শিক্ষার দুর্দিনে স্মরণ করছি একজন গুরুজনকে

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ২৪ আগস্ট ২০১৯, ১২:৩২ | অনলাইন সংস্করণ

গুরুজন

আমি তার সম্পর্কে আগেই লিখেছি। একজন সমাজসেবী এবং গ্রামবাংলার আদর্শ ছেলে, যার নাম মো. শাহজাহান মিয়া। সে যে স্কুলে পড়েছে সেখানে আমি নিজেও পড়েছি। শাহজাহানের ফেসবুকে তুলে ধরা একজন প্রিয় শিক্ষাগুরুর ওপর অনেকের স্মৃতিচারণ দেখে মুগ্ধ হয়েছি।

আদর্শ শিক্ষকের প্রতি তার শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ দেখে বেশ আপ্লুত হয়েছি। শাহজাহানের লেখার কিছু অংশবিশেষের সঙ্গে তুলে ধরলাম আমার সঙ্গে সেই শিক্ষাগুরুর কিছু মানঅভিমানের স্মৃতি, যা আজও রয়েছে মনের মাঝে গাঁথা। শাহজাহান লিখেছে: পতিত বাবুর দীর্ঘ দিনের সহকর্মী শ্রদ্ধেয় অমর কুমার চক্রবর্তী স্যার এবং দূর্গাপদ দাস স্যার বলেন, কর্মজীবনে কখনও তাঁকে পরে আসতে বা আগে স্কুল ত্যাগ করতে দেখিনি। ঝড়বৃষ্টি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপেক্ষা করে তিনি প্রতিদিন স্কুলে উপস্থিত থাকতেন।

আজকের যুগে তাদের মতো আদর্শ শিক্ষক, গুরজনদের অভাব পূরণ হয়েছে কিনা সেটি সকলের ভাবনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। একজন শিক্ষক এবং একজন মজার মানুষকে তুলে ধরার জন্য শাহজাহানকে আবারও ধন্যবাদ। আমি অষ্টম এবং নবম শ্রেণির কিছু সময় পড়েছি নহাটা হাইস্কুলে। ৪০ বছর আগের কথা। ডিসি সাহেব যশোর থেকে স্কুল পরিদর্শন করতে আসবেন, নানা ধরণের প্রস্তুতি পর্ব চলছে।

পতিত ঘোষ স্যার ক্লাসে অলওয়েজ (Always ) বানান জিজ্ঞেস করছেন সবাইকে, যারা বানান ভুল বলছে তাদের নাম লিস্ট করে বলছেন, তাদের সবার কাল ছুটি। আমি বললাম স্যার, কারণ কী? স্যার বললেন, "ওরা কাল আমার চাকরি খাবে। অলওয়েজ বানান যারা পারে না তাদের কাল স্কুলে আসার দরকার নেই"। আমি বললাম, "স্যার ডিসি সাহেব যদি দেখেন ছাত্রছাত্রী এত কম তাহলে তো আরো সমস্যা হবে।" তখন স্যার বলেছিলেন তুই তো ঠিকই বলেছিস, তবে এ গাঁধাদের কী করবো? পরে বলেছিলেন আমি নিজেই কাল আর স্কুলে আসবো না। হাসি তামাশার মাঝে একটি জিনিস লক্ষ্য করেছিলাম, সবাই আর কিছু না শিখুক 'অলওয়েজ' বানানটি শিখেছিল সেদিন। তারপর যেমন স্বাধীনতা উদযাপন করা ছিল একটি বিশাল আনন্দের ব্যাপার।

রাত জেগে রিহার্সাল (rehearsal) দেয়া ছিল স্কুলজীবনের একটি মধুময় ঘটনা। সারাদিন স্কুলে সময় কাটানো হয়েছে তখন রিহার্সালের কারণে। হাটে গিয়ে চাঁদা তুলেছি স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের জন্য। রাত জেগে স্কুলের চারপাশ সাজানো হয়েছে। তখন মাঝেমধ্যে স্কুলেই রান্না করা হতো। স্কুলে নতুন পুকুর কাটা হয়েছে। প্রচুর মাছ হয়েছে পুকুরে। কোনো একদিন পুকুরের মাছ রান্না করা হলো। দুপুরে আমরা কিছু সংখ্যক ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকবৃন্দ মিলে লাঞ্চ করবো। স্যার আমাকে আগেই বলেছেন মাছের মাথাটা যেন তাঁকে দেয়া হয়। তখন কালিদা ছিলেন স্কুলের দপ্তরি। কালিদা খাবার বেড়ে দিচ্ছেন। আমি স্যারের পাশে বসেছি। কালিদাকে বললাম, দাদা মাথাটা স্যারকে দেন। দাদা স্যারকে দিতেই স্যার বলছেন, না না মাহাবকে দাও। কালিদা সঙ্গে সঙ্গে আমার থালায় মাথাটা দিয়ে দিলেন।

স্যার আমার প্রতি ভীষণভাবে রেগে ছিলেন সেদিন, এই ভেবে যে, তিনি ভদ্রতার খাতিরে বলেছিলেন মাথাটা আমাকে দিতে, অথচ আমি কিভাবে তা নিলাম। যাইহোক পরেরদিন ক্লাসে পড়ার বাইরে আমাকে নানা ধরনের প্রশ্ন করে শাস্তি দিয়েছিলেন আমার ব্যবহারে। আমার স্কুলজীবনে স্যারের সঙ্গে শুধু গুরুজনের সম্পর্ক নয়, ছিল একজন ভালো বন্ধুর মতো সম্পর্ক, যা ছিল বিরল। স্যারের ছোট ভাই সুন্দর গান গাইতেন, হিন্দু ধর্মীয় গান। আমি রাত জেগে তাঁর গান শুনেছি। মনে পড়ে এখনও সে গানের কিছু কথা, “আমার ভোজনে তারা পাঠা বলি দেয় রে”। রাতে খেয়েছি সেই পাঠার গোস্ত আর শুনেছি কীর্তন গান, যা আজো মনের রাজ্যে এক মনোমুগ্ধকর স্মৃতি হয়ে রয়েছে।

আজ এত বছর পর অতীতের কিছু স্মৃতি আর হৃদয়ের কিছু কথা মনে পড় গেল একজন গুরুজনের সম্পর্কে। যদি বাংলাদেশের সকলে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের মধ্য দিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে তাহলে পতিত ঘোষ স্যারের মতো হাজারো পতিত ঘোষ স্যার তৈরি হবে। আর হাজারো পতিত ঘোষ স্যার তৈরি হলে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে সমস্থ শিক্ষার্থীবৃন্দ। আর জাতি পাবে আদর্শ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। সুতরাং আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা, আদর্শ শিক্ষক ও আদর্শ প্রশাসক অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত হবে। আর আমরা বহুফুলের সমন্বয়ে একটি ফুলের মালা গেঁথে তৈরি করবো ভালোবাসার বাংলাদেশ।

আমাদের সবার প্রিয় গুরুজন পতিত পাবন ঘোষ, মানুষ গড়ার মহান ব্রত এবং আলোর ফেরিওয়ালা হয়ে ১৯৬৫ সালের ২ জুন নহাটা রাণী পতিত পাবনী উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। সৃষ্টিকর্তার ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৯৯ সালের ২২ আগস্ট পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরলোকগমন করেন। স্যারের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকীর এ দিনে তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি আমরা নহাটা রাণী পতিত পাবনী উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীবৃন্দ।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×