প্রবাস জীবনে ঈদ স্মৃতি

  মোহাম্মদ হানিফ, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ০১ আগস্ট ২০২০, ১০:১৬:৪০ | অনলাইন সংস্করণ

ফাইল ছবি

চারদিকে ঈদ আনন্দের পরিবর্তে করোনার আতঙ্ক। বর্তমান সময়ে কিছু শব্দের ভেতরে রয়েছে দীর্ঘশ্বাস কোভিড-১৯, লকডাউন, আইসোলেশন কিংবা কোয়ারেন্টাইন। সঙ্গে আছে বেদনা, ভয় ও নিঃসঙ্গতা।

থমকে গেছে মানুষের জীবন-জীবিকা। মনের কোণে সামান্য আনন্দটুকুও যেন খেই হারিয়ে গেছে। নিশ্চুপ নিঃশব্দ এক পৃথিবীর চেহারা যেন বিশ্ববাসী দেখতে পেল।

ছোট হয়ে আসছে আমাদের স্বপ্নগুলো। প্রবাদ আছে ‘অল্প শোকে কাতর অধিক শোকে পাথর’। দীর্ঘদিন করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে মানুষ যেন অতিষ্ঠ। বিরতিহীনভাবে চলছে কোভিড-১৯ এর যাত্রা। করোনাকালে দুটি নিরানন্দ ঈদই কাটলো।

জীবন থেকে যে দুটি ঈদ গেলো তা আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কোনোদিন ভাবিনি যে এমন ঈদও আমাদের জীবনে আসবে।

মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে এই ঈদ। ঈদকে নিয়ে বিভিন্ন মানুষের হরেক রকম আশা আকাঙ্ক্ষা আর প্রস্তুতির কমতি থাকে না। প্রতিবছর আবেগ, অনুভূতি আনন্দ, উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে ঈদ পালিত হয়।

এ কথা সবাই মানলেও প্রবাস জীবনে এমন ঈদের বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। প্রবাস জীবনের ঈদ উদযাপন ভিন্নরকম অনুভূতির জন্ম দেয়। একদিকে যেমন প্রবাসকাল অন্যদিকে চলছে করোনাকাল।

করোনাকালের ঈদ আর প্রবাসের ঈদ মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মত। ঈদ আসে যায় কিন্তু ঈদের সেই আমেজটা যেন নেই।

তবে প্রবাসীরা শত কষ্ট আর বঞ্চনার মাঝে ঈদের কয়েকটি দিন অন্তত খুঁজে নিত প্রবাসে অবস্থানরত অন্যান্য বন্ধু-বান্ধব কিংবা পরিচিত জনদের সঙ্গে। শেয়ার করতো প্রবাস জীবনের সঞ্চিত ব্যথা, হালকা করতো নিজেকে।

একদিকে নিজেরা বেঁচে থাকার সংগ্রাম অন্যদিকে করোনাকালে দেশে পরিবার-পরিজনদের নিয়ে চিন্তায় মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

কর্মব্যস্ত দক্ষিণ কোরিয়া একটি বিধর্মীদেশ। তাই সরকারিভাবে ঈদুল ফিতর-আজহার কোনো ছুটি নেই এবং তারা ঈদ শব্দটির সঙ্গে একেবারে অপরিচিত।

তবে মুসলমানদের খুব মূল্যায়ন করে কোরিয়ানরা। তারা ইসলাম ও মুসলিমকে একটু সম্মানের চোখেই দেখে। কোরিয়ানরা এটাও মনে করে মুসলমানরা সবসময় যে কোনো ধরনের খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে। অনেক বাংলাদেশির ভালো কর্মকাণ্ড দেখে কোরিয়ানদের এমন ধারণা তৈরি হয়েছে।

দক্ষিন কোরিয়াতে সরকারিভাবে মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর-আজহার কোনো ছুটি নেই। কিন্তু মাঝে মাঝে কাকতালীয়ভাবে সাপ্তাহিক ছুটি বা সরকারি ছুটির সঙ্গে মিলে যায় ঈদের দিন।

আর সেই দিনটি হয় দক্ষিণ কোরিয়ার প্রবাসীদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের দিন। যেমনিভাবে উদযাপন করেছিল এবারের ঈদুল ফিতর। সরকারের পক্ষ থেকে ঈদের জামাতেরও অনুমতি ছিল।

কিন্তু, কোরিয়াতে থেমে থেমে করোনার প্রকোপ বাড়ার কারণে এবারের ঈদুল আজহার জামায়াতের অনুমতি দেয়নি কোরীয় মুসলিম ফেডারেশন (কেএমএফ)। ছিলো না কোনো ছুটিও।

কোরিয়ার কিছু ছোট ছোট মসজিদে কয়েকজন মুসল্লি নিয়ে আদায় হয়েছে এবারের ঈদের জামাত। তবে ঈদের বন্ধ না থাকলেও কাল থেকে সামার ভ্যাকেশন শুরু হয়ে গেছে কোরিয়ার অধিকাংশ কোম্পানিতে।

