Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

মদিনা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় ইসলামের প্রথম সামরিক বার্তা

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৯ পিএম

মদিনা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় ইসলামের প্রথম সামরিক বার্তা

ছবি: সংগৃহীত

মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) এক শান্তিময়, সুসংহত ও সুদৃঢ় সমাজ বিনির্মাণে আত্মনিয়োগ করেন। মসজিদ নির্মাণ, আনসার-মুহাজিরদের মধ্যে আত্মিক ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং মদিনার ইহুদিদের সাথে ঐতিহাসিক সনদ স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে নবগঠিত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ভিত্তি মজবুত হয়। তবে মক্কার কুরাইশরা তখনও মুসলমানদের সমূলে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র থেকে সরে আসেনি। এই বাস্তবতায় মদিনা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং কুরাইশদের বাণিজ্যিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার লক্ষ্যে সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা ছিল সময়ের অনিবার্য দাবি। সেই প্রেক্ষাপটেই সূচনা হয় ইসলামের প্রথম সামরিক অভিযান ‘সারিয়্যায়ে হামজা’।

যুদ্ধের অনুমতি ও প্রতিরক্ষার নতুন অধ্যায়

দীর্ঘ তেরো বছর মক্কায় চরম জুলুম ও নিপীড়ন সহ্য করার পর, মদিনায় এসে মুসলমানদের আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হয়। আল্লাহ তাআলার ঘোষণা—

أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا ۚ وَإِنَّ اللَّهَ عَلَىٰ نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ

‘যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাদের যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো; কারণ তাদের ওপর অবিচার করা হয়েছে। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাহায্য করতে পূর্ণ সক্ষম।’ (সুরা আল-হজ: আয়াত ৩৯)

আল্লাহর এই নির্দেশের পর সাহাবিরা নিজেদের মানসিক ও সামরিকভাবে প্রস্তুত করতে শুরু করেন। মদিনার আশপাশের গোত্রগুলোর সঙ্গে জোট গঠন এবং সাহাবিদের যুদ্ধের বাস্তব প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রক্রিয়াও গতিশীল হয়।

সারিয়্যায়ে হামজার প্রেক্ষাপট ও প্রস্তুতি

হিজরতের মাত্র সাত মাস পর, প্রথম হিজরির রমজান মাসে মদিনা থেকে পরিচালিত হয় ইসলামের প্রথম সামরিক অভিযান। এই অভিযানে সেনাপতির দায়িত্ব পান রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা বীরযোদ্ধা হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.)। এটিই ছিল ইসলামের ইতিহাসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে কোনো সেনাপতিকে সামরিক পতাকা হস্তান্তরের প্রথম ঘটনা।

এ অভিযানের সেনাপতি ছিলেন হজরত হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.)। আর সাদা পতাকাবাহক ছিলেন হজরত আবু মারসাদ আল-গানায়ি (রা.)।

সৈন্যসংখ্যা ও বৈশিষ্ট্য: ৩০ জন সাহসী মুহাজির সাহাবি (এ দলে কোনো আনসার সদস্য ছিলেন না)। বিশিষ্ট সাহাবিদের মধ্যে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ, আবু হুযাইফা ইবনে উতবা, সালেম মাওলা আবু হুযাইফা ও যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

অভিযানের লক্ষ্য: সিরিয়া থেকে মক্কার পথে ফিরে আসা আবু জাহলের নেতৃত্বাধীন ৩০০ জন আরোহীর একটি কুরাইশ বাণিজ্যিক কাফেলার গতিবিধি রোধ করা।

সিফুল বাহরে মুখোমুখি অবস্থান ও মধ্যস্থতা

লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী ‘সিফুল বাহর’ এলাকায় আল-ঈস অঞ্চলের কাছে উভয় দল মুখোমুখি হয়। একদিকে মাত্র ৩০ জন অকুতোভয় মুসলিম যোদ্ধা, অন্যদিকে দশ গুণ বড় সশস্ত্র কাফেলা। যুদ্ধের জন্য উভয় পক্ষ যখন সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াল, তখন পরিস্থিতি সংঘাতময় হয়ে ওঠে।

ঠিক সেই মুহূর্তে দুই পক্ষেরই মিত্র গোত্রপ্রধান মুজদি ইবনে আমর আল-জুহানি এগিয়ে আসেন। তিনি অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ অবস্থান নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করেন এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঠেকিয়ে দেন। ফলে কোনো প্রকার রক্তপাত ছাড়াই কুরাইশ কাফেলা মক্কার দিকে চলে যায় এবং মুসলিম সেনাদল বীরদর্পে মদিনায় ফিরে আসে।

ঈমানি সাহসিকতা ও আল্লাহর প্রতিদান

সংখ্যায় নগণ্য হলেও সাহাবিরা যেভাবে পাহাড়সম আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাফেরদের মোকাবিলায় দাঁড়িয়েছিলেন, তা ইসলামের মূল চেতনার প্রতিফলন। রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর পথে লড়াইয়ের ফজিলত সম্পর্কে বলেন—

رِبَاطُ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ خَيْرٌ مِنْ صِيَامِ شَهْرٍ وَقِيَامِهِ

‘আল্লাহর পথে (সীমান্ত সুরক্ষায়) এক দিন ও এক রাত পাহারা দেওয়া এক মাস ধরে সিয়াম পালন ও রাত জেগে ইবাদত করার চেয়েও উত্তম।’ (মুসলিম ১৯১৩)

কুরাইশদের প্রতি স্পষ্ট বার্তা

সারিয়্যায়ে হামজা কোনো সাধারণ অভিযান ছিল না, বরং কুরাইশদের দাম্ভিকতার বুকে এটি ছিল এক বলিষ্ঠ আঘাত। এই অভিযানের মাধ্যমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছানো হয়। তাহলো—

  • অসহায়ত্বের অবসান: মক্কায় মুসলমানদের ওপর যে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছিল, সেই দুর্বলতা এখন আর নেই। মদিনা এখন একটি সার্বভৌম ও সামরিক শক্তিসম্পন্ন রাষ্ট্র।
  • বাণিজ্য রুটের অনিরাপত্তা: কুরাইশদের অর্থনীতির প্রধান উৎস ছিল শাম দেশের বাণিজ্য পথ। মুসলমানদের চ্যালেঞ্জের মুখে তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হলো যে, মদিনাকে পাশ কাটিয়ে তাদের বাণিজ্যিক সুবিধা আর অবাধ থাকবে না।
  • মর্যাদা ও অধিকারের সুরক্ষা: অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে মুসলমানরা যে নিজেদের জীবন ও রক্ত উৎসর্গ করতে একবিন্দু দ্বিধাবোধ করবে না, তা ৩০ জন বীর সাহাবির অবিচল অবস্থানে স্পষ্ট হয়ে যায়।

সিফুল বাহর অভিযান ইসলামি সামরিক ইতিহাসের এক অনন্য মাইলফলক। রক্তপাতহীন এই সারিয়্যার মাধ্যমে সাহাবিদের অদম্য সাহস যেমন প্রমাণিত হয়েছিল, তেমনি কুরাইশদের অপশক্তির বিরুদ্ধে ইসলামি প্রতিরোধের শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। এই ধারাবাহিক সামরিক তৎপরতা ও আত্মরক্ষার অটল প্রত্যয়ই পরবর্তী সময়ে ঐতিহাসিক বদর প্রান্তরে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ বিজয়ের পথ উন্মোচন করেছিল।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .