‘আমি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি’: ফিলিস্তিনি অধ্যাপক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৩:৫৯ পিএম
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক খুলুদ আবু সাহমুদ। সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ওষুধ ও চিকিৎসার জন্য রোগীদের সরিয়ে নেওয়ার ওপর ইসরাইলি বিধিনিষেধের কারণে হাজার হাজার ক্যানসার রোগী জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
দক্ষিণ গাজার একটি স্কুলকে রূপান্তর করা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রে। সেই ভবনের সিঁড়ির নিচে একটি ছোট্ট, ঘিঞ্জি জায়গায় ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ে ধীরে ধীরে হেরে যাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক খুলুদ আবু সাহমুদ।
১৫টি কেমোথেরাপি সেশনের পর ৩৩ বছর বয়সি এই ফিলিস্তিনি মাকে জানিয়ে দেওয়া হয়, তিনি আর চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারবেন না। কারণ, যুদ্ধবিধ্বস্ত এই ছিটমহলে বর্তমানে যেসব ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো তার ক্যানসারের ধরনের জন্য উপযুক্ত নয়। তিনি দুই সন্তানের জননী।
মিডল ইস্ট আইকে আবু সাহমুদ বলেন, প্রায় নয় মাস আগে আমার মেয়ের জন্মের পরপরই আমার লিভার ক্যানসার ধরা পড়ে। কিন্তু কয়েকটি কেমোথেরাপি সেশনের পর আমার শারীরিক অবস্থার শুধু অবনতিই হতে থাকে।
তিনি বলেন, চিকিৎসক আমাকে জানান যে, এই চিকিৎসা আমার শরীর বা অবস্থার জন্য মানানসই নয়। কেমোথেরাপি কখনো আমার ক্যানসার নিরাময় করেনি; এটি কেবল আমার চুল ও নখ ঝরে যাওয়ার কারণ হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই আমার নখের কিছু অংশ খসে পড়ে।
২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রায় ১০ মাস পরও গাজায় জীবন রক্ষাকারী জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ অব্যাহত রেখেছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে রয়েছে ক্যানসারের ওষুধ, কেমোথেরাপি, অ্যান্টিবায়োটিক, চেতনানাশক, পরীক্ষাগারের সরঞ্জাম, রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি এবং সার্জারির বিভিন্ন উপকরণ।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, গত মার্চের মধ্যেই গাজায় প্রায় ৪৬ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ এবং ৬৬ শতাংশ চিকিৎসা সরঞ্জামের মজুত পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়।
চলতি মাসে ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্যানসারের বিশেষ ওষুধের মজুত তলানিতে ঠেকায় স্তন, কোলোরেক্টাল ও গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ক্যানসার, মাথা ও ঘাড়ের টিউমার এবং সারকোমাসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের কেমোথেরাপি চিকিৎসা অনেকাংশেই বন্ধ হয়ে গেছে।
মন্ত্রণালয় আরও জানায়, গাজার প্রায় ১১ হাজার ক্যানসার রোগীর মধ্যে অন্তত ৪ হাজার জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার মেডিকেল রেফারেল দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা এখনো গাজা ছাড়ার অনুমতির অপেক্ষায় আছেন।
গাজা সেন্টার ফর ক্যানসারের পরিচালক ড. মোহাম্মদ আবু নাদা বলেন, চরম সংকটের কারণে আমরা মেয়াদোত্তীর্ণ কিছু ওষুধ ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলাম। এখন সেগুলোও ফুরিয়ে গেছে। এতে স্পষ্টতই মৃত্যুর হার বাড়ছে।
আবু নাদা জানান, গাজায় বর্তমানে কেমোথেরাপির ওষুধের যে চরম সংকট চলছে, তা গত কয়েক বছরের মধ্যে ভয়াবহতম।
উদাহরণস্বরূপ, স্তন ক্যানসারের জন্য আমাদের কাছে যেটুকু ওষুধ অবশিষ্ট আছে, তা বর্তমান রোগীদের জন্যই যথেষ্ট নয়। নতুন কোনো রোগী শনাক্ত হলে তাদের দেওয়ার মতো কোনো চিকিৎসা আমাদের কাছে নেই।
