দেশি সাংবাদিকরা চুপচাপ বিদেশে আশ্রিতরা ছড়াচ্ছে গুজব
jugantor
আল জাজিরার প্রতিবেদন নিয়ে প্রতিক্রিয়া
দেশি সাংবাদিকরা চুপচাপ বিদেশে আশ্রিতরা ছড়াচ্ছে গুজব

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে  

১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১১:০৮:৫৮  |  অনলাইন সংস্করণ

আমি তখন ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। আমার তখনকার সময়ের এক ক্লাসমেট জেনেছে আমি গ্রাম থেকে এসেছি। সে নাকি কোনোদিন ঢাকার বাইরে যায়নি। গ্রাম সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই, এমনটাই মনে হতো তার কথায়। কোনো এক প্রসঙ্গে সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ধানের গাছ দিয়ে কী করে গ্রামে? আমি তাকে ইচ্ছে করেই বলেছিলাম, নানা ধরনের আসবাবপত্র থেকে শুরু করে গরু ছাগলের খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সে ইচ্ছাকৃতভাবে জেনে না জানার ভান করে জিজ্ঞেস করেছিল কিনা জানি না। তবে মনে হয়েছিল মুখের উপর বলে দিই, “শালা বাঙালি হয়ে বাংলার খবর রাখো না?”

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ বাংলাদেশের কথা শুনলে তাদের মনেও প্রশ্ন জাগতে পারে "বাংলাদেশ একটি মাফিয়া রাষ্ট্র কি-না?" বিদেশীদের মাঝে এ ধারণার বীজ ছড়ানোর জন্য কিছু লোক কাজ করছে। কারণ দেশে-বিদেশে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর মত সাংবাদিকের অভাব নেই। কিন্তু আমরা যারা বাংলাদেশকে জানি এবং বুঝি, তাদের কাছে দেশের আসল রূপ অজানা নয়।

বর্তমানে বিশ্বে সমস্যার শেষ নেই এবং সমস্যা ছাড়া মানুষ জাতির বসত কোথাও আছে বলে আমার জানা নাই। তবে সন্ত্রাসী, মাফিয়া বিশ্বের অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও রয়েছে। ঘুষ এবং দুর্নীতিতে বাংলাদেশ যে প্রথম সারিতে সে বিষয়টিও অজানা নয়।

তৎকালীন বিএনপি সরকারের সময় জেনারেল আজিজের ভাইদের শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়, কারণ তারা তখন শেখ হাসিনার দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করেছে। নিজেদের জীবন বাজি রেখে শুনেছি শেখ হাসিনার জীবনকে বাঁচিয়েছে। বিরোধী দল যেমন এখন সর্বহারা, তখনকার বিরোধীদলের অবস্থাও কিন্তু এখনকার মত ছিল। কারণ বাংলাদেশ প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং সেই রাজনীতিতে বিশ্বাসী। সেক্ষেত্রে অনেকের ধারণা এমনও তো হতে পারে রাজনৈতিকভাবে তাদেরকে ফাঁসানো হয়েছে!

মনে কি পড়ে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবার হত্যাকারী কর্নেল ফারুক, রশিদ এবং অন্যরা কিভাবে বাংলাদেশে প্রকাশ্যে রাজনীতিতে নেমেছিল। কারা তাদের অস্ত্র, অর্থ, পৃষ্ঠপোষকতা তথা সরকারি সুযোগসুবিধা দিয়ে মাঠে নামিয়েছিল? বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাকে সেসময় রাষ্ট্র প্রোটেকশন দেয়নি, পুলিশ বা অন্য কোনো বাহিনী তার প্রাণ বাঁচায়নি, তার দলের নিবেদিত কর্মীরাই বারবার মানবঢাল তৈরি করে এবং নিজেদের জীবন দিয়ে তাদের নেত্রীর প্রাণ বাঁচিয়েছে।

