমি সামনে গিয়ে বললাম ‘আমরা দুজনে কি তোমাদের সঙ্গে একই টেবিলে বসতে পারি?’ বেশ আনন্দের সঙ্গে বললো প্লীজ। আমি আর মারিয়া বসে সুরর্সের অর্ডার দিলাম। কিছুক্ষণ পরে ওয়েট্রেস সুরর্সের সঙ্গে গরম চকলেট এবং কফি ল্যাটে (Coffee Late) সার্ভ করে চলে গেলো।

টেবিলের এই দুই রমণী দেখতে অবিকল একে অপরের কপি। বেশ কিউরিয়াস কিন্তু কোন কথা হলো না। একই টেবিলে বসে সকালের নাস্তা চলছে দুই অপরিচিত নাম না জানা রমণীর সঙ্গে। আমরা যেমন গোপনে গোপনে তাদের দেখছি তারাও আমাদের দিকে নজর ফেলছে তবে কোন কথা হলো না।

খাবার শেষে তারা চলে গেলো তাদের মতো। শুধু যাবার বেলা একটু মুচকি হাসি দিয়ে বলে গেলো এঞ্জয় ইওর ব্রেকফাষ্ট (Enjoy your breakfast)। সারাদিন ঘোরাঘুরির পর সন্ধ্যায় ডিনারে এসেছি ফুয়েনসিরোলা হোটেল এল পুয়ের্টোতে (Fuengirola hotel El Puerto)।

আজ রাতে মারিয়ার বান্ধবীরা দাওয়াত করেছে স্প্যানিশ আরেক ট্রেডিশনাল খাবার পাইয়েয়া (Paella, দুটো “L”এক সঙ্গে থাকলে স্প্যানিশ ভাষায় উচ্চারণ হয় “J”, কিন্ত J-এর উচ্চারণ ওরা “য়” দিয়ে করে। সেজন্য শুদ্ধ উচ্চারণ হয় পাইয়েয়া) সঙ্গে পিয়ানো বাজনা এবং ফ্লামেনকো ডান্স (Flamenco Dance)। বেশ জমে উঠেছে শনিবারের সন্ধ্যা। খাবার শেষ করে সরাসরি বাসায় না গিয়ে কফির আড্ডায় মারিয়ার বান্ধবীদের সঙ্গে একই হোটেলে সবাই জড়ো হয়েছি।

হঠাৎ চোখ পড়ে গেলো দুই রমণীর দিকে। তাদের নজরও পড়েছে আমার দিকে। এরাতো সকালের সেই দুই রমণী যাদের সঙ্গে একই টেবিলে বসে সকালের নাস্তা খেয়েছি। পরিচয়ে অনেকক্ষণ কিছু কথা কিছু মত বিনিময় হলো। তারা দুই জমজ বোন নাম ডায়ানে এবং জুন। বাড়ি লন্ডনের রেডহিলে (London Redhill)।

এসেছে বেড়াতে তিন সপ্তাহের জন্য মালাগায়। বয়স ৩৬ বছর, বিয়ে করেনি তবে কয়েকবার প্রেম করেছে। আলাপের শুরুতেই বেশ মজা পেয়ে গেলাম। তাই অনেক কথা জানার সৌভাগ্য হতে লাগলো।

মনে হচ্ছে অনেক দিনের চেনাজানা। প্রথমে মারিয়া আমার উপর একটু বিরক্ত হয়েছিল বটে পরে আমার সঙ্গে জুন এবং ডায়ানের ইন্টিমেট (Intimate) আলোচনায় দেখি সেও বেশ মজা পেতে শুরু করেছে। জিজ্ঞেস করলাম কেনো বিয়ে করেনি তারা। দিব্বি সব বিষয়ে মনের আনন্দে বলে যাচ্ছে কোন রকম জড়তা ছাড়া। আমি জিজ্ঞেস করলাম তারা আইডেন্টিক্যাল নাকি ফ্রাটেরনাল। উত্তরে বললো খুব বেশি আইডেন্টিক্যাল যার কারনে জীবনে বিয়ে করতেও পারেনি।