প্রকৃতপক্ষে আমরা যারা প্রবাসে থাকি তাদের দেহ থাকে বিদেশে আর মন পড়ে থাকে দেশে। প্রতিটি মুহূর্তে আমরা দেশ ও পরিবার নিয়ে ভাবতে থাকি। প্রবাস জীবন মানেই সংগ্রামী জীবন। ফজরের আজানের পর দল বেঁধে ছোটাছুটি করে গোসল সেরে মিষ্টি মুখে নতুন জামা-কাপড় পরে ঈদগাহ মাঠে যাওয়া প্রবাস জীবনের জন্য যেন শুধুই স্মৃতি।

ঈদুল ফিতরের চেয়ে ঈদুল আজহা অন্যরকম মজা লাগত। শুরুতে একটু ছোট বেলার স্মৃতিতে চলে যেতে ইচ্ছে করছে। কোরবানি ঈদের আয়োজন কয়েকদিন আগেই শুরু হয়। শৈশবে থেকে কোরবানির ঈদগুলো ছিল ভীষণ আনন্দের।

বাবা যেদিন হাটে যেতেন গরু কিনতে, সেদিন দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতাম অধীর আগ্রহে। কখন আসবেন গরু নিয়ে। আর অপেক্ষার সময়টুকুতে বাড়ির সামনে দিয়ে যে কোনো মানুষকে গরু কিনে বাসায় ফিরতে দেখলেই জিজ্ঞেস করতাম গরুর দাম কত?

অন্যরকম একটা অনুভূতি কাজ করত। বাবা গরু নিয়ে বাসায় ফিরলে প্রথমেই খেয়াল করতাম আমাদের গরুটা পাশের বাড়ির গরুর চেয়ে বড় এবং সুন্দর কি-না। এটা ছিল ওই বয়সের একটা নিষ্পাপ প্রতিযোগিতা। আসলে শৈশবে আমাদের আত্মত্যাগের চিন্তা থেকে মজার চিন্তাটাই বেশি থাকতো।

আর ঈদের দিনের হৃদ্যতা খুব সকাল থেকেই শুরু হয়। বাবার সঙ্গে ঈদের নামাজে যাওয়া, সবাইকে সালাম করা। ঈদে নামাজ শেষে বাসায় এসে গরু কোরবানি বা কাটাকাটি নিয়ে সবার মাঝে অনেক উৎফুল্লতা ছিল।

গরু-খাসি জবাই তারপর মাংসের ভাগ থেকে শুরু করে তা শেষ হয় মাংস বিলি করার মধ্যে দিয়ে। এমনই ছিল শৈশবে থেকে কোরবানির ঈদ।

সময়ের সঙ্গে যেন পৃথিবীও তার আপন রঙ বদলে ফেলল। এক মহামারী মানব জীবনের স্বাভাবিক গতিধারাকে পাল্টে দিয়েছে! সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, খুশি-আনন্দের পরিবর্তে বেঁচে থাকার সংগ্রামটাই এখন মুখ্য হয়ে উঠেছে।

রোগশোক আর মৃত্যুর রঙে ধূসর এই পৃথিবীতে খুশির ঈদের যেন কোন রঙ নেই। আহারে এমন ঈদও এল পৃথিবীতে! নেই হাত মেলানো, নেই কোলাকুলি! নেই নতুন পোশাক! নেই গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে ছবি তোলাতুলি।

গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ছবি তুলতে না পারলেও আমরা শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ছবি তুলে করোনাকালের ঈদের স্মৃতি ধরে রেখেছি মাত্র।

বলা যায় এবারের ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় হচ্ছে ভার্চ্যুয়াল জগতে। ঈদের দিন রাত থেকে মোবাইলে ঈদের শুভেচ্ছা বার্তা বলে দেয় আমরা কতটা ভার্চ্যুয়াল জগতের বাসিন্দা হয়ে গেলাম। তবে এমন শুভেচ্ছা বার্তা কতটুকু আন্তরিকতার পরিচয় দেয়?

একটা সময় সাধারণত মানুষ প্রিয়জন বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে বা বিভিন্নরকম কার্ডের মাধ্যমে যেভাবে শুভেচ্ছা বিনিময় হতো সে রেওয়াজটি তরুণদের মধ্যে অনেকটা উঠে গেছে।

যদি ঈদ আনন্দের সব অনুষঙ্গ ত্যাগ করেও পৃথিবী থেকে করোনা বিদায় নিত, তাহলে শান্তি পেত মন। অথচ আমরা এখনো ধারণাও করতে পারছি না কবে এই করোনাভাইরাস বিদায় নেবে মানবজাতির কাছ থেকে।

পৃথিবী থেকে করোনার বিদায়ে মানুষ ঈদের আনন্দের চেয়ে বেশি আনন্দিত হবে। এবং সেই আনন্দই পৃথিবীর বুকে আসুক দ্রুত, এটা এই করোনা দিনের ঈদ প্রত্যাশা।

আর এমন অপ্রত্যাশিত ঈদ যেন আমাদের জীবনে আর না আসুক। প্রাণখুলে-মনভরে শ্বাস নিয়ে যেন বলতে পারি ঈদ মোবারাক। সবাইকে করোনাময় ঈদের শুভেচ্ছা।

লেখক: মোহাম্মদ হানিফ, দক্ষিণ কোরিয়া প্রবাসী সাংবাদিক

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত