ঝরা পাতা

  মোহাম্মদ হানিফ, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২০:৩৬ | অনলাইন সংস্করণ

ঝরা পাতা

প্রকৃতির দরজায় কড়া নাড়ছে শীত। চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা সবুজ গাছপালা। এ সময়ে প্রকৃতিও যেন তার আপন রং বদলায়। গাছের পাতাগুলো রং পাল্টাতে শুরু করেছে। সবুজ থেকে হলুদ বর্ণ; সবশেষ লালচে বর্ণের। বিবর্ণ পাতাগুলো আস্তে আস্তে ঝরতে শুরু করে। একটা সময় সব পাতা ঝরে পড়ে।

আর শূন্য ডালপালা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে শুধু গাছের গুঁড়িটি। বলছিলাম চার ঋতুতে বৈচিত্র্যময় দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার কথা। কোরিয়ান ভাষাতে, 봄(বোম) বসন্ত, 여름(ইওরূম)গ্রীষ্ম, 가을(খাঊল)শরৎ ও 겨울(খিওয়ুল)শীত।

এরইমধ্যে কোরিয়ার আবহাওয়ায় শীতের আমন্ত্রণ। পাশ্চাত্যে এই মৌসুমকে বলা হয় “Fall”। কারণ এ সময়ে একটু বাতাস পেলেই গাছের এই মুচমুচে শুকনো পাতাগুলো ঝরে পড়ে। রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটার সময় পায়ের নিচে পড়া শুকনো পাতাগুলোর কচকচে শব্দ।

চলাচলের রাস্তা যেন লালছে পাতার বাহারি লালগালিচা হয়ে আছে। এই প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে ক্যামরায় বন্দি করার জন্য অনেকেই ঘুরতে বের হন। শীতকাল এলেই এমন চিত্র দেখা যায়।

দেখলে মনে হয়ে মৃতগাছ। প্রতিদিনই রাস্তার পড়ে থাকা পাতাগুলো পরিস্কার করতে করতে ফের জায়গাটা ভরে যায় পাতায়-পাতায়। সেই শুকনো পাতার আস্তরণের নিচে চাপা পড়ে যায় নিচের মাটি। আসলে কেন শীতকাল আসলেই গাছের পাতা শুকিয়ে যায় কখনো কি একবার ভেবেছি। কেনই বা গাছ পাতাহীন হয়ে

পড়ে? গাছের সবুজ পাতায় রয়েছে ক্লোরোফিল। এই কারণে পাতায় গাছের খাবার তৈরি হয় এবং এই খাবার গাছের সারা শরীরে ছড়িয়ে গিয়ে গাছকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে। এ ছাড়াও গাছের পাতা নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নিতে সাহায্য করে। সেটা কিভাবে? বেঁচে থাকার জন্য আমাদের মতো গাছেরও অক্সিজেন গ্রহণ এবং কার্বন ডাই অক্সাইড বর্জন করতে হয়এবং এই কাজটা হয়পাতার মাধ্যমে। আরও একটি কাজ করে এই পাতার গুচ্ছ। আর তা হলো গাছকে ঘামতে সাহায্য করা! গাছ মাটি থেকে যতখানি পানি তোলে ততখানি পানি তার শারীরবৃত্তীয় কাজে ব্যবহৃত হয় না। অতিরিক্ত পানিটুকু বাষ্পাকারে ছেড়ে দেয়া হয় পাতা থেকে।

যার থেকে সৃষ্টি হয় পাতা ঝরা। শীতকালের শুরুতে যখন দিনের দৈর্ঘ্য ছোট হতে শুরু করে, বাতাসের তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা দুটোই কমতে থাকে তখন গাছের শরীরে তৈরি হয় একটি হরমোন, যাতে পাতাগুলো নির্দেশ পায় ঝরে পড়ার।

