বাদামি নাকি সাদা—কোন ডিম বেশি পুষ্টিকর?
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সুপারমার্কেট কিংবা স্থানীয় বাজারে ডিম কিনতে গিয়ে অনেকেই দ্বিধায় পড়েন—সাদা ডিম নাকি বাদামি ডিম, কোনটি বেশি পুষ্টিকর? সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত ধারণা, বাদামি ডিম তুলনামূলক বেশি পুষ্টিকর, প্রাকৃতিক এবং সুস্বাদু। আবার কেউ কেউ মনে করেন, সাদা ডিম বেশি পরিচ্ছন্ন ও স্বাদে ভালো।
তবে পুষ্টিবিদ ও বিজ্ঞানীদের মতে, ডিমের খোসার রং দেখে এর পুষ্টিগুণ বিচার করার ধারণাটি সঠিক নয়। মূলত মুরগির জাত ও বংশগত বৈশিষ্ট্যের কারণেই ডিমের খোসার রঙে পার্থক্য দেখা যায়।
ডিমের খোসার রং নির্ধারিত হয় যেভাবে
ডিমের খোসার রং মূলত মুরগির জাত বা বংশগত বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে। হোয়াইট লেগহর্ন, হোয়াইট রক ও কর্নিশ জাতের মুরগি সাধারণত সাদা ডিম পাড়ে। অন্যদিকে প্লাইমাউথ রক, নিউ হ্যাম্পশায়ার ও রোড আইল্যান্ড রেড জাতের মুরগি থেকে সাধারণত বাদামি ডিম পাওয়া যায়।
এ ছাড়া দক্ষিণ আমেরিকার অ্যারোকানা, আমেরিকানা, ডংক্সিয়াং ও লুসি জাতের মুরগি নীল বা নীলচে-সবুজ রঙের ডিম পাড়তে পারে।
মুরগির শরীরে উৎপন্ন বিভিন্ন প্রাকৃতিক রঞ্জক পদার্থের কারণেই ডিমের খোসায় এই রঙের পার্থক্য দেখা যায়। বাদামি ডিমের প্রধান রঞ্জক হলো প্রোটোপোরফাইরিন নাইন, যা রক্তের লাল উপাদানের হিম থেকে তৈরি হয়। অন্যদিকে নীল ডিমের ক্ষেত্রে প্রধান রঞ্জক হলো বিলিভার্ডিন।
গবেষণায় দেখা গেছে, একই জাতের মুরগির ডিমের রংও বয়স, রোগ, পরিবেশ এবং ভয় বা চাপের মতো বিভিন্ন কারণে কিছুটা হালকা বা গাঢ় হতে পারে।
ডিমের রং কি পুষ্টিগুণে প্রভাব ফেলে?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ডিমের খোসা সাদা, বাদামি কিংবা অন্য কোনো রঙের হলেও এর মৌলিক পুষ্টিগুণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। বিভিন্ন গবেষণাতেও দেখা গেছে, খোসার রং ডিমের গুণগত মান নির্ধারণ করে না।
আকারভেদে ডিমে ক্যালরি ও প্রোটিনের পরিমাণ অবশ্য ভিন্ন হতে পারে। একটি মাঝারি আকারের ডিমে প্রায় ৬০ ক্যালরি ও ৬ গ্রাম প্রোটিন থাকে। অন্যদিকে জাম্বো আকারের একটি ডিমে প্রায় ৯০ ক্যালরি ও ৮ গ্রাম প্রোটিন থাকতে পারে।
এ ছাড়া নীল ডিমে কোলেস্টেরল তুলনামূলক কম—এমন দাবি থাকলেও এর পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ডিমের স্বাদের ক্ষেত্রেও খোসার রং বড় কোনো ভূমিকা রাখে না। বরং ডিম কতটা সতেজ, মুরগিকে কী ধরনের খাবার দেওয়া হয়েছে এবং কীভাবে রান্না করা হচ্ছে—এসব বিষয়ের ওপর স্বাদ বেশি নির্ভর করে।
ডিমের পুষ্টিগুণ আসলে কিসের ওপর নির্ভর করে?
ডিমের পুষ্টিমান অনেকাংশে নির্ভর করে মুরগির খাদ্য ও পালন-পদ্ধতির ওপর। গবেষণায় দেখা গেছে, উন্মুক্ত পরিবেশে সূর্যালোক ও খোলা বাতাসে চলাফেরা করা মুরগির ডিমে খাঁচায় পালন করা মুরগির ডিমের তুলনায় বেশি ভিটামিন ডি থাকতে পারে।
আবার মুরগির খাবারে ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ উপাদান, যেমন তিসিবীজ বা বিশেষ ধরনের খাদ্য যোগ করা হলে ডিমে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণও বাড়তে পারে। একইভাবে ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার দিলে ডিমের নির্দিষ্ট কিছু ভিটামিনের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব।
তাই শুধু খোসার রং নয়, মুরগিকে কী খাবার দেওয়া হচ্ছে এবং কী পরিবেশে পালন করা হচ্ছে—ডিমের পুষ্টিমান বিবেচনায় এসব বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাদামি ডিমের দাম তুলনামূলক বেশি কেন?
বাদামি ডিমের দাম বেশি হওয়ার পেছনে ঐতিহাসিক কিছু কারণ রয়েছে। অতীতে বাদামি ডিম পাড়া মুরগিগুলো তুলনামূলক বড় আকারের হওয়ায় বেশি খাবার খেত এবং অনেক ক্ষেত্রে কম ডিম দিত। ফলে এসব মুরগি পালন ও ডিম উৎপাদনে খরচ বেশি পড়ত।
বর্তমানে উৎপাদনব্যবস্থা অনেক বদলেছে। তবু বাদামি ডিমকে বেশি পুষ্টিকর মনে করার প্রচলিত ধারণা এবং অরগানিক বা ফ্রি-রেঞ্জ ডিমের বড় একটি অংশ বাদামি হওয়ায় বাজারে এ ধরনের ডিমের দাম তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
ডিম কেনার সময় যেসব বিষয় দেখবেন
ডিমের খোসার রং মূলত বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য। তাই বাদামি না সাদা—শুধু এই বিষয়টি বিবেচনা করে ডিম কেনার প্রয়োজন নেই। ডিম কেনার সময় বরং নিচের বিষয়গুলোতে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ—
সতেজতা ও সংরক্ষণ: পরিষ্কার, অক্ষত খোসার এবং সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষিত ডিম বেছে নিন।
মুরগির খাদ্য: ডিমের পুষ্টিমান বাড়াতে মুরগিকে কী ধরনের খাবার দেওয়া হয়েছে, তা গুরুত্বপূর্ণ।
অরগানিক ও ফ্রি-রেঞ্জ: অরগানিক বা উন্মুক্ত পরিবেশে পালন করা মুরগির ডিম বেছে নিতে চাইলে প্যাকেটের তথ্য ও উৎপাদনকারীর দাবি যাচাই করুন।
মেয়াদ ও মান: প্যাকেটজাত ডিমের ক্ষেত্রে মেয়াদ, সংরক্ষণবিধি এবং মান নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত তথ্য দেখে কিনুন।
সবশেষে বলা যায়, বাদামি ডিম মানেই বেশি পুষ্টিকর আর সাদা ডিম মানেই কম পুষ্টিকর—এ ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ডিমের পুষ্টিগুণ মূলত মুরগির খাদ্য, পালন-পদ্ধতি, ডিমের সতেজতা ও সংরক্ষণের ওপর বেশি নির্ভর করে। তাই খোসার রং নয়, ডিমের মান ও সতেজতাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
