Logo
Logo
×
   

আন্তর্জাতিক

ইহুদি স্কুলগুলোতে শিক্ষাদানের চেয়ে নিরাপত্তা সামলাতেই বেশি ব্যস্ত প্রধান শিক্ষকরা

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৫ এএম

ইহুদি স্কুলগুলোতে শিক্ষাদানের চেয়ে নিরাপত্তা সামলাতেই বেশি ব্যস্ত প্রধান শিক্ষকরা

যুক্তরাজ্যের একাধিক ইহুদি স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের শিক্ষাদান বা প্রশাসনিক কাজের চেয়ে স্কুলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সামলাতেই নিজেদের সিংহভাগ সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। সম্প্রতি স্কুল ও কলেজে ইহুদিবিদ্বেষ (অ্যান্টিসেমিটিজম) বিষয়ক এক নিরপেক্ষ পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। খবর বিবিসির। 

যুক্তরাজ্য সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত এই পর্যালোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির শিক্ষা পরিদর্শনের প্রধান কার্যালয় ‘অফস্টেড’-এর সাবেক প্রধান পরিদর্শক এবং সান্ডারল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভাইস চ্যান্সেলর স্যার ডেভিড বেল। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইহুদি ধর্মীয় স্কুলগুলোর প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে তিনি অত্যন্ত স্তম্ভিত। অধিকাংশ প্রধান শিক্ষকই তাকে জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার চেয়ে এখন নিরাপত্তাই তাদের প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ক্ষেত্রবিশেষে ‘শিক্ষা’ দ্বিতীয় সারিতে চলে যাচ্ছে। 

শিশুদের প্রতি এই ধরনের ইহুদিবিদ্বেষমূলক আচরণের মাত্রা অত্যন্ত ‘বেদনাদায়ক ও উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন স্যার ডেভিড বেল। চলতি বছরের শরৎকালে পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে যাওয়া এই প্রতিবেদনে ইংল্যান্ডের ধর্মীয় ও সাধারণ স্কুল-কলেজগুলোতে ইহুদি শিক্ষার্থী এবং কর্মীদের অভিজ্ঞতার কথা বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। 

তিনি জানান, তদন্তে দেখা গেছে ইহুদি শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে কটু কথা ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। তার মতে, ইহুদি শিশুরা এখন এমন এক চাপ বা সংকটের মুখোমুখি, যা দেশের অন্যান্য সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে দেখা যায় না।

বিবিসি জানিয়েছে, এই পর্যালোচনার ভিত্তিতে যুক্তরাজ্য সরকার সব শিক্ষকের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইহুদিবিদ্বেষ সচেতনতা বাড়ানোর বিষয়ে সুপারিশ করতে পারে। 

বিবিসি বেশ কয়েকজন ইহুদি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে তারা কেউই নাম প্রকাশ করতে সম্মত হননি। 

একজন প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা আমাদের মূল অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন সপ্তাহও গেছে যখন আমার কর্মঘণ্টার প্রায় ৯০ শতাংশ সময় কেবল নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যয় করতে হয়েছে। দিন শেষে রাতে ঘুমানোর সময়ও এই উদ্বেগের বোঝা আমাদের তাড়া করে ফেরে।’ 

গত ১৩ বছর ধরে অপর একটি ইহুদি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমার পুরো ক্যারিয়ারে নিরাপত্তা নিয়ে আমাকে এতটা সময় বা শক্তি ব্যয় করতে হয়নি। প্রতিদিনের মূল অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল স্কুলের শিক্ষার মান উন্নয়ন করা। কিন্তু এখন প্রতিটি মুহূর্তে শিশুদের নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে পড়াশোনা ভেস্তে যাচ্ছে।’ 

স্যার ডেভিড বেলের এই পর্যালোচনায় অন্তত ৫,০০০ শিক্ষার্থীর ওপর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিবিষয়ক সংস্থা ‘ইউকাস’-এর পরিচালিত এক জরিপের তথ্য যুক্ত করা হয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুল বা কলেজে সরাসরি ইহুদিবিদ্বেষমূলক আচরণের শিকার হয়েছে অথবা তা হতে দেখেছে। 

এদিকে ইহুদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা সংস্থা ‘কমিউনিটি সিকিউরিটি ট্রাস্ট’ (সিএসটি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম অর্ধের মধ্যে স্কুলে ইহুদিবিদ্বেষী ঘটনার রেকর্ড সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের প্রথম ৬ মাসে যা ছিল ১১২টি, ২০২৬ সালের একই সময়ে তা ৫৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৮টিতে। 

বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী লুসি পাওয়েল জানান, এই সমীক্ষাটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তিনি বেল কমিশনের সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন যাতে দেশের স্কুল-কলেজে সব ধরনের বর্ণবাদ ও ধর্মীয় বিদ্বেষ বন্ধ করা যায়। 

শিক্ষার্থীদের তিক্ত অভিজ্ঞতা 

চেশায়ারের বাসিন্দা ও শিক্ষার্থী জোনাথন ফ্রিশার জানায়, ২০২০ সালে সেকেন্ডারি স্কুলে ভর্তির পর থেকেই সে ইহুদিবিদ্বেষী আক্রমণের শিকার হতে শুরু করে। সে বলে, ‘আমার ক্লাসে স্বস্তিকা চিহ্ন আঁকা হতো এবং অনেকে নাৎসিদের মতো সালাম দিত। আমাকে গ্যাস চেম্বারে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করা হতো। আমার পরিবার যেহেতু হোলোকস্টের ভয়াবহতার মধ্য দিয়ে গেছে, তাই এই ধরনের মন্তব্য সহ্য করা আমার জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল।’ 

তবে স্কুলে যখন ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ে সচেতনতামূলক একটি বিশেষ ক্লাস নেওয়া হয়, তখন পরিস্থিতির রাতারাতি উন্নতি হয় উল্লেখ করে জোনাথন বলে, ‘লোকেরা নিজের ভুল বুঝতে পেরে আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছিল। এটি যদি আমার স্কুলে কাজ করে, তবে দেশের অন্যান্য স্কুলেও সফল হবে।’ 

লন্ডনের এক ইহুদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা জানান, চলতি বছরের শুরুর দিকে গোল্ডার্স গ্রিন এলাকায় ইহুদিদের ওপর হামলা ও ছুরিকাঘাতের পর থেকে স্কুলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অভাবনীয়ভাবে বাড়ানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘স্কুলের ভেতরে ও বাইরে সার্বক্ষণিক সশস্ত্র বা বিশেষ নিরাপত্তারক্ষীরা টহল দেয়। সকালে যখন আমি গাড়ি নিয়ে স্কুলে ঢুকি, তখন আন্ডার-কার মিরর (গাড়ির নিচ দেখার বিশেষ আয়না) দিয়ে আমার গাড়ি তল্লাশি করা হয়।’ 

স্কুলযাত্রায় বা খেলাধুলার অনুষ্ঠানেও শিশুরা বাসে ও মাঠে অন্য শিশুদের দ্বারা কটূক্তির শিকার হচ্ছে বলে জানান তিনি। ওই শিক্ষিকা আক্ষেপ করে বলেন, ‘একবার আমার এক ছোট শিক্ষার্থী আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল— মানুষ কেন ইহুদিদের এত ঘৃণা করে? সত্যি বলতে, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার জন্য খুবই কঠিন ছিল।’ 

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .