নারী-পুরুষ একে অপরকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিলেই কি বিয়ে সম্পন্ন হয়?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানবজীবনে পবিত্রতা রক্ষা, মানসিক প্রশান্তি অর্জন এবং একটি সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো বৈবাহিক বন্ধন। ইসলাম ধর্ম মানব স্বভাবের চাহিদাকে সম্মান জানিয়ে বিয়ে করার প্রতি যেমন জোর তাগিদ দিয়েছে, তেমনি এর সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম, শর্ত ও শিষ্টাচারও নির্ধারণ করে দিয়েছে। পক্ষান্তরে, বিবাহবহির্ভূত যেকোনো অনৈতিক সম্পর্ক বা গোপন অবস্থাকে ইসলাম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং কবিরা গুনাহ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
ইজাব-কবুল ও সাক্ষীর গ্রহণযোগ্যতা
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে বিয়ে সহিহ হওয়ার জন্য ইজাব-কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) এবং ন্যূনতম দুজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা সাক্ষীর উপস্থিতি আবশ্যক। বিখ্যাত ফকিহ আলাউদ্দিন কাজানি (রহ.) বলেন, ‘বিয়ের মূল ভিত্তি হলো ইজাব ও কবুল।’
ইবনু নুজাইম (রহ.) উল্লেখ করেন যে, শুধু মুখে মুখে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে স্বীকারোক্তি দেওয়ার মাধ্যমে নতুন কোনো বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় না। সাক্ষীদের সামনে কেউ যদি বলে, ‘সে আমার স্ত্রী এবং আমি তার স্বামী, আর নারীও যদি অনুরূপ বলে, তবুও ইজাব-কবুলের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ছাড়া তাদের মধ্যে বিবাহ সংঘটিত হবে না।’ কারণ, স্বীকারোক্তি হলো আগের বিষয় প্রকাশ করা, যার মাধ্যমে নতুন কোনো সম্পর্ক সৃষ্টি হয় না।
বিয়ের গুরুত্ব ও ফজিলত
ইসলাম যুবসমাজকে বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করতে এবং নৈতিক চরিত্র পবিত্র রাখতে বিয়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
দৃষ্টি সংযত ও লজ্জাস্থান হেফাজতের মাধ্যম
নবী করিম (সা.) যুবকদের উদ্দেশে ইরশাদ করেছেন—
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ، مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوجْ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ، وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ
‘হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে নেয়, কেননা তা চক্ষুকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান রক্ষা করে।’ (বুখারি ৫০৬৬)
দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণতা
বিয়ের অপরিসীম মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন—
إِذَا تَزَوَجَ الْعَبْدُ فَقَدْ اسْتَكْمَلَ نِصْفَ الدِّينِ، فَلْيَتَّقِ اللَّهَ فِي النِّصْفِ الْبَاقِي
‘যখন বান্দা বিয়ে করে, তখন সে তার দ্বীনের অর্ধেক পূরণ করে। অতএব, বাকি অর্ধেকাংশে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।’ (বায়হাকি ৫৪৮৬, তাবরানি ৯৭২)
বিয়ের সঠিক পদ্ধতি, অভিভাবক ও ঘোষণা
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে বিয়ে কেবল একটি চুক্তি নয়, বরং এটি একটি পবিত্র ইবাদত। তাই এটি সম্পন্ন করার কিছু সুনির্দিষ্ট মূলনীতি রয়েছে। তাহলো—
অভিভাবকের উপস্থিতি ও ঘোষণা
বিয়ের ক্ষেত্রে অভিভাবকের অভিমত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) বলেছেন—
لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ
‘অভিভাবক ছাড়া বিয়ে সংঘটিত হয় না।’ (তিরমিজি ১১০১)
এছাড়াও সমাজ ও পরিবারকে জানিয়ে প্রকাশ্যভাবে বিয়ে সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে— ‘বিয়ে করবে ঘোষণা দিয়ে।’ (মুসনাদে আহমাদ ৪/৫) কারণ, গোপন বা ষড়যন্ত্রমূলক বিয়ে সমাজ কখনোই ভালোভাবে গ্রহণ করে না এবং এতে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হয়।
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের পরিণতি ও ইসলামি নিষেধাজ্ঞা
বিয়ের মতো পবিত্র সম্পর্কের বিপরীতে নারী-পুরুষের অবৈধ মেলামেশা বা গোপন সম্পর্ক ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা জিনা বা অবৈধ সম্পর্কের নিকটবর্তী হতে নিষেধ করে ইরশাদ করেছেন—
وَ لَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّهٗ كَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَ سَآءَ سَبِیۡلًا
‘তোমরা জিনার কাছেও যেও না। নিশ্চয় তা অশ্লীলতা এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ৩২)
অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জিনা
অবৈধ সম্পর্কের দিকে ধাবিত করার মাধ্যমগুলো সম্পর্কে সতর্ক করে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
زِنَا الْعَيْنَيْنِ النَّظَرُ، وَزِنَا الْأُذُنَيْنِ الِاستِمَاعُ، وَزِنَا اللِّسَانِ الْكَلَامُ، وَزِنَا الْيَدِ الْبَطْشُ، وَزِنَا الرِّجْلِ الْخُطَا، وَالْقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى، وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ أو يُكَذِّبُهُ
‘দুই চোখের জিনা হলো (কামনার সঙ্গে) তাকানো, দুই কানের জিনা হলো (অবৈধ কথা) শোনা, জিহ্বার জিনা হলো কথা বলা, হাতের জিনা হলো স্পর্শ করা, পায়ের জিনা হলো সেদিকে হেঁটে যাওয়া। আর অন্তর কামনা করে ও আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে, আর লজ্জাস্থান সেটিকে বাস্তবায়িত করে অথবা করে না।’ (বুখারি ৬২৪৩)
তৃতীয় শক্তি হিসেবে শয়তানের উপস্থিতি
গায়েরে মাহরাম নারী-পুরুষের নির্জন অবস্থান সম্পর্কে রাসুল (সা.) হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন—
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ
‘কোনো পুরুষ যখন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে একত্রিত হয়, তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।’ (তিরমিজি ২১৬৫)
বিয়ে হলো মানবজীবনকে পবিত্র ও সুরক্ষিত রাখার এক ঐশ্বরিক বিধান। শরিয়তের সঠিক নিয়ম মেনে ইজাব-কবুল ও ঘোষণার মাধ্যমে বৈধ পন্থায় জীবনসঙ্গী নির্বাচন করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব। অপরদিকে, সব ধরনের বিবাহবহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্ক, অবৈধ দৃষ্টিপাত কিংবা নির্জনবাস থেকে দূরে থেকে নিজেদের চরিত্র হেফাজত করা অপরিহার্য, যাতে ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