পাতা যেখানে গাছের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, সেখানে তৈরি হয় ছোট ছোট কিছু কোষের। এ কোষগুলোর নাম কর্তন কোষ। কিছুদিনের মাঝেই এই কোষগুলো আকারে এবং সংখ্যায় বৃদ্ধি পেয়ে একটা গাছ এবং পাতার মাঝে একটি চিকন অঞ্চল তৈরি করে। এই অঞ্চলটি পাতাকে ক্রমশ গাছ থেকে আলাদা করে ফেলে এবং একটু

বাতাস পেলেই সেই পাতাটিকে একেবারেই গাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। গাছের সব পাতার গোড়াতেই এই অঞ্চল তৈরি হয় ফলে পাতা ঝরে যায়।

কিছু গাছ প্রতি বছর তাদের পাতা হারাতে থাকে। এই গাছগুলিকে পর্ণমোচী গাছ বলা হয় এবং তারা মৌসুমের প্রতিক্রিয়াতে তাদের পাতা হারাতে থাকে। শীতকালীন শীত এবং তুষারযুক্ত এমন জায়গাগুলিতে এমন গাছ বেশি জন্মে। যখন এটি খুব ঠান্ডা পড়ে তখন গাছের জল হিমশীতল হতে হয়ে যায় ফলে পাতাগুলি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। আবার যখন শরৎ চলে আসে তখন পাতাগুলি থেকে পুষ্টি গ্রহণ শুরু করে- এটি যখন আমরা তাদের রঙ পরিবর্তন করতে দেখি।

চলতি মাস থেকে ফেব্রুয়ারি সময়টুকু হলো শীতকাল। বাইরে কোনো খাবার রাখলে ফ্রিজের প্রয়োজন হয় না।

-২৫ ডিগ্রি তাপমাত্রাও অতিক্রম করে মাঝে মধ্যে। নদী-নালা সব বরফ হয়ে যায়। মাঝে মাঝে সমুদ্রের লোনা পানিও বরফ হয়ে যায়। পুকুরের পানিতে বরফের আস্তর পড়ে থাকে। এতো কিছুর মাঝেও তুষারে সাদা শুভ্র প্রকৃতি। যেদিকেই তাকাই শুধু সাদা আর সাদা। অপরূপ মনোরম দৃশ্য যদিও তুষারে জীবনযাপন

কিছুটা কষ্টের।

আমি দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাস করতে পছন্দ করি। তবে অবশ্যই এই দেশে ভ্রমণ করার জন্য ভালো ও

খারাপ সময় দুটাই আছে। গরম এবং শীতকালীন। ভ্রমণের জন্য বসন্ত একটি দুর্দান্ত সময়। তবে সর্বোত্তম সময়টি অবশ্যই শরৎ। এর সবচেয়ে সুন্দর সময় হলো অক্টোবরের শেষ থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি। এ সময় দক্ষিণ কোরিয়াতে কিছু ঋতুর বৈচিত্রতায় অপরূপ সাজ দেখার জন্য ঘুরে আসতে পারেন কিছু দর্শনীয় স্থান।

নাইজংসন জাতীয় উদ্যান: দক্ষিণ কোরিয়ায় এই সময়টাতে গাছের পাতা দেখার জন্য সেরা স্থান হিসেবে চিহ্নিত, নায়েজানসান জাতীয় উদ্যানটি সিওল থেকে অনেক দীর্ঘ পথ, তবে ভ্রমণের পক্ষে উপযুক্ত। অক্টোবরের শেষের দিকে থেকে নভেম্বর মধ্যে এই স্থানটি গাছের পাতার কারণে অনেক দর্শনীয়। নায়েজং, যার অর্থ

অনেক গোপনীয়তা, মনোরম উপহারে ভরা। এর মধ্যে অনেকগুলি ম্যাপেল গাছের অত্যাশ্চর্য সবুজ থেকে লাল রঙের পাশাপাশি আইকনিক উহওয়াজিয়ং প্যাভিলিয়ন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

উহওয়াজিওং প্যাভিলিয়নটি একটি স্ফটিকের হ্রদের অভ্যন্তরে অবস্থিত যা উষ্ণ বর্ণের প্রতিচ্ছবিটিকে দুর্দান্তভাবে প্রতিফলিত করে। এর পাশাপাশি, আপনি বেশ কয়েকটি জলপ্রপাত, বিস্ময়কর বৌদ্ধ মন্দির এবং শত শত বিভিন্ন গাছপালা এবং প্রাণীও দেখা পাবেন।