যেমনটি বিএনপি নেত্রীকে দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায়। অতএব বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমরা জানি। শেখ হাসিনার সরকারের অনেক বিষয়ের আমি সমালোচক। কিন্তু তাকে রক্ষার জন্য যারা ঝুঁকি নিয়েছে তাদের প্রতি যে দায়বোধ, কৃতজ্ঞতাবোধ এবং স্নেহশীল আচরণ তা আমি সম্মানের সঙ্গে দেখছি। এদেশে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার আইন করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না আসতে পারলে সে বিচার কখনও হতো বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশের সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গে তার প্রবাসী ভাইয়েরা যোগাযোগ রাখেন। পরিবারে বিয়ে-সাদির মত অনুষ্ঠানেও তারা যোগ দেয়। ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের যোগাযোগ থাকবে না? সেনাপ্রধান আজিজের সঙ্গে তার আপন ভাই যোগাযোগ রাখে, এটি জেনে আমাদের অবাক হওয়ার কারণ নেই। তিনি তার ভাইয়ের প্রতি স্নেহশীল হবেন, তাকে ভাল রাখার জন্য চেষ্টা করবেন, তাতেই বা বিস্ময়ের কী আছে? এটাই কিন্তু প্রকৃত বাংলাদেশ এবং প্রতিটি পরিবার ঘাঁটলে এ ধরণের নজিরের অভাব হবে না।

একসময় যারা শেখ হাসিনার দেহরক্ষী ছিল তাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর স্নেহের দৃষ্টি আছে। কারণ সে সময় তারা প্রধানমন্ত্রীর প্রাণরক্ষায় বড় অবদান রেখেছে। বাঙালি জাতি হিসেবে জেনারেল আজিজের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সকৃতজ্ঞ স্নেহকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? দেশে দুই ধারার মানুষ আছে। কেউ কেউ যেমন অতীতে বলেছিল "মাগো তোমায় কথা দিলাম, মুজিব হত্যার বদলা নেবো," এই স্লোগান যাদের রক্তে বোধের অনুরণন ঘটায় তাদের সেন্টিমেন্ট একরকম। অন্যদিকে যারা সবসময় বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারবর্গের রক্তাক্ত মৃতদেহ দেখার মধ্যে শান্তি খুঁজে পায়, তাদের সেন্টিমেন্ট অন্যরকম।

আবার যারা বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা তারা আমাদের নিজেদের চোখে বীর হলেও পাকিস্তানিদের চোখে সন্ত্রাসী। খুনি ফ্রিডম পার্টি ও তার সহযোগী পৃষ্ঠপোষকদের কাছে শেখ হাসিনার উপর আক্রমণকারীরা বীর, আমাদের চোখে হাসিনার জীবন রক্ষায় যারা বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তারাই সম্মানিত অগ্রসেনা। এমন করেও ভাবা যেতে পারে। সব ছিল বর্তমানের ঘটনাপ্রবাহ যা পুরো দেশের মানুষের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে চলছে। কিছু দিন যেতে না যেতেই দেখা যাবে নতুন আরেকটি খবর আসবে তখন এসব খবর ঢাকা পড়ে যাবে। এভাবেই কিন্তু দেশটি চলছে।

আমরা জনগণ হয়েছি দর্শক। নিজেরা খেলি না, খেলা দেখি। সারাক্ষণ ব্যস্ত খেলা দেখা নিয়ে। আগে কিছু টাকা পয়সার বিনিময়ে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতাম, এখন সেটা বন্ধ হবার কারণে সে কাজটিও নেই। ইদানীং খেলা দেখতেও ভালো লাগে না। কারণ একটি খেলা শেষ না হতেই আরেকটি শুরু, কোনটা রেখে কোনটা দেখব? ইদানীং আবার বাংলাদেশের সাংবাদিকরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে, দেশি এবং বিদেশি। যারা দেশে তারা সব জেনে শুনেও না জানার ভান ধরে চুপচাপ আছে। আবার যারা দেশ ছেড়ে বিদেশে আশ্রিত তারা সব না জেনেও বেশি জানার ভান করে গুজব ছড়াচ্ছে। যার ফলে সঠিক তথ্য কেউ দিতে পারছে না এবং খেলাও ভালো জমছে না। এই সুযোগে বাইরের সাংবাদিকরা দেশের খবর এলোপাতাড়িভাবে প্রচার করে প্রকৃত খবরের বারোটা বাজিয়ে জগাখিচুড়ি করে ফেলছে। ফলে খেলা দেখে মজা নেই।

একটি পুরাতন গল্প মনে পড়ে গেল। রাজার দেহরক্ষী রাতে রাজার রাজ প্রাসাদ পহর দিয়েছেন। সকালে রাজা মহোদয় বাইরে বের হতেই প্রহরী বিনয়ের সঙ্গে রাজাকে বললেন, মহারাজ আমি রাতে স্বপ্নে দেখেছি আজ আপনার বিপদ হবে ঘরের বাইরে গেলে। রাজা মহোদয় দেহরক্ষীর কথা মত ঘরে থেকে গেলেন, তবে দেহরক্ষীকে তার কর্ম থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন। গল্পটি মনে হয় বাংলাদেশের সবাই জানে তাই কেউই প্রধানমন্ত্রীকে সত্য কথাগুলো বলছে না। বরং সামাজিক গণমাধ্যম এবং মূলধারার মাধ্যমে অনেককেই দেখা যাচ্ছে, তারা প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন এটা প্রমাণ করার, আমরা প্রধানমন্ত্রীর লোক। কেউ করছেন ফেসবুকের প্রোফাইল ছবিতে একটি ফ্রেম ব্যবহার করে, যাতে লেখা আছে, ‘উই অল আর প্রাইম মিনিস্টারস মেন’।

কেউ বলছে না ভুল তথ্যের জবাব হচ্ছে সঠিক তথ্য প্রকাশ। আর অপপ্রচার থেকে বাঁচা বা ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের উপায়ও আসল সত্য তুলে ধরা। ভিন্নমতের জবাব দিতে হবে পাল্টা যুক্তিতে। সরকারকে সেই সৎপরামর্শ না দিয়ে যে পথটি অনুসরণে উৎসাহিত করা হচ্ছে তা সঠিক পথ নয়। বাংলাদেশের প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতি হয়েছে মাকাল ফলের মত। বাইরে থেকে দেখতে সুন্দর, ভিতরে নোংরা এবং অখাদ্য। আবার দেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল যার বাইরে কাটা অথচ ভিতরে শত শত সুস্বাদু রসে ভরা কী চমৎকার মজাদার খাবার!

দেশের মানুষের চরিত্র মাকাল ফলের চেয়েও খারাপ; কারণ মাকাল ফল অগত্যা দেখতে ভালো। যে দেশের জাতীয় খেলা হাডুডু বা কাবাডি যাই হোক না কেন, জিততে হলে টেনে ধরে রাখতে হবে, সামনে যেতে দেওয়া যাবে না এবং যে দেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল যার মধ্য রয়েছে শত শত রসাল ফল এবং বিচি, সেই দেশের মানুষ আমরা! কী জানি বাবা, বোঝা মুশকিল! কীভাবে এবং কবে আমরা বাঙালি হবো, বাংলাদেশি আর কবেই বা হবে আমাদের জাতীয় চরিত্রের সনাক্তকরণ?

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, rahman.mridha@gmail.com

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
আল জাজিরার প্রতিবেদন নিয়ে প্রতিক্রিয়া

দেশি সাংবাদিকরা চুপচাপ বিদেশে আশ্রিতরা ছড়াচ্ছে গুজব

 রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে 
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১১:০৮ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

আমি তখন ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। আমার তখনকার সময়ের এক ক্লাসমেট জেনেছে আমি গ্রাম থেকে এসেছি। সে নাকি কোনোদিন ঢাকার বাইরে যায়নি। গ্রাম সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই, এমনটাই মনে হতো তার কথায়। কোনো এক প্রসঙ্গে সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ধানের গাছ দিয়ে কী করে গ্রামে? আমি তাকে ইচ্ছে করেই বলেছিলাম, নানা ধরনের আসবাবপত্র থেকে শুরু করে গরু ছাগলের খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সে ইচ্ছাকৃতভাবে জেনে না জানার ভান করে জিজ্ঞেস করেছিল কিনা জানি না। তবে মনে হয়েছিল মুখের উপর বলে দিই, “শালা বাঙালি হয়ে বাংলার খবর রাখো না?”

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ বাংলাদেশের কথা শুনলে তাদের মনেও প্রশ্ন জাগতে পারে "বাংলাদেশ একটি মাফিয়া রাষ্ট্র কি-না?" বিদেশীদের মাঝে এ ধারণার বীজ ছড়ানোর জন্য কিছু লোক কাজ করছে। কারণ দেশে-বিদেশে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর মত সাংবাদিকের অভাব নেই। কিন্তু আমরা যারা বাংলাদেশকে জানি এবং বুঝি, তাদের কাছে দেশের আসল রূপ অজানা নয়।

বর্তমানে বিশ্বে সমস্যার শেষ নেই এবং সমস্যা ছাড়া মানুষ জাতির বসত কোথাও আছে বলে আমার জানা নাই। তবে সন্ত্রাসী, মাফিয়া বিশ্বের অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও রয়েছে। ঘুষ এবং দুর্নীতিতে বাংলাদেশ যে প্রথম সারিতে সে বিষয়টিও অজানা নয়। 

তৎকালীন বিএনপি সরকারের সময় জেনারেল আজিজের ভাইদের শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়, কারণ তারা তখন শেখ হাসিনার দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করেছে। নিজেদের জীবন বাজি রেখে শুনেছি শেখ হাসিনার জীবনকে বাঁচিয়েছে। বিরোধী দল যেমন এখন সর্বহারা, তখনকার বিরোধীদলের অবস্থাও কিন্তু এখনকার মত ছিল। কারণ বাংলাদেশ প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং সেই রাজনীতিতে বিশ্বাসী। সেক্ষেত্রে অনেকের ধারণা এমনও তো হতে পারে রাজনৈতিকভাবে তাদেরকে ফাঁসানো হয়েছে! 