প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতি অনুসরণের বদলে চিকিৎসকেরা এখন বাধ্য হয়ে ক্রমবর্ধমান হারে ‘সিঙ্গেল-ড্রাগ থেরাপি’ বা একটি মাত্র ওষুধের ওপর নির্ভর করছেন।
আবু নাদা বলেন, এটি পরিষ্কারভাবেই চিকিৎসার কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, পরিস্থিতি আরও খারাপ করে এবং আরও জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। আমরা ইমিউনোথেরাপির ওষুধেরও তীব্র সংকটের মুখোমুখি হচ্ছি, যা আমাদের রোগীদের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
‘অন্তহীন অপেক্ষা’
রোগ নির্ণয়ের পরপরই আবু সাহমুদের মেডিকেল রেফারেল অনুমোদন করা হয়েছিল, কারণ তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গাজায় ছিল না। নয় মাস পরও তিনি গাজা ছাড়ার অপেক্ষায় আছেন।
তিনি বলেন, চিকিৎসকেরা আমাকে বলেছিলেন, আমার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা জর্ডান বা তুরস্কে পাওয়া যায় এবং এখানে থেকে আমার অবস্থার উন্নতির কোনো উপায় নেই। আমি জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসার জন্য স্থানান্তরের আশায় নয় মাস ধরে অপেক্ষা করছি।
মেডিকেল রেফারেলের মাধ্যমে গাজার রোগীরা অধিকৃত পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম, মিসর ও জর্ডানের হাসপাতালগুলোতে গিয়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পান, যা গাজায় পাওয়া যায় না।
যদিও সাধারণত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই রেফারেল ইস্যু ও এর অর্থায়ন করে, তারপরও রোগীদের ইসরায়েল বা মিসরের নিয়ন্ত্রণাধীন ক্রসিংগুলো পার হওয়ার জন্য অনুমতির প্রয়োজন হয়।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় গণহত্যা শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইল চিকিৎসাজনিত রেফারেল এবং গাজা থেকে রোগীদের সরিয়ে নেওয়ার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর ফলে হাজার হাজার গুরুতর অসুস্থ ও আহত ফিলিস্তিনি স্থানীয়ভাবে অপ্রতুল চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির চার মাস পর, ইসরাইল কঠোর নিয়ন্ত্রণের অধীনে চিকিৎসাজনিত কারণে মিসর সীমান্ত দিয়ে রোগীদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য রাফা ক্রসিং আংশিকভাবে খুলে দেয়। এর আওতায় প্রতিদিন মাত্র প্রায় ৫০ জন রোগীকে গাজা ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়—তাও ইসরাইলি অনুমোদনের সাপেক্ষে।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় চার হাজার শিশুসহ ২০ হাজারের বেশি মানুষ জরুরি চিকিৎসাজনিত স্থানান্তরের অপেক্ষায় রয়েছেন।
ফেব্রুয়ারিতে রাফা ক্রসিং পুনরায় খোলার পর, গত ৩০ জুন পর্যন্ত মাত্র ১ হাজার ৬৫৫ জন রোগীকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত গাজা ছাড়ার অনুমতির অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় ১ হাজার ৫৭০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
আবু সাহমুদ বলেন, এই অন্তহীন অপেক্ষার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিনই আমার স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে। আমার আগে আরও অগণিত রোগী স্থানান্তরের অপেক্ষায় রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, আমি শ্বাসকষ্টে ভুগছি এবং শরীরে তরল জমার কারণে আমার পেট ফুলে গেছে। আমার ওজন অস্বাভাবিকভাবে কমে যাচ্ছে; এ পর্যন্ত প্রায় ২০ কেজি ওজন হারিয়েছি। এমন অনেক সময় যায় যখন পেটে তরল জমার কারণে আমি কিছুই খেতে পারি না; যখনই কিছু খাই, তরলের পরিমাণ বেড়ে যায়।
পাঁচ বছরের এক ছেলে এবং নয় মাসের এক মেয়ের এই মা জানান, সন্তান জন্মের পর থেকে তিনি ছোট মেয়েটিকে একবার কোলেও নিতে পারেননি।