আমি আরো বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করলাম। ডায়ানে বললো যে ছেলেকে আমি পছন্দ করি তারও (জুন) সেই ছেলে পছন্দ। যতবার চেষ্টা করেছি ফল একই। শেষে সিদ্ধান্তে এসেছি বিয়েই করব না। তাই দুই বোনের বসবাস, কাজ, ছুটি কাটানো সবই একসঙ্গে চলছে। আমাদের সঙ্গে কথা বলছে এবং যা বলছে তাতেও নেই তাদের দ্বিমত। পোশাক, চোখের চশমা, চুলের রং এবং তাদের ভাবভঙ্গি সবই এক রকম।

রাত বেশ হয়েছে তাই আমাদের যেতে হবে। এরমধ্যে হঠাৎ ফুটবল খেলা শুরু হলো টিভিতে। ডায়ানে ফুটবলের পাগল এবং খেলা শুরু হয়েছে জুভেন্টাস (Juventus) এবং আয়ক্সের(Ajax) মধ্যে। খেলা জমেছে ভালোই, কথা প্রসঙ্গে জুন বললো সে ক্রিকেটের পাগল। বাসায় যাবার তাড়া ছিল কিন্তু তাও কমে গেলো। প্রশ্ন করলাম খেলার ব্যাপারে কেনো ভিন্ন পছন্দ তোমাদের? তারা বললো ঐ একটি জায়গায় আমাদের দ্বিমত রয়েছে তবে কেনো তা জানি না। এবারের ইংল্যান্ডের ওয়ার্ডকাপ ক্রিকেটের সবগুলো ম্যাচ তারা লাইভ দেখবে যদিও কিছু কিছু ম্যাচের টিকিটের দাম ২/৩ হাজার পাউন্ড।

সবচেয়ে যে কথাগুলোয় বেশি মুগ্ধ হয়েছিলাম তা হলো তারা যখন বেশ আনন্দের সঙ্গে বাংলাদেশে ক্রিকেট টিমের উপর বর্ণনা দিতে শুরু করলো। একের পর এক খেলোয়াড়দের নাম সঙ্গে তাদের দক্ষতা এবং পারদর্শিতার কথা বলতে লাগলো। শুনে বেশ অবাক হলাম এবং গর্ববোধ করলাম। একই সঙ্গে এই প্রথম বাংলাদেশের উপর দূর্নীতি বা দারিদ্রতা নিয়ে কথা হলো না। কথা হলো মনের আনন্দে ক্রিকেটের ওপর।

ক্রিকেটের পরিচয়ে বাংলাদেশেকে নিয়ে আলোচনা যা সত্যি মনের মাঝে নতুন করে আরও প্রেরণা বাড়িয়ে দিলো। কবে হবে ফুটবল হ্যান্ট একাডেমি বাংলাদেশে এবং কবে লাল সবুজের পতাকা উড়বে বিশ্বকাপ ফুটবলের মাঠে! বিদায় নেয়ার পালা, হঠাৎ জুন বললো জীবনে কত দেশ ঘুরেছি এত আগ্রহের সঙ্গে কেউ আমাদের সঙ্গে এতক্ষণ ধরে এত কথা কখনও বলেনি যা তোমরা বলেছো।

বিদায় পর্বে ডায়ানে বললো ‘আবার হবে তো দেখা, নাকি এ দেখাই শেষ দেখা’! বলেছি পরেরবার বিলেতে গেলে অবশ্যই দেখা করব। রাত অনেক হয়েছে আমি আর মারিয়া চাঁদের আলোয় সাগরের পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে বাসায় এসে ঘুমাতে গেলাম। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে, কারন ভোরে পাহাড়ের উপরে মিসাছ (Mijas) নামের এক গ্রাম ভ্রমণে যেতে হবে তাই।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×