মনে কি পড়ে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবার হত্যাকারী কর্নেল ফারুক, রশিদ এবং অন্যরা কিভাবে বাংলাদেশে প্রকাশ্যে রাজনীতিতে নেমেছিল। কারা তাদের অস্ত্র, অর্থ, পৃষ্ঠপোষকতা তথা সরকারি সুযোগসুবিধা দিয়ে মাঠে নামিয়েছিল? বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাকে সেসময় রাষ্ট্র প্রোটেকশন দেয়নি, পুলিশ বা অন্য কোনো বাহিনী তার প্রাণ বাঁচায়নি, তার দলের নিবেদিত কর্মীরাই বারবার মানবঢাল তৈরি করে এবং নিজেদের জীবন দিয়ে তাদের নেত্রীর প্রাণ বাঁচিয়েছে।
 
যেমনটি বিএনপি নেত্রীকে দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায়। অতএব বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমরা জানি। শেখ হাসিনার সরকারের অনেক বিষয়ের আমি সমালোচক। কিন্তু তাকে রক্ষার জন্য যারা ঝুঁকি নিয়েছে তাদের প্রতি যে দায়বোধ, কৃতজ্ঞতাবোধ এবং স্নেহশীল আচরণ তা আমি সম্মানের সঙ্গে দেখছি। এদেশে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার আইন করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না আসতে পারলে সে বিচার কখনও হতো বলে মনে হয় না। 

বাংলাদেশের সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গে তার প্রবাসী ভাইয়েরা যোগাযোগ রাখেন। পরিবারে বিয়ে-সাদির মত অনুষ্ঠানেও তারা যোগ দেয়। ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের যোগাযোগ থাকবে না? সেনাপ্রধান আজিজের সঙ্গে তার আপন ভাই যোগাযোগ রাখে, এটি জেনে আমাদের অবাক হওয়ার কারণ নেই। তিনি তার ভাইয়ের প্রতি স্নেহশীল হবেন, তাকে ভাল রাখার জন্য চেষ্টা করবেন, তাতেই বা বিস্ময়ের কী আছে? এটাই কিন্তু প্রকৃত বাংলাদেশ এবং প্রতিটি পরিবার ঘাঁটলে এ ধরণের নজিরের অভাব হবে না।

একসময় যারা শেখ হাসিনার দেহরক্ষী ছিল তাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর স্নেহের দৃষ্টি আছে। কারণ সে সময় তারা প্রধানমন্ত্রীর প্রাণরক্ষায় বড় অবদান রেখেছে। বাঙালি জাতি হিসেবে জেনারেল আজিজের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সকৃতজ্ঞ স্নেহকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? দেশে দুই ধারার মানুষ আছে। কেউ কেউ যেমন অতীতে বলেছিল "মাগো তোমায় কথা দিলাম, মুজিব হত্যার বদলা নেবো," এই স্লোগান যাদের রক্তে বোধের অনুরণন ঘটায় তাদের সেন্টিমেন্ট একরকম। অন্যদিকে যারা সবসময় বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারবর্গের রক্তাক্ত মৃতদেহ দেখার মধ্যে শান্তি খুঁজে পায়, তাদের সেন্টিমেন্ট অন্যরকম।

আবার যারা বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা তারা আমাদের নিজেদের চোখে বীর হলেও পাকিস্তানিদের চোখে সন্ত্রাসী। খুনি ফ্রিডম পার্টি ও তার সহযোগী পৃষ্ঠপোষকদের কাছে শেখ হাসিনার উপর আক্রমণকারীরা বীর, আমাদের চোখে হাসিনার জীবন রক্ষায় যারা বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তারাই সম্মানিত অগ্রসেনা। এমন করেও ভাবা যেতে পারে। সব ছিল বর্তমানের ঘটনাপ্রবাহ যা পুরো দেশের মানুষের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে চলছে। কিছু দিন যেতে না যেতেই দেখা যাবে নতুন আরেকটি খবর আসবে তখন এসব খবর ঢাকা পড়ে যাবে। এভাবেই কিন্তু দেশটি চলছে।

