জুয়া— ইহকাল ও পরকালের ধ্বংসের ফাঁদ
Advertisement
মুহাম্মাদ রুহুল্লাহ শাজুলি
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তিকর ব্যস্ততা কিংবা রাতারাতি আঙুল ফুলে কলা গাছ হওয়ার অলীক স্বপ্ন মানুষকে প্রায়শই এক অন্ধকার ও সর্বনাশা পথের দিকে টেনে নেয়। এই পথের নাম জুয়া। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটি ক্ষণস্থায়ী রোমাঞ্চ বা সাময়িক অর্থনৈতিক লাভের প্রলোভন দেখালেও এর অনিবার্য পরিণতি হলো ব্যক্তিগত নিঃস্বতা, পারিবারিক ধ্বংস এবং সামাজিক অবক্ষয়। ইসলামি শরিয়তে জুয়া কেবল একটি অপরাধই নয়, বরং এটি মানবাত্মা ও সমাজব্যবস্থাকে ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে খাওয়া এক মরণব্যাধি।
জুয়া সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের নিষেধাজ্ঞা ও হুঁশিয়ারি
ইসলাম ধর্মে জুয়াকে অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা মানুষকে এই অপবিত্র কাজ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়ে এর ভয়াবহ পরিণতির কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
মহা পাপ ও ক্ষতিকর প্রভাব: পবিত্র কুরআনে মদ ও জুয়ার সামাজিক ও নৈতিক ক্ষতি তুলে ধরে ইরশাদ হয়েছে—
يَسْـَلُوْنَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِۗ قُلْ فِيْهِمَا اِثْمٌ كَبِيْرٌ وَّمَنَافِعُ لِلنَّاسِࣗ وَاِثْمُهُمَا اَكْبَرُ مِنْ نَّفْعِهِمَاۗ
‘তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলে দিন, এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারিতাও রয়েছে, তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড়।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ২১৯)
শয়তানের অপবিত্র কাজ: জুয়াকে মানুষের ধ্বংসের হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করে আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ الْخَمْرَ وَالْمَيْسِرَ وَالْأَنْصَابَ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
‘হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক তিরসমূহ— এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ ছাড়া অন্য কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও।’ (সুরা মায়িদা: আয়াত ৯০)
হাদিসের আলোকে জুয়ার কঠোর শাস্তি ও নিষেধাজ্ঞা
নবী করীম (সা.) জুয়া এবং এর সামান্য প্ররোচনাকেও তীব্র ভাষায় নিষেধ করেছেন। এমনকি খেলার ছলেও কাউকে জুয়ার প্রস্তাব দেওয়ার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে।
> মজার ছলেও জুয়ার প্রস্তাবের কাফফারা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ قَالَ لِصَاحِبِهِ: تَعَالَ أُقَامِرْكَ، فَلْيَتَصَدَّقْ
‘যে ব্যক্তি তার সঙ্গীকে বলে, 'এসো তোমার সঙ্গে জুয়া খেলি', সে যেন দান-খয়রাত করে।’ (বুখারি ৬৩০১)
> জঘন্য পাপ ও পরকালের কঠিন শাস্তি: রাসুলুল্লাহ (সা.) জুয়া খেলাকে শূকরের গোশত ভক্ষণ করার মতো নিকৃষ্ট কাজের সঙ্গে তুলনা করেছেন (আদাবুল মুফরাদ ১২৮৯)।
জুয়াড়িদের পরকালের চিরস্থায়ী শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করে তিনি আরও এরশাদ করেছেন—
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَاقُّ وَلَا مُدْمِنُ خَمْرٍ وَلَا مُكَذِّبٌ بِقَدَرٍ وَلَا مَانِعُ زَكَاةٍ وَلَا مَدْيُونٌ إِلَّا بِأَدَاءٍ، وَلَا صَاحِبُ كُوْبَةٍ (وفي رواية: وَلَا مُقَامِرٌ