দাইদুছান প্রাদেশিক উদ্যান: দায়েজানের দক্ষিণে অবস্থিত দাইদুছান প্রাদেশিক উদ্যান। যদিও গাইরিওংসানের মতো বড় নয়, শীতের শুরুতে গাছের পাতা খুঁজে পাওয়ার জন্য এই পার্কটি সম্ভবত দুটি জায়গার চেয়ে ভাল। প্রকৃতপক্ষে, এটি দক্ষিণ কোরিয়ার শরতের পাতা দেখতে সেরা স্থানগুলির মধ্যে একটি। যা দাইদুনসান পর্বতকে এত সুপরিচিত করে তুলেছে। আপনি কেবল গাড়িটি নিয়ে বেশিরভাগ মূল্যবৃদ্ধি এড়িয়ে যেতে পারেন, তারপরে গেইমগাং গুরিয়াম সাসপেনশন ব্রিজের উপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে সাহসিকতা অবশ্যই বজায় রাখতে হবে।

সোরাকসান জাতীয় উদ্যান: সোরাকসান হলো সুন্দর পতনের ঝাঁক দেখা সবচেয়ে সুবিধাজনক জাতীয় উদ্যানগুলির মধ্যে একটি। উত্তর-পূর্ব উপকূলের কাছে অবস্থিত, এটি দক্ষিণ কোরিয়ার এই সময়টাতে গাছের পাতা দেখতে প্রথম স্থানগুলির মধ্যে একটি। এই জাতীয় উদ্যানটি দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ

মন্দিরটি অত্যাশ্চর্য পাথুরে শৃঙ্গগুলি। সমস্ত স্তরের জন্য প্রচুর পরিমাণে ট্রেইল রয়েছে এবং নীচে থেকে এগুলি দেখতে দৃষ্টিকটু।

দুটি গাছ আছে যা দক্ষিণ কোরিয়ায় শরতের পাতা দেখার জন্য উপযুক্ত, তারা হ'ল ম্যাপেল এবং জিঙ্গকো।

আসান জিঙ্গকো ট্রি রোডটি পরবর্তীকালে বিশেষত্ব দেয় এবং বর্ণের এই সুবর্ণ সোনার ক্যাসকেডটি দেখার জন্য সেরা জায়গা।

আসান জিঙ্গকো ট্রি রোড: জিঙ্গকো গাছগুলি প্রচুর পরিমাণে প্রচুর পাতা এবং চারদিকে সোনার গালিচা তৈরির জন্য বিখ্যাত। সংক্ষেপে, এটি সত্যই যাদু এবং ভ্রমণের জন্য সুন্দর জায়গা। এই গাছগুলি দেখার সেরা সময়টি অক্টোবরের শেষের দিকে বা নভেম্বরের শুরুতে।

গোয়ানাকসান: মাউন্টেনের পাদদেশে অবস্থিত, সিওল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এর সুন্দর ক্যাম্পাসের জন্য বিখ্যাত। দেশের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যাম্পাসটি বিস্তৃত এবং এতে গাছ-রেখাযুক্ত রাস্তা এবং বড় বড় ঘাসের প্লাজাসা উভয়ই রয়েছে। ছাত্রাবাস ও আর্ট মিউজিয়ামের মধ্যবর্তী রাস্তাটি বিভিন্ন ধরণের গাছ এবং বাহারি ফুলে সজ্জিত। আর্ট, মিউজিয়াম অব আর্ট, সিওল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, যা বিশ্বখ্যাত ডাচ আর্কিটেক্ট রিম কুলাহাস ডিজাইন করেছিলেন, এটিও অবশ্যই দেখার একটি সাইট। এই রাস্তাটি হ্যাঙ্গআউট

করার জন্য জনপ্রিয় জায়গা, বিশ্বের বিভিন্ন দেশর থেকে রেস্তোঁরা, মিষ্টান্নের দোকান রয়েছে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×