তিনি বলেন, আমি আমার সন্তানদের প্রতি কোনো দায়িত্বই পালন করতে পারছি না। অসুস্থতার কারণে আমি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছি। আমি কখনোই বিছানা ছেড়ে উঠি না এবং বিন্দুমাত্র শারীরিক পরিশ্রমও করতে পারি না। এখন আমি বেশিক্ষণ হাঁটতেও পারি না। সামান্য একটু হাঁটলেই প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আমি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
বাস্তুচ্যুতির মধ্যে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই
মেডিকেল স্থানান্তরের অপেক্ষায় থাকা অনেক রোগীর অবস্থারই অবনতি হয়েছে। কারণ, ইসরাইলি হামলা গাজার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে অচল করে দিয়েছে এবং মানুষদের বারবার বাস্তুচ্যুত হয়ে গাদাগাদি করে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে থাকতে বাধ্য করেছে, যেখানে বিশুদ্ধ পানি বা পয়োনিষ্কাশনের তেমন কোনো ব্যবস্থাই নেই।
আবু সাহমুদ জানান, গণহত্যা শুরু হওয়ার পর নিজের বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তাকে প্রায় ৩০ বার জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে।
অতি সম্প্রতি তাকে খান ইউনিসের পশ্চিমে মাওয়াসি আল-কারারা এলাকার একটি তাঁবুতে বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিতে হয়। সেখানে যাওয়ার পরপরই তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে শুরু করে।
তিনি বলেন, আমি তাঁবুর জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিলাম না। সেখানকার পরিবেশ ছিল চরম অস্বাস্থ্যকর এবং আমার আরও ভালো একটি জায়গা দরকার ছিল। তাই আমি আমার বড় বোনের শরণাপন্ন হই।
আমার বোনও বাস্তুচ্যুত এবং সে আহমেদ বিন আবদুল আজিজ স্কুলের সিঁড়ির নিচে থাকে। তার সঙ্গে গিয়ে ওঠা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না। আজ আমাদের দুটি পরিবারের মোট প্রায় ১০ জন মানুষ এখানে একসঙ্গে বাস করছি।
আমার মতো শারীরিক অবস্থার একজন মানুষের জন্য এই পরিবেশ একেবারেই অনুপযুক্ত। এখানে একজন সুস্থ মানুষের পক্ষে টিকে থাকাই কঠিন, ক্যানসার রোগীর কথা তো বাদই দিলাম।
তার বিছানার পাশেই রাখা আছে ওষুধের একটি বাক্স, যা ইঁদুর থেকে সাবধানে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। তার পাশেই রয়েছে একটি ব্যাগ, যার ভেতর রয়েছে বছরের পর বছর ধরে পড়াশোনা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জন করা তার প্রায় ৫০টি একাডেমিক সনদ।
ক্যানসার তার জীবনের গতিপথ বদলে দেওয়ার আগে পরিবার ও বন্ধুদের কাছে তিনি ‘বইপোকা’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
তিনি বলেন, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি শেষ করার পর, গাজার ইসলামিক ইউনিভার্সিটি আমাকে তাদের ইতিহাসের প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে সম্মানিত করেছিল, যে কিনা দুই বছরের স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম মাত্র এক বছর চার মাসে শেষ করেছিল।
এরপর তিনি পিএইচডি শুরু করেন এবং পরে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যক্রম ও শিক্ষাদান পদ্ধতি বিষয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।
তিনি বলেন, আমি শিখতে ভালোবাসি। আমার পুরো জীবনটাই শিক্ষার প্রতি নিবেদিত ছিল। আমার স্বপ্ন ছিল একজন অধ্যাপক হওয়ার এবং পিএইচডির পরও আমার একাডেমিক যাত্রা চালিয়ে যাওয়ার। আমি কখনোই শেখা থামাতে চাইনি।
কিন্তু এই অসুস্থতা আমার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো চিকিৎসার জন্য এই অপেক্ষা, যার কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না।
সূত্র: মিডেল ইস্ট আই

