অ্যাম্বুলেন্সে লাশ রেখে জানাজা পড়ার বিধান কী?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কোনো মুসলিম ভাই বা বোন ইন্তেকাল করলে তার জানাজার নামাজ আদায় করা সমাজের জীবিত মুমিনদের ওপর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব, যা ইসলামে ‘ফরজে কিফায়া’ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। সমাজের কিছু মানুষ এই দায়িত্ব পালন করলে বাকিরা দায়মুক্ত হয়, তবে জানাজায় অংশ নেওয়া এবং শোকার্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার মাঝে রয়েছে অফুরন্ত কল্যাণ ও সওয়াব। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণের ফজিলত বর্ণনা করে এর পরকালীন গুরুত্ব জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন।
অ্যাম্বুলেন্সে লাশ রেখে জানাজা পড়ার বিধান
সাধারণ অবস্থায় মৃতদেহ মাটিতে বা খাটিয়ায় রেখে জানাজা পড়তে হয়। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে এর বিধান কী হতে পারে, তা ফিকাহশাস্ত্রের আলোকে নিচে ব্যাখ্যা করা হলো—
জমিনে রাখা আবশ্যকতার মূল নিয়ম
লাশ জমিনে রেখে জানাজা পড়ার সুযোগ থাকলে জমিনে রেখেই জানাজা পড়তে হবে। জমিনে রাখার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অ্যাম্বুলেন্স, গাড়ি, ট্রাক কিংবা অন্য কোনো যানবাহনে লাশ রেখে জানাজার নামাজ পড়লে জানাজা আদায় হবে না। বরং লাশের খাটিয়া বা তক্তা মাটিতে রেখে তার সামনে দাঁড়িয়ে জানাজার নামাজ আদায় করা জরুরি।
শরয়ি অপারগতার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়
তবে কোনো শরয়ি অপারগতার কারণে লাশ মাটিতে রাখা যদি একেবারেই সম্ভব না হয়। যেমন— জমিনে তীব্র পানি থাকা, লাশ গলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়া, অথবা ফ্রিজ থেকে বের করার পর রোদে রাখলে লাশ নষ্ট বা বিকৃত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকা— এ ধরনের অনিবার্য অপারগতার ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্স বা গাড়িতে লাশ রেখে জানাজা পড়লে তা আদায় হয়ে যাবে। (রদ্দুল মুহতার)
জানাজার ফজিলত ও গুরুত্ব
জানাজার নামাজ কেবল মৃত ব্যক্তির মাগফিরাতের মাধ্যমই নয়, বরং অংশগ্রহণকারী জীবিত ব্যক্তির জন্যও এটি মহা পুরস্কারের এক সোনালী সুযোগ।
পাহাড়সম সওয়াবের প্রাপ্তি
নবী করীম (সা.) জানাজা ও দাফনের সাওয়াবের পরিমাণ বুঝাতে গিয়ে এক হাদিসে ইরশাদ করেছেন—
مَنْ شَهِدَ الجِنَازَةَ حَتَّى يُصَلِّيَهَا فَلَهُ قِيرَاطٌ، وَمَنْ شَهِدَ حَتَّى تُدْفَنَ فَلَهُ قِيرَاطَانِ. قِيلَ: وَمَا القِيرَاطَانِ؟ قَالَ: مِثْلُ الجَبَلَيْنِ العَظِيمَيْنِ
‘যে ব্যক্তি কোনো মৃত ব্যক্তির জানাজার নামাজ আদায় করে, সে এক ‘কিরাত’ পরিমাণ নেকি লাভ করে আর যে ব্যক্তি কোনো মৃত ব্যক্তির জানাজার নামাজ আদায় করে এবং তার দাফনের কাজে অংশগ্রহণ করে, সে দুই ‘কিরাত’ পরিমাণ সওয়াব লাভ করে।’ কোনো এক সাহাবি প্রশ্ন করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! দুই কিরাত কী?’ নবী করিম (সা.) বললেন, ‘দুই কিরাতের ক্ষুদ্রতম পরিমাণ হলে দুই ওহুদ পাহাড়ের সমান।’ (বুখারি ১৩২৫, মুসলিম ৯৪৫, ইবনে কাছির)
জানাজার নামাজ আদায়ের নিয়ম ও পদ্ধতি
জানাজার নামাজ সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম ও রুকনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সঠিকভাবে তা আদায় করার পদ্ধতিটি নিচে তুলে ধরা হলো—
- মৃতের অবস্থান ও ইমামের দাঁড়ানোর স্থান: জানাজার নামাজ আদায়ের আগে মৃতকে কিবলার দিকে জমিনে রাখতে হবে। ইমাম মৃত ব্যক্তির বক্ষ বরাবর দাঁড়াবেন।
- নিয়ত ও তাকবির: এরপর জানাজার নিয়ত করতে হবে। নিয়ত মনে মনে করলেই যথেষ্ট, মুখে আলাদা করে উচ্চারণ করা জরুরি নয়; তবে কেউ করলে তা নাজায়েজ নয়। তাকবির বলে উভয় হাত কান পর্যন্ত ওঠাতে হয়, এরপর নাভির নিচে হাত বেঁধে ‘সানা’ পড়তে হয়।
- দরুদ ও দোয়া: পরবর্তী তাকবিরে দরুদে ইবরাহিম পড়তে হয়। এরপর তৃতীয় তাকবির বলে মৃত ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট দোয়া পড়তে হয়। পরিশেষে চতুর্থ তাকবির বলে ডানে ও বাঁয়ে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করতে হয়।
জানাজার নামাজ মৃতের প্রতি জীবিতদের শেষ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ এবং আল্লাহর দরবারে তার ক্ষমার প্রার্থনা। তাই শরিয়তের নিয়ম যথাযথভাবে মেনে এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ অবস্থায় লাশ মাটিতে রেখেই জানাজা পড়তে হবে, তবে অনিবার্য কোনো ওজর বা বাধ্যবাধকতা থাকলে শরিয়তের দেওয়া ছাড় অনুযায়ী অ্যাম্বুলেন্সে রেখেই তা আদায় করার অবকাশ রয়েছে।