আমরা জনগণ হয়েছি দর্শক। নিজেরা খেলি না, খেলা দেখি। সারাক্ষণ ব্যস্ত খেলা দেখা নিয়ে। আগে কিছু টাকা পয়সার বিনিময়ে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতাম, এখন সেটা বন্ধ হবার কারণে সে কাজটিও নেই। ইদানীং খেলা দেখতেও ভালো লাগে না। কারণ একটি খেলা শেষ না হতেই আরেকটি শুরু, কোনটা রেখে কোনটা দেখব? ইদানীং আবার বাংলাদেশের সাংবাদিকরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে, দেশি এবং বিদেশি। যারা দেশে তারা সব জেনে শুনেও না জানার ভান ধরে চুপচাপ আছে। আবার যারা দেশ ছেড়ে বিদেশে আশ্রিত তারা সব না জেনেও বেশি জানার ভান করে গুজব ছড়াচ্ছে। যার ফলে সঠিক তথ্য কেউ দিতে পারছে না এবং খেলাও ভালো জমছে না। এই সুযোগে বাইরের সাংবাদিকরা দেশের খবর এলোপাতাড়িভাবে প্রচার করে প্রকৃত খবরের বারোটা বাজিয়ে জগাখিচুড়ি করে ফেলছে। ফলে খেলা দেখে মজা নেই। 

একটি পুরাতন গল্প মনে পড়ে গেল। রাজার দেহরক্ষী রাতে রাজার রাজ প্রাসাদ পহর দিয়েছেন। সকালে রাজা মহোদয় বাইরে বের হতেই প্রহরী বিনয়ের সঙ্গে রাজাকে বললেন, মহারাজ আমি রাতে স্বপ্নে দেখেছি আজ আপনার বিপদ হবে ঘরের বাইরে গেলে। রাজা মহোদয় দেহরক্ষীর কথা মত ঘরে থেকে গেলেন, তবে দেহরক্ষীকে তার কর্ম থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন। গল্পটি মনে হয় বাংলাদেশের সবাই জানে তাই কেউই প্রধানমন্ত্রীকে সত্য কথাগুলো বলছে না। বরং সামাজিক গণমাধ্যম এবং মূলধারার মাধ্যমে অনেককেই দেখা যাচ্ছে, তারা প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন এটা প্রমাণ করার, আমরা প্রধানমন্ত্রীর লোক। কেউ করছেন ফেসবুকের প্রোফাইল ছবিতে একটি ফ্রেম ব্যবহার করে, যাতে লেখা আছে, ‘উই অল আর প্রাইম মিনিস্টারস মেন’।

কেউ বলছে না ভুল তথ্যের জবাব হচ্ছে সঠিক তথ্য প্রকাশ। আর অপপ্রচার থেকে বাঁচা বা ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের উপায়ও আসল সত্য তুলে ধরা। ভিন্নমতের জবাব দিতে হবে পাল্টা যুক্তিতে। সরকারকে সেই সৎপরামর্শ না দিয়ে যে পথটি অনুসরণে উৎসাহিত করা হচ্ছে তা সঠিক পথ নয়। বাংলাদেশের প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতি হয়েছে মাকাল ফলের মত। বাইরে থেকে দেখতে সুন্দর, ভিতরে নোংরা এবং অখাদ্য। আবার দেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল যার বাইরে কাটা অথচ ভিতরে শত শত সুস্বাদু রসে ভরা কী চমৎকার মজাদার খাবার!

দেশের মানুষের চরিত্র মাকাল ফলের চেয়েও খারাপ; কারণ মাকাল ফল অগত্যা দেখতে ভালো। যে দেশের জাতীয় খেলা হাডুডু বা কাবাডি যাই হোক না কেন, জিততে হলে টেনে ধরে রাখতে হবে, সামনে যেতে দেওয়া যাবে না এবং যে দেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল যার মধ্য রয়েছে শত শত রসাল ফল এবং বিচি, সেই দেশের মানুষ আমরা! কী জানি বাবা, বোঝা মুশকিল! কীভাবে এবং কবে আমরা বাঙালি হবো, বাংলাদেশি আর কবেই বা হবে আমাদের জাতীয় চরিত্রের সনাক্তকরণ? 

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, rahman.mridha@gmail.com

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

০৭ মার্চ, ২০২১
১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১
০২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১