খাদ্যে ভেজাল একাল সেকাল
jugantor
ভেজাল মুক্ত খাবার পেতে দরকার মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন
খাদ্যে ভেজাল একাল সেকাল

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে  

০২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৪:২৩:২৭  |  অনলাইন সংস্করণ

আমি বাংলাদেশের গ্রামের ছেলে। গ্রামের পরিবেশে শিশু কাল কেটেছে তবে শহরেও থেকেছি। আজ যে মাগুরা জেলা হয়েছে অতীতে তা ছিল মহকুমা। সেখানের সরকারি স্কুলে দুই বছর পড়েছি। এছাড়া ঢাকায় দুই বছর থেকে ইন্টারমিডিয়েট পড়েছি। সব মিলে আমার ছোটবেলার সময়গুলো গ্রাম এবং শহর উভয় জায়গায় কেটেছে।

গ্রামে সব ধরনের খাবার যেমন মাছ, শাক-সবজি, ফলমূল, হাঁস-মুরগী, দুধ ইত্যাদি ছিল। কিছু খেতে ইচ্ছে হলে কখনও ভাবিনি যে এটা খাওয়া যাবে না বা এটা খেলে অসুস্থ হবার সম্ভাবনা আছে। মনের আনন্দে যখন যেটা খুশি সেটা খেয়েছি কোন সমস্যা ছাড়াই।

আমি যে সময়ের কথা নিয়ে স্মৃতিচারণ করছি তা হবে চল্লিশ বছর আগের কথা। সে সময়ও ভেজাল নিয়ে কথা হয়েছে বটে। যেমন মসুরের মধ্যে বাজারির মিশ্রণ, দুধে পানি মেশানো, পাট কম শুকানো, সরিষার তেলের মধ্যে অন্য তেল মেশানো ইত্যাদি। স্কুলে পরীক্ষার হলে মাঝে মধ্যে কেউ কেউ নকল করেছে। যদি ধরা খেয়েছে এ অপরাধের কারণে প্রতিবেশী থেকে শুরু করে গ্রামে সেটা রটে গেছে। সে এক লজ্জার কথা! এসব ছিল তখনকার দিনে ঘৃণ্য অপরাধ।

চলুন এবার জানা যাক কী অবস্থা বর্তমানে। এখন দেশে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি ও ফলমূল উৎপাদনের জন্য কীটনাশক ব্যবহার করার ফলে খাবারগুলোতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিষক্রিয়া কার্যকর থাকে। তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক খাবার ও ফলমূল আকর্ষণীয় ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করার জন্য ক্ষতিকর কার্বাইড, ইন্ডাস্ট্রিয়াল রঙ, ফরমালিন ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়।

অধিক মুনাফার আশায় একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী বিভিন্ন মসলায় বিষাক্ত রঙ, ধানের তুষ, ইট ও কাঠের গুঁড়া, মটর ডাল ও সুজি ইত্যাদি মেশাচ্ছে। ভেজাল মসলা কিনে ক্রেতারা শুধু প্রতারিতই হচ্ছেন না, এতে তৈরি হচ্ছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি।

বাজারের কলা, আম, পেঁপে, পেয়ারা থেকে শুরু করে আপেল, আঙুর, নাশপাতিসহ দেশি-বিদেশি প্রায় সব ফলেই মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত কেমিক্যাল। সাধারণ ফলমূলের উজ্জ্বল রঙ ক্রেতাদের নজর কাড়ে, সেগুলো বিক্রিও হয় বেশি দামে। তাই অপরিপক্ব ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড এবং তা উজ্জ্বল রঙে রূপান্তর করার জন্য অধিক ক্ষার জাতীয় টেক্সটাইল রঙ ব্যবহার হচ্ছে অবাধে।

অন্যদিকে ফলমূল দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করতে ফরমালিনসহ আরও কিছু বিষাক্ত পদার্থেরও ব্যবহার চলে অহরহ। বাস্তবে এসব ফল বাইরে পাকা মনে হলেও এর ভেতরের অংশে অপরিপক্ব থেকে যায়। এছাড়া অপরিপক্ব ফলমূলে স্বাদ-গন্ধ ও ভিটামিন অনেক কম থাকে।

মাছ ধরার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োগ করা হয় ফরমালিন। অপেক্ষাকৃত বড় আকারের মাছগুলো তাজা থাকা অবস্থায় ইনজেকশনের মাধ্যমে ফরমালিন পুশ করা হয়। আর ছোট আকারের মাছগুলো শুধু ফরমালিন মিশ্রিত পানির ড্রামে চুবিয়ে তুললেই চলে।

বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুতকারী কারখানাগুলোয় পর্যাপ্ত আলো বাতাসের ব্যবস্থা নেই। দম বন্ধ হওয়া গরমে খালি গায়ে বেকারি শ্রমিকরা আটা-ময়দা পা দিয়ে দলিত মথিত করে। সেখানেই তৈরি হয় ব্রেড, বিস্কুট, কেকসহ নানা লোভনীয় খাদ্যদ্রব্য। এসব বেকারির পণ্যে ভেজাল আটা, ময়দা, ডালডা, তেল, পচা ডিমসহ নিম্নমানের বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হয়।

পরবর্তীতে সেসব ভেজাল খাওয়ার কারণে আমাদের দেহে ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত কেমিক্যাল, শুরু হয় নানা অসুখ-বিসুখ। কেমিক্যাল মিশ্রিত বা ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে যে উপসর্গগুলো দেখা যায় সেগুলো হলো- পেটব্যথা, বমি হওয়া, মাথাঘোরা, মল পাতলা, শরীরে ঘাম বেশি হওয়া এবং দুর্বল হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।

ভেজাল খাবারের কারণে যে রোগগুলো দ্বারা আমরা বেশি আক্রান্ত হই তা হলো অ্যালার্জি, অ্যাজমা, চর্মরোগ, বমি, মাথাব্যথা, খাদ্যে বিষক্রিয়া, অরুচি, উচ্চরক্তচাপ, ব্রেন স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ ইত্যাদি।

বাংলাদেশে খাবারে ভেজাল আজ কোনো গোপনীয় ব্যাপার নয়। মনে হচ্ছে সবার মধ্যে এটা এক ধরণের অলিখিত বৈধতা পেয়েছে। এখন মহাসমারোহে প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্য মরণব্যাধির নানা বিষাক্ত পদার্থে পরিপূর্ণ। কিন্তু এমন তো কথা ছিল না।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না একটি দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তাদের নৈতিকতা। আমরা তাজা রক্ত বিসর্জন দিয়েছি একটি বৃহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে, তৈরি করেছি মহান আত্মত্যাগের অবিস্মরণীয় ইতিহাস। ১৯৭১ সালের সেই রক্তাক্ত আত্মবিসর্জন আমাদের দিয়েছে ভৌগোলিকভাবে স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র।

এই মহান আত্মত্যাগ, এই ভৌগোলিক স্বাধীনতা যথার্থ পূর্ণতা পাবে যদি আমরা আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্জনের মাধ্যমে সুস্থ সবল জাতি গঠন করতে সক্ষম হই। কারণ একটি সুস্থ সবল জাতিই পারে সব শৃঙ্খল, প্রতিকূলতা ছিন্নভিন্ন করে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে।

এখন প্রশ্ন- কীভাবে সম্ভব আমাদের খাদ্যের সেই ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনা? আমাদের ব্যক্তিত্ব এবং আচরণের ওপরে নানা ধরনের মানসিক শক্তি প্রভাব ফেলে। তার মধ্যে সুপার ইগো হচ্ছে নৈতিক আদর্শ বা সামাজিক উপাদানের একটি বিশেষ দিক। আমাদের মধ্যে সুপার ইগো বেশি করে ক্রিয়াশীল করতে হবে।

উচিত হবে নৈতিক আদর্শের ভিত্তিকে মজবুত করার কাজে মনোনিবেশ করা। আইনের কঠিন ও কঠোর প্রয়োগ হয়তো ইগোকে শক্তিশালী করবে কিন্তু টেকসই সমাধান হলো সুপার ইগো গঠনে মনোনিবেশ করা। আমাদের মনোযোগ দিতে হবে এমন সমাজ গঠনের প্রতি যে সমাজে সুযোগ সবার জন্য সমভাবে বণ্টিত। কেননা এর অসম বণ্টন সমাজে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি করে।

আমি সুইডেনে এমনটি কনসেপ্ট বার বার লক্ষ্য করি। জাতি হিসাবে এদের মোড়াল ভ্যালু অনেক উঁচুতে। এদের চিন্তা চেতনায় লক্ষণীয় যে তারা কতটুকু উপার্জন করছে তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ সেটা কীভাবে উপার্জন করছে। সচেতন জাতি অজুহাত নয়; খোঁজে সমাধান এবং সামষ্টিক কল্যাণ। তাই খাদ্যে ভেজাল রোধে শুধু ভেজালবিরোধী অভিযানেই সমাধান খুঁজলে হবে না, আমাদের মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে নিজ নিজ জায়গা থেকে।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
ভেজাল মুক্ত খাবার পেতে দরকার মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

