সুদের টাকা দরিদ্র আত্মীয়কে দান করা যাবে কি?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অর্থনৈতিক লেনদেন ও সমাজব্যবস্থাকে কলুষমুক্ত রাখতে ইসলাম সুদকে সম্পূর্ণ এবং কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। একজন মুমিনের জীবনের মূল ভিত্তি হলো হালাল উপার্জন ও পবিত্র রিযিক। তবে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার কারণে অনেক সময় শত চেষ্টা সত্ত্বেও অনিচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সুদের কিছু অর্থ জমা হয়ে যায়। এই অনর্জিত ও হারাম অর্থ নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা জায়েজ না থাকলেও, শরিয়তের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা অনুযায়ী তা থেকে মুক্ত হওয়ার সুনির্দিষ্ট পথ রয়েছে।
সুদের অর্থ ব্যবহারের সাধারণ নিয়ম ও দরিদ্র আত্মীয়দের প্রদান
ফোকাহায়ে কেরামের ঐকমত্যের ভিত্তিতে, সুদের অর্থ নিজের ব্যক্তিগত কাজে বা ভোগে কোনোভাবেই ব্যবহার করা যাবে না। তবে এই হারাম অর্থ নিজের জিম্মা থেকে মুক্ত করার জন্য একান্ত প্রয়োজন দেখা দিলে দরিদ্র ও অভাবী মানুষকে তা দান করে দেওয়া যেতে পারে।
দরিদ্র আত্মীয়দের সহায়তা করার বিধান
কোনো আত্মীয় যদি প্রকৃত অর্থেই অভাবী হন এবং জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত বা নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হন, তবে তাকে এই সুদের অর্থ দেওয়া জায়েজ আছে। হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য ফতোয়া (যেমন— দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া) অনুযায়ী, অভাবগ্রস্ত ভাই-বোন, চাচা, ফুফু, মামা কিংবা অন্য কোনো নিকটাত্মীয়কে এই অর্থ দিয়ে সাহায্য করা বৈধ।
সওয়াবের নিয়তের নিষেধাজ্ঞা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুদের অর্থ কোনো গরিব আত্মীয় বা অভাবীকে দেওয়ার সময় মনে বা মুখে সওয়াবের নিয়ত করা যাবে না। কারণ এটি সাধারণ কোনো দান বা সদকা নয়, বরং হারাম অর্থ নিজের সম্পদ থেকে আলাদা করে পবিত্র হওয়ার একটি উপায় মাত্র।
অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে শরিয়তের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
সুদের অর্থ বিতরণের সময় কিছু মৌলিক নিয়ম ও শিষ্টাচার অবশ্যই মেনে চলতে হবে—
ভরণপোষণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে
যে আত্মীয়ের মৌলিক ভরণপোষণের দায়িত্ব সরাসরি আপনার ওপর শরিয়তগতভাবে বর্তায় (যেমন—স্ত্রী, সন্তান বা মা-বাবা), তাদের পেছনে এই সুদের অর্থ খরচ করা যাবে না। নিজের অবশ্যম্ভাবী দায়িত্ব এড়ানোর মাধ্যম হিসেবে সুদের টাকা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষেধ।
প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা
দরিদ্র আত্মীয়ের চিকিৎসা, খাদ্য, পোশাক কিংবা শিক্ষার মতো একান্ত জরুরি প্রয়োজন মেটাতেই কেবল এই অর্থ ব্যবহার করা যেতে পারে। বিলাসিতা কিংবা কোনো অপ্রয়োজনীয় কাজের জন্য এই টাকা ব্যয় করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।
সুদযুক্ত হিসাব থেকে দূরে থাকা
সবচেয়ে বড় কথা হলো, ব্যাংকে সুদভিত্তিক হিসাব বা বিনিয়োগ সজ্ঞানে জিইয়ে রাখা যাবে না। অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো সুদের অর্থ ঢুকে পড়লে তা দ্রুত নিজের মূল হিসাব বা মালিকানা থেকে সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে।
ইসলামে সুদের নিষেধাজ্ঞা ও কঠোরতা
ব্যবসাকে বৈধ ঘোষণা করা হলেও ইসলামে সুদের অবস্থান অত্যন্ত তীব্র ও কঠোর। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে হালাল ও হারামের ব্যবধান স্পষ্ট করে ইরশাদ করেছেন—
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ২৭৫)
এই আয়াতের মাধ্যমে সুদের উৎস চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং মুমিন বান্দাদের হালাল উপার্জনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
সুদ একটি ভয়াবহ আর্থিক অপরাধ ও ধ্বংসাত্মক ব্যাধি, যা মানুষের ইবাদত ও বরকতকে ধ্বংস করে দেয়। ব্যাংক বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার কারণে অজান্তে সুদের অর্থ যুক্ত হয়ে গেলে তা অবিলম্বে বর্জন করতে হবে এবং সওয়াবের প্রত্যাশা না রেখে তা অভাবী ও দরিদ্র আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে নিজের সম্পদ পবিত্র করতে হবে। পরিচ্ছন্ন ও হালাল উপার্জনের মাধ্যমেই কেবল একটি প্রশান্তিময় জীবন ও বরকতময় সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব।