‘মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান, জুয়াড়ি, উপকার করার পর খোঁটাদানকারী এবং সর্বদা মদ্যপায়ী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (নাসাঈ ৫৬৭২; মিশকাতুল মাসাবিহ ৩৬৫৩)
জুয়ার বহুমুখী ক্ষতি ও ধ্বংসাত্মক পরিণতি
ইসলামের সূচনালগ্ন বা জাহেলি যুগে মোরগের লড়াই, কবুতর ওড়ানো, উটের খেলা বা পাশা খেলায় বাজির প্রচলন ছিল (আদাবুল মুফরাদ ১৯৭১-১২৮৮)
আধুনিক যুগে প্রযুক্তির উৎকর্ষে এবং স্মার্টফোনের কল্যাণে জুয়া আরও সহজলভ্য ও বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে। অনেক মানুষ এটিকে নিছক বিনোদন মনে করলেও এর বহুমুখী ক্ষতি গোটা জীবনকে তছনছ করে দেয়। জুয়ার কিছু ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা হলো—
> আর্থিক লোকসান ও অবৈধ সম্পদ ভক্ষণ: জুয়ায় কোনো বৈধ বিনিময় বা শ্রম ছাড়াই অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা হয়, যা পবিত্র কুরআনে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَاۡكُلُوۡۤا اَمۡوَالَكُمۡ بَیۡنَكُمۡ بِالۡبَاطِلِ اِلَّاۤ اَنۡ تَكُوۡنَ تِجَارَۃً عَنۡ تَرَاضٍ مِّنۡكُمۡ
‘হে মুমিনগণ, তোমরা পরস্পরের মধ্যে তোমাদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা।’ (সুরা নিসা: আয়াত ২৯)।
> ইবাদত ও দোয়া কবুল না হওয়া: জুয়ার মাধ্যমে অর্জিত হারাম খাবার ও উপার্জনে গঠিত শরীর নিয়ে আল্লাহর দরবারে কোনো দোয়া বা ইবাদত কবুল হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لاَ يَقْبَلُ إِلاَّ طَيِّبًا
‘আল্লাহ তা’আলা পবিত্র, তিনি পবিত্র ও হালাল বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।’ (মুসলিম ২২৩৬)
> শত্রুতা সৃষ্টি ও আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিলতি: জুয়া মানুষের ভেতর হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা তৈরি করে এবং মহান আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
اِنَّمَا یُرِیۡدُ الشَّیۡطٰنُ اَنۡ یُّوۡقِعَ بَیۡنَكُمُ الۡعَدَاوَۃَ وَ الۡبَغۡضَآءَ فِی الۡخَمۡرِ وَ الۡمَیۡسِرِ وَ یَصُدَّكُمۡ عَنۡ ذِكۡرِ اللّٰهِ وَ عَنِ الصَّلٰوۃِ ۚ فَهَلۡ اَنۡتُمۡ مُّنۡتَهُوۡنَ
‘শয়তান শুধু মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চার করতে চায়। আর (চায়) আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদের বাধা দিতে। অতএব, তোমরা কি বিরত হবে না?’ (সুরা মায়িদা: আয়াত ৯১)
> মানসিক ও পারিবারিক বিপর্যয়: সর্বস্ব হারিয়ে জুয়াড়ি ব্যক্তি তীব্র মানসিক হতাশা ও অস্থিরতায় ভোগে। ফলে পারিবারিক কলহ, সংসার ভাঙন এবং শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক পথ বেছে নেওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটে।
> সামাজিক অপরাধের বিস্তার: জুয়ার নেশা মেটাতে এবং দেনার দায় থেকে বাঁচতে মানুষ চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও দুর্নীতির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।
জুয়া হলো এক অলীক মরীচিকা, যা সাময়িক উত্তেজনার আড়ালে মানুষের ইহকাল ও পরকাল চিরতরে বরবাদ করে দেয়। ব্যক্তিজীবনকে শান্তি ও স্বস্তিতে রাখতে এবং একটি সুস্থ ও অপরাধমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে জুয়ার এই মরণফাঁদ থেকে যুবসমাজ ও সর্বস্তরের মানুষকে দূরে থাকা আবশ্যক। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা এবং নৈতিক মূল্যবোধের চর্চাই পারে মানুষকে এই সর্বনাশা পথ থেকে রক্ষা করতে।
লেখক: ইসলামিক স্কলার, মুফাচ্ছিরে কুরআন ও পীরসাহেব, শাজুলিয়া দরবার শরিফ