খাদ্যে ভেজাল একাল সেকাল

 রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে 
০২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:২৩ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

আমি বাংলাদেশের গ্রামের ছেলে। গ্রামের পরিবেশে শিশু কাল কেটেছে তবে শহরেও থেকেছি। আজ যে মাগুরা জেলা হয়েছে অতীতে তা ছিল মহকুমা। সেখানের সরকারি স্কুলে দুই বছর পড়েছি। এছাড়া ঢাকায় দুই বছর থেকে ইন্টারমিডিয়েট পড়েছি। সব মিলে আমার ছোটবেলার সময়গুলো গ্রাম এবং শহর উভয় জায়গায় কেটেছে।

গ্রামে সব ধরনের খাবার যেমন মাছ, শাক-সবজি, ফলমূল, হাঁস-মুরগী, দুধ ইত্যাদি ছিল। কিছু খেতে ইচ্ছে হলে কখনও ভাবিনি যে এটা খাওয়া যাবে না বা এটা খেলে অসুস্থ হবার সম্ভাবনা আছে। মনের আনন্দে যখন যেটা খুশি সেটা খেয়েছি কোন সমস্যা ছাড়াই। 

আমি যে সময়ের কথা নিয়ে স্মৃতিচারণ করছি তা হবে চল্লিশ বছর আগের কথা। সে সময়ও ভেজাল নিয়ে কথা হয়েছে বটে। যেমন মসুরের মধ্যে বাজারির মিশ্রণ, দুধে পানি মেশানো, পাট কম শুকানো, সরিষার তেলের মধ্যে অন্য তেল মেশানো ইত্যাদি। স্কুলে পরীক্ষার হলে মাঝে মধ্যে কেউ কেউ নকল করেছে। যদি ধরা খেয়েছে এ অপরাধের কারণে প্রতিবেশী থেকে শুরু করে গ্রামে সেটা রটে গেছে। সে এক লজ্জার কথা! এসব ছিল তখনকার দিনে ঘৃণ্য অপরাধ। 

চলুন এবার জানা যাক কী অবস্থা বর্তমানে। এখন দেশে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি ও ফলমূল উৎপাদনের জন্য কীটনাশক ব্যবহার করার ফলে খাবারগুলোতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিষক্রিয়া কার্যকর থাকে। তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক খাবার ও ফলমূল আকর্ষণীয় ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করার জন্য ক্ষতিকর কার্বাইড, ইন্ডাস্ট্রিয়াল রঙ, ফরমালিন ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়।
  
অধিক মুনাফার আশায় একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী বিভিন্ন মসলায় বিষাক্ত রঙ, ধানের তুষ, ইট ও কাঠের গুঁড়া, মটর ডাল ও সুজি ইত্যাদি মেশাচ্ছে। ভেজাল মসলা কিনে ক্রেতারা শুধু প্রতারিতই হচ্ছেন না, এতে তৈরি হচ্ছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি।
 
বাজারের কলা, আম, পেঁপে, পেয়ারা থেকে শুরু করে আপেল, আঙুর, নাশপাতিসহ দেশি-বিদেশি প্রায় সব ফলেই মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত কেমিক্যাল। সাধারণ ফলমূলের উজ্জ্বল রঙ ক্রেতাদের নজর কাড়ে, সেগুলো বিক্রিও হয় বেশি দামে। তাই অপরিপক্ব ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড এবং তা উজ্জ্বল রঙে রূপান্তর করার জন্য অধিক ক্ষার জাতীয় টেক্সটাইল রঙ ব্যবহার হচ্ছে অবাধে। 

অন্যদিকে ফলমূল দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করতে ফরমালিনসহ আরও কিছু বিষাক্ত পদার্থেরও ব্যবহার চলে অহরহ। বাস্তবে এসব ফল বাইরে পাকা মনে হলেও এর ভেতরের অংশে অপরিপক্ব থেকে যায়। এছাড়া অপরিপক্ব ফলমূলে স্বাদ-গন্ধ ও ভিটামিন অনেক কম থাকে।
 
মাছ ধরার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োগ করা হয় ফরমালিন। অপেক্ষাকৃত বড় আকারের মাছগুলো তাজা থাকা অবস্থায় ইনজেকশনের মাধ্যমে ফরমালিন পুশ করা হয়। আর ছোট আকারের মাছগুলো শুধু ফরমালিন মিশ্রিত পানির ড্রামে চুবিয়ে তুললেই চলে।

বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুতকারী কারখানাগুলোয় পর্যাপ্ত আলো বাতাসের ব্যবস্থা নেই। দম বন্ধ হওয়া গরমে খালি গায়ে বেকারি শ্রমিকরা আটা-ময়দা পা দিয়ে দলিত মথিত করে। সেখানেই তৈরি হয় ব্রেড, বিস্কুট, কেকসহ নানা লোভনীয় খাদ্যদ্রব্য। এসব বেকারির পণ্যে ভেজাল আটা, ময়দা, ডালডা, তেল, পচা ডিমসহ নিম্নমানের বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হয়।

পরবর্তীতে সেসব ভেজাল খাওয়ার কারণে আমাদের দেহে ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত কেমিক্যাল, শুরু হয় নানা অসুখ-বিসুখ। কেমিক্যাল মিশ্রিত বা ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে যে উপসর্গগুলো দেখা যায় সেগুলো হলো- পেটব্যথা, বমি হওয়া, মাথাঘোরা, মল পাতলা, শরীরে ঘাম বেশি হওয়া এবং দুর্বল হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।

ভেজাল খাবারের কারণে যে রোগগুলো দ্বারা আমরা বেশি আক্রান্ত হই তা হলো অ্যালার্জি, অ্যাজমা, চর্মরোগ, বমি, মাথাব্যথা, খাদ্যে বিষক্রিয়া, অরুচি, উচ্চরক্তচাপ, ব্রেন স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ ইত্যাদি।

বাংলাদেশে খাবারে ভেজাল আজ কোনো গোপনীয় ব্যাপার নয়। মনে হচ্ছে সবার মধ্যে এটা এক ধরণের অলিখিত বৈধতা পেয়েছে। এখন মহাসমারোহে প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্য মরণব্যাধির নানা বিষাক্ত পদার্থে পরিপূর্ণ। কিন্তু এমন তো কথা ছিল না।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না একটি দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তাদের নৈতিকতা। আমরা তাজা রক্ত বিসর্জন দিয়েছি একটি বৃহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে, তৈরি করেছি মহান আত্মত্যাগের অবিস্মরণীয় ইতিহাস। ১৯৭১ সালের  সেই রক্তাক্ত আত্মবিসর্জন আমাদের দিয়েছে ভৌগোলিকভাবে স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র। 

এই মহান আত্মত্যাগ, এই ভৌগোলিক স্বাধীনতা যথার্থ পূর্ণতা পাবে যদি আমরা আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্জনের মাধ্যমে সুস্থ সবল জাতি গঠন করতে সক্ষম হই। কারণ একটি সুস্থ সবল জাতিই পারে সব শৃঙ্খল, প্রতিকূলতা ছিন্নভিন্ন করে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে।

এখন প্রশ্ন- কীভাবে সম্ভব আমাদের খাদ্যের সেই ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনা? আমাদের ব্যক্তিত্ব এবং আচরণের ওপরে নানা ধরনের মানসিক শক্তি প্রভাব ফেলে। তার মধ্যে সুপার ইগো হচ্ছে নৈতিক আদর্শ বা সামাজিক উপাদানের একটি বিশেষ দিক। আমাদের মধ্যে সুপার ইগো বেশি করে ক্রিয়াশীল করতে হবে।

উচিত হবে নৈতিক আদর্শের ভিত্তিকে মজবুত করার কাজে মনোনিবেশ করা। আইনের কঠিন ও কঠোর প্রয়োগ হয়তো ইগোকে শক্তিশালী করবে কিন্তু টেকসই সমাধান হলো সুপার ইগো গঠনে মনোনিবেশ করা। আমাদের মনোযোগ দিতে হবে এমন সমাজ গঠনের প্রতি যে সমাজে সুযোগ সবার জন্য সমভাবে বণ্টিত। কেননা এর অসম বণ্টন সমাজে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি করে। 

আমি সুইডেনে এমনটি কনসেপ্ট বার বার লক্ষ্য করি। জাতি হিসাবে এদের মোড়াল ভ্যালু অনেক উঁচুতে। এদের চিন্তা চেতনায় লক্ষণীয় যে তারা কতটুকু উপার্জন করছে তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ সেটা কীভাবে উপার্জন করছে। সচেতন জাতি অজুহাত নয়; খোঁজে সমাধান এবং সামষ্টিক কল্যাণ। তাই খাদ্যে ভেজাল রোধে শুধু ভেজালবিরোধী অভিযানেই সমাধান খুঁজলে হবে না, আমাদের মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে নিজ নিজ জায়গা থেকে।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
 

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

০৪ অক্টোবর, ২০২০
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০