রবিউল আউয়াল: নবীপ্রেমের সুবাসে জেগে উঠুক হৃদয়
Advertisement
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হিজরি বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাস ‘রবিউল আউয়াল’। আরবি ভাষায় ‘রবি’ অর্থ বসন্ত এবং ‘আউয়াল’ অর্থ প্রথম; অর্থাৎ রবিউল আউয়াল হলো বসন্তের সূচনা। প্রকৃতি যেমন শুষ্কতার খোলস ভেঙে বসন্তের ছোঁয়ায় সজীব ও সুবাসিত হয়ে ওঠে, ঠিক তেমনি অজ্ঞতা ও জাহেলিয়াতের ঘোর অন্ধকারে ডুবে থাকা পৃথিবী নবজীবন পেয়েছিল এই মাসেই। মানবজাতির পরম মুক্তির দিশারি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র আগমনে ধন্য হয়েছিল এই মাস। তাই একজন মুমিনের কাছে রবিউল আউয়াল কেবল একটি মাস নয়, বরং নবীপ্রেম, শ্রদ্ধা ও আবেগের এক চিরন্তন ঝরনাধারা।
জাহেলিয়াতের অন্ধকারে আলোর মশাল
আজ থেকে প্রায় চৌদ্দ শ বছর আগে মরুর আরব যখন জাহেলিয়াতের ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত, মানবতা যখন পাশবিকতার কাছে পরাজিত—তখন মহান আল্লাহ তাআলা বিশ্বজগতের জন্য রাহমাতুল্লিল আলামিন হিসেবে তার প্রিয়তম রাসুলকে দুনিয়ায় পাঠান। পবিত্র কোরআনের ঘোষণা—
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ
‘হে নবী, আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমত ও করুণাস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া: আয়াত ১০৭)
বিশুদ্ধ ইতিহাস ও সিরাতগ্রন্থের বিবরণ অনুযায়ী, তৎকালীন বিখ্যাত ‘হস্তী বাহিনীর’ ঘটনার বছর ৫৭০ বা ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দে রবিউল আউয়াল মাসের এক সোমবার উষালগ্নে মহানবী (সা.) এই ধরায় তাশরিফ আনেন। নবীজি (সা.)-এর জন্মের সময় ধাত্রী হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন বিখ্যাত সাহাবি আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর মা শিফা বিনতে আমর। জন্মের পর দাদা আবদুল মুত্তালিব তাকে স্নেহের চাদরে জড়িয়ে কাবাঘরে নিয়ে যান এবং মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে তার নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ’।
হাদিসের উদ্ধৃতি—
হজরত আবু কাতাদা আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্রতি সোমবার রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন—
ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيهِ، وَيَوْمٌ بُعِثْتُ، أَوْ أُنْزِلَ عَلَيَّ فِيهِ
‘এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমাকে নবুওয়াত প্রদান করা হয়েছে (বা ওহি নাজিল শুরু হয়েছে)।’ (মুসলিম ১১৬২)
রবিউল আউয়াল: সিরাতের বহুমাত্রিক স্মৃতি
রবিউল আউয়াল কেবল নবীজি (সা.)-এর আগমনের মাসই নয়, বরং বিশ্বনবীর জীবনের বহু ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে এই মাসের সঙ্গে। তাহলো—
হিজরতের স্মৃতি
মক্কাবাসীর চরম নির্যাতন ও জুলুমের মুখে আল্লাহর নির্দেশে নবুয়াতের চতুর্দশ বর্ষের ১ রবিউল আউয়াল তিনি প্রিয় সঙ্গী হজরত আবু বকর (রা.)-কে নিয়ে মদিনার পথে হিজরত শুরু করেন এবং ৮ মতান্তরে ১২ রবিউল আউয়াল মদিনায় পৌঁছান।
ইসলামের প্রথম মসজিদ
হিজরতের পথে এই মাসেই প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামের প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর ‘মসজিদে কুবা’ এবং পরবর্তীকালে ‘মসজিদে নববি’।
পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় ঘটনা
হিজরি প্রথম সনের রবিউল আউয়ালে নবীজি (সা.) তার কন্যা উম্মে কুলসুম (রা.)-কে উসমান (রা.)-এর সঙ্গে বিয়ে দেন। এ ছাড়া দ্বীনের নিরাপত্তা রক্ষায় ঐতিহাসিক জি-আমর, বনু নাজির এবং বনু লাহয়ান অভিযান এই মাসেই সংঘটিত হয়।
মহামানবের বিদায়বেলা
১১ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার দ্বিপ্রহরে সূর্য ঢলে যাওয়ার পর ৬৩ বছর বয়সে নবুওয়াতের সূর্য মহানবী (সা.) ইহলোক ত্যাগ করেন। তাই এ মাসে উম্মাহর জন্য আগমনের আনন্দ যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে তার চিরবিদায়ের গভীর বেদনা।
নবীপ্রেম: ইমানের মূল ভিত্তি
ইসলামে নবীজি (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ইমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি না ভালোবাসলে মুমিন হওয়া যায় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ
‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তানসন্ততি এবং সমগ্র মানবজাতি অপেক্ষা অধিক প্রিয় হব।’ (বুখারি ১৫, মুসলিম ৪৪)
আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার একমাত্র পথই হলো নবীজি (সা.)-এর জীবনাদর্শের পূর্ণ আনুগত্য। পবিত্র কুরআনের ঘোষণা—
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ
‘(হে রাসুল!) বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও, তবে আমার অনুসরণ কর; তবেই আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন।’ (সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৩১)
নবীজি (সা.)—আমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ
মহান আল্লাহ আরও বলেন—
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا
‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ—তার জন্য, যে আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।’ (সুরা আল-আহযাব: আয়াত ২১)
তার জীবনে আমরা পাই সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ধৈর্য, ক্ষমা, বিনয়, দয়া, সাহস, ইনসাফ, প্রতিবেশীর অধিকার, এতিমের প্রতি মমতা এবং পরিবারের প্রতি উত্তম আচরণের অনুপম শিক্ষা। তাই রবিউল আউয়াল শুধু জীবনী পাঠের মাস নয়; নিজের চরিত্র সংশোধনের মাসও হতে পারে।
রবিউল আউয়ালের আহ্বান ও মুমিনের আমল
রবিউল আউয়াল মাস এলে মুমিনের হৃদয়ে নবীপ্রেমের নতুন স্পন্দন জাগে। কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এই মাসকে আত্মশুদ্ধি ও সুন্নতের অনুশীলনে রূপান্তর করাই মুমিনের প্রধান দায়িত্ব। এ মাসে আমাদের করণীয়—
- নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসরণে প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা।
- আইয়ামে বিজের (চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) নফল রোজা রাখা।
- বেশি বেশি তাহাজ্জুদ ও নফল নামাজ আদায় করা।
- সর্বক্ষণ নবীজি (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার দরুদ ও সালাম পেশ করা।
- নবীজি (সা.)-এর সহিহ সুন্নত শেখা ও বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা।
- তার সিরাত পরিবার ও সন্তানদের সঙ্গে আলোচনা করা।
- সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ক্ষমা ও দয়ার মতো নববী গুণ নিজের চরিত্রে ধারণ করা।
- মানুষের হক আদায় করা এবং অন্যায়-অবিচার থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
নবীজি (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ
দরুদ পাঠের পদ্ধতি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের শিক্ষা দিয়েছেন—
السَّلاَمُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلٰى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ (সা.) ও তার বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যেমন করে রহমত বর্ষণ করেছিলেন ইবরাহিম (আ.) ও তার বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ (সা.) ও তার বংশধরদের ওপর বরকত নাজিল করুন, যেমন করে বরকত নাজিল করেছিলেন ইবরাহিম (আ.) ও তার বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত।’
রবিউল আউয়ালের সবচেয়ে বড় শিক্ষা
রবিউল আউয়ালের প্রকৃত বার্তা হলো—
- নবীজিকে ভালোবাসুন, তাকে জানুন এবং তাকে অনুসরণ করুন।
- শুধু স্লোগানে নয়, আচরণে নবীপ্রেম ফুটে উঠুক।
- শুধু দরুদে নয়, চরিত্রেও সুন্নতের সৌন্দর্য প্রকাশ পাক।
- শুধু সিরাতের আলোচনায় নয়, জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে তাঁর আদর্শ প্রতিফলিত হোক।
আমাদের ব্যবসায় তার আমানতদারি, পরিবারে তার কোমলতা, সমাজে তার ইনসাফ, বিপদে তার ধৈর্য, শত্রুর প্রতি তার ক্ষমা এবং আল্লাহর প্রতি তার পূর্ণ আনুগত্য—এসবই যেন আমাদের জীবনের সৌন্দর্য হয়ে ওঠে।
রবিউল আউয়াল আমাদের ডাক দেয় নবীজি (সা.)-এর অনুপম চরিত্র—সততা, পরোপকার, ইনসাফ ও ক্ষমার আলোকে ব্যক্তি ও সমাজকে নতুন করে গড়ে তোলার। তার রেখে যাওয়া কুরআন ও সুন্নাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করার মাধ্যমেই নিহিত রয়েছে আমাদের প্রকৃত মুক্তি। হে আল্লাহ! এই বরকতময় রবিউল আউয়ালে আমাদের অন্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অকৃত্রিম ভালোবাসা ঢেলে দিন এবং আমাদের জীবনকে তার সুন্নতের পবিত্র রঙে রাঙিয়ে দিন। আমিন।


