সুইডিশ বনাম বাঙ্গালীর ভালোবাসা
jugantor
সুইডিশ বনাম বাঙ্গালীর ভালোবাসা

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে  

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১০:১২:০১  |  অনলাইন সংস্করণ

লেখক ও তার সহধর্মিণী

সুইডিশ ভাষার একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ শব্দ লুস্ট (lust) যার বাংলা আভিধানিক অর্থ আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছা। অনেকভাবে চেষ্টা করেছি সুইডিশদের মত করে শব্দটির অর্থ খুঁজে পেতে কিন্তু অনুভূতিটা পাইনি। সুইডিশরা লুস্ট শব্দটি ব্যবহার করে যেমন লুস্ট আত অ্যালস্কা (lust att älska), লুস্ট আত রেছা (lust att resa), লুস্ট আত লেভা (lust att leva)।

বাংলায় মানে দাঁড়াবে ভালোবাসার ইচ্ছা, ভ্রমণ করার শখ, বেঁচে থাকার শখ। মানব জীবনে লুস্ট ছাড়া সব কিছুই মূল্যহীন। কারণ লুস্ট না থাকা মানে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা মনের বিরুদ্ধে জোর করে কিছু করা। জোর করে কিছু করার মাঝে মজা আছে কি? নেই। তাই সচরচার সুইডিশ জাতি লুস্ট শব্দটি ব্যবহার করে থাকে সুন্দর কিছু করতে বা ভাবতে।

আরেকটি শব্দ লগোম (lagom) এর সঠিক (১০০% সিনোনিম বা প্রতিশব্দ) ব্যবহার পৃথিবীর অন্য কোন ভাষায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। লগোমের বাংলা আভিধানিক অর্থ ‘ঠিক’ বলা যেতে পারে। আমরা যেমন বলি তরকারিতে লবণ ঠিক হয়েছে, মানে কম বা বেশি হয়নি। ‘লগোম’ এবং ‘ঠিক’ শব্দটি সত্যিকার অর্থে একই মনে হয় আমার কাছে। তবুও এরা যখন লগোম শব্দটি ব্যবহার করে তখন তা পারফেক্টলি ম্যাচ করে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে।

লুস্ট এবং লগোম দুটি শব্দ যা অন্য দশটা শব্দের মত নয়। কারণ এ দুটো শব্দে জড়িয়ে রয়েছে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষার ছন্দ এবং গন্ধ যা সত্যিকার জীবন খুঁজে পেতে সাহায্য করে। যে জীবনে লুস্ট নেই সে জীবনের মূল্য নেই। যে জীবনে ভালোবাসা নেই সে জীবনের মানে নেই।

সুইডিশ জাতি ভালোবাসা শব্দটিও খুব ব্যবহার করে থাকে। ভালোবাসার সুইডিশ মানে অ্যালস্কা (älska)। ইয়গ অ্যালস্কার দেই (Jag älskar dig) - আমি তোমাকে ভালোবাসি। মজার বিষয় হলো শুধু বাংলা ভাষাতেই কয়েকভাবে যেমন তোমাকে আমি ভালোবাসি, ভালোবাসি তোমাকে আমি, ভালোবাসি আমি তোমাকে বা আমি তোমাকে ভালোবাসি বলা এবং লিখা যায় যা অন্য কোন ভাষায় সম্ভব কিনা জানি না।

এত সুন্দর একটি শব্দ ভালোবাসা এবং এতভাবে একে বলা যায় তারপরও আমরা ভালোবাসার সঠিক মূল্যায়ন করতে অনেক সময় ভুলে যাই!

বহু বছর আগের কথা। একবার একটি সুইডিশ মেয়েকে সামান্য পরিচয়ে বলেছিলাম আমি তোমাকে ভালোবাসি। মেয়েটি আমাকে বলেছিল কোথায়, কখন, কীভাবে? আরও বলেছিল তুমি আমাকে ভালোবাসো অথচ আমি তো তার কিছুই না পারছি দেখতে, না পারছি অনুভব করতে, না পারছি বুঝতে? আমি তো অবাক! বলে কী? পরে বুঝেছিলাম কেন সে অমন করে বলেছিল।

ভালোবাসা এক কেন্দ্রিক হলে যা হয় আরকি। দুটি মন যখন দুজনার না হয়ে এক হয়ে যায় তখনই ভালোবাসা দেখা, শোনা, চেনা, স্পর্শ, জানা এবং অনুভব করা যায়। ভালোবাসা বেঁচে থাকার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা যার মধ্যে রয়েছে শুধু ভালোবাসা।

জীবনে লুস্ট, লগোম এবং অ্যালস্কা না থাকলে জীবনের মূল্য খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। পৃথিবীতে যারা লগোম, লুস্ট এবং ভালোবাসার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় মগ্ন হয়েছে তারাই জীবনে বেঁচে থাকার সাধ পেয়েছে। ভালোবাসার উপর লিখাটি ১৪ ফেব্রুয়ারির ভালোবাসা দিবসের সৌজন্যে লেখা হলেও ভাবাটি হতে পারে প্রতিক্ষণ এবং সারাক্ষণের জন্য।

কারণ ভালোবাসা এমন একটি সুন্দর স্বর্গীয় জিনিষ যা বছরে একবার নয়; বার বার ফিরে আসা উচিৎ আমাদের সবার জীবনে। ভালোবাসা ফিরে আসুক গ্রীষ্ম, বর্ষা, হেমন্ত, শীত, বসন্ত, শরত, সময়ে অসময়ে।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, rahman.mridha@gmail.com

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

সুইডিশ বনাম বাঙ্গালীর ভালোবাসা

 রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে 
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১০:১২ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ
লেখক ও তার সহধর্মিণী
লেখক ও তার সহধর্মিণী

সুইডিশ ভাষার একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ শব্দ লুস্ট (lust) যার বাংলা আভিধানিক অর্থ আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছা। অনেকভাবে চেষ্টা করেছি সুইডিশদের মত করে শব্দটির অর্থ খুঁজে পেতে কিন্তু অনুভূতিটা পাইনি। সুইডিশরা লুস্ট শব্দটি ব্যবহার করে যেমন লুস্ট আত অ্যালস্কা (lust att älska), লুস্ট আত রেছা (lust att resa), লুস্ট আত লেভা (lust att leva)।

বাংলায় মানে দাঁড়াবে ভালোবাসার ইচ্ছা, ভ্রমণ করার শখ, বেঁচে থাকার শখ। মানব জীবনে লুস্ট ছাড়া সব কিছুই মূল্যহীন। কারণ লুস্ট না থাকা মানে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা মনের বিরুদ্ধে জোর করে কিছু করা। জোর করে কিছু করার মাঝে মজা আছে কি? নেই। তাই সচরচার সুইডিশ জাতি লুস্ট শব্দটি ব্যবহার করে থাকে সুন্দর কিছু করতে বা ভাবতে।

আরেকটি শব্দ লগোম (lagom) এর সঠিক (১০০% সিনোনিম বা প্রতিশব্দ) ব্যবহার পৃথিবীর অন্য কোন ভাষায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। লগোমের বাংলা আভিধানিক অর্থ ‘ঠিক’ বলা যেতে পারে। আমরা যেমন বলি তরকারিতে লবণ ঠিক হয়েছে, মানে কম বা বেশি হয়নি। ‘লগোম’ এবং ‘ঠিক’ শব্দটি সত্যিকার অর্থে একই মনে হয় আমার কাছে। তবুও এরা যখন লগোম শব্দটি ব্যবহার করে তখন তা পারফেক্টলি ম্যাচ করে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে।

লুস্ট এবং লগোম দুটি শব্দ যা অন্য দশটা শব্দের মত নয়। কারণ এ দুটো শব্দে জড়িয়ে রয়েছে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষার ছন্দ এবং গন্ধ যা সত্যিকার জীবন খুঁজে পেতে সাহায্য করে। যে জীবনে লুস্ট নেই সে জীবনের মূল্য নেই। যে জীবনে ভালোবাসা নেই সে জীবনের মানে নেই। 
  
সুইডিশ জাতি ভালোবাসা শব্দটিও খুব ব্যবহার করে থাকে। ভালোবাসার সুইডিশ মানে অ্যালস্কা (älska)। ইয়গ অ্যালস্কার দেই (Jag älskar dig) - আমি তোমাকে ভালোবাসি। মজার বিষয় হলো শুধু বাংলা ভাষাতেই কয়েকভাবে যেমন তোমাকে আমি ভালোবাসি, ভালোবাসি তোমাকে আমি, ভালোবাসি আমি তোমাকে বা আমি তোমাকে ভালোবাসি বলা এবং লিখা যায় যা অন্য কোন ভাষায় সম্ভব কিনা জানি না।

এত সুন্দর একটি শব্দ ভালোবাসা এবং এতভাবে একে বলা যায় তারপরও আমরা ভালোবাসার সঠিক মূল্যায়ন করতে অনেক সময় ভুলে যাই! 

বহু বছর আগের কথা। একবার একটি সুইডিশ মেয়েকে সামান্য পরিচয়ে বলেছিলাম আমি তোমাকে ভালোবাসি। মেয়েটি আমাকে বলেছিল কোথায়, কখন, কীভাবে? আরও বলেছিল তুমি আমাকে ভালোবাসো অথচ আমি তো তার কিছুই না পারছি দেখতে, না পারছি অনুভব করতে, না পারছি বুঝতে? আমি তো অবাক! বলে কী? পরে বুঝেছিলাম কেন সে অমন করে বলেছিল। 

ভালোবাসা এক কেন্দ্রিক হলে যা হয় আরকি। দুটি মন যখন দুজনার না হয়ে এক হয়ে যায় তখনই ভালোবাসা দেখা, শোনা, চেনা, স্পর্শ, জানা এবং অনুভব করা যায়। ভালোবাসা বেঁচে থাকার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা যার মধ্যে রয়েছে শুধু ভালোবাসা। 

জীবনে লুস্ট, লগোম এবং অ্যালস্কা না থাকলে জীবনের মূল্য খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। পৃথিবীতে যারা লগোম, লুস্ট এবং ভালোবাসার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় মগ্ন হয়েছে তারাই জীবনে বেঁচে থাকার সাধ পেয়েছে। ভালোবাসার উপর লিখাটি ১৪ ফেব্রুয়ারির ভালোবাসা দিবসের সৌজন্যে লেখা হলেও ভাবাটি হতে পারে প্রতিক্ষণ এবং সারাক্ষণের জন্য।

কারণ ভালোবাসা এমন একটি সুন্দর স্বর্গীয় জিনিষ যা বছরে একবার নয়; বার বার ফিরে আসা উচিৎ আমাদের সবার জীবনে। ভালোবাসা ফিরে আসুক গ্রীষ্ম, বর্ষা, হেমন্ত, শীত, বসন্ত, শরত, সময়ে অসময়ে।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, rahman.mridha@gmail.com

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

০৭ মার্চ, ২০২১
১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১
০২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১