পুলিশের ভেতরে চক্র নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য
Advertisement
সিরাজুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৯ পিএম
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গত কয়েক মাসে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের গোপন বৈঠক, ঝটিকা মিছিল ও মিছিল থেকে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গত জুলাই ও চলতি সেপ্টেম্বরে ভারতে অবস্থানরত দলটির সভানেত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন, ডিসেম্বরে তিনি দেশে ফিরবেন। তার এই ঘোষণার পরপরই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির কর্মী-সমর্থকরা নানা ধরনের প্রচারণা শুরু করেন।
এদিকে সরকারের অব্যাহত চেষ্টার পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় পুলিশবাহিনীকে নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। পুলিশ সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে কি না এমন প্রশ্ন ওঠে। পাশাপাশি পলাতক পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেশের কিছু পুলিশের যোগাযোগ আছে কি না, এ নিয়েও কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করেন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুল হাসানের একটি অডিও রেকর্ড ভাইরাল হলে পুলিশের একাংশের মনোভাবের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। রাকিব বলেন, ‘জানি যে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসতেছে। কিচ্ছু হবে না আসলে, কিচ্ছু হবে না। আপনারা তো চিন্তা করতে পারছেন, রাস্তার পুলিশ কত দুর্বল, ভয়ানক দুর্বল।’ তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বর দেরি হয়ে গেছে। এই মাসে আসা উচিত ছিল। চলে আসলে এই পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না। সিনিয়র অফিসার সব বিএনপি করতেছে। আমরা তো বিএনপি করতেছি না। এই করার জন্য তো আমরা ডিপার্টমেন্টে আসি নাই।’
সূত্র জানায়, রাকিবের এই বক্তব্যের পরপরই সরকারের শীর্ষ মহলের টনক নড়ে এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকা পুলিশের ‘গুপ্ত’ সদস্যদের তৎপরতা খতিয়ে দেখা শুরু হয়। নীতিনির্ধারক মহলে অনেক আলোচনা-পর্যালোচনার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পুলিশবাহিনীর বিষয়ে সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর রাকিবকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। এদিকে ক্ষমতায় আসার পর গত সাত মাসে কোনো রাজনৈতিক দলের অফিসে অভিযান বা কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। তবে শনিবার গুলিস্তানে জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ সন্দেহে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে।
ক্ষমতায় আসার শুরুতে কিছুটা উদারতা দেখানো হলেও পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়ে সরকারকে হার্ডলাইনে যেতে হচ্ছে। বিশেষ করে গণ-অভ্যুত্থানে পরাজিত আওয়ামী লীগের হুমকি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং পুলিশের শৃঙ্খলার প্রশ্নে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। জানা যায়, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর পালিয়ে যাওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেশে কর্মরত কিছু পুলিশের গোপন যোগাযোগের বিষয়টি আলোচনায় আসায় সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।
এদিকে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, কোনো পুলিশ সদস্য যদি ফ্যাসিবাদ চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে বা শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে, তাহলে তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভার্চুয়াল জগতে অপপ্রচার ঠেকাতে বিশেষ আইন প্রয়োগ এবং নতুন ‘সাইবার ইউনিট’ গঠনের প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি ঘাপটি মারা পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করতে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে একটি বিশেষ সেল কাজ করছে। নাশকতার ছক ভাঙতে ডিএমপি, ডিবি, সিটিটিসি এবং বিশেষায়িত ব্যাটালিয়নগুলোর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান ও চেকপোস্ট কার্যক্রম বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে কড়া বার্তাও দেওয়া হয়েছে পুলিশের উদ্দেশে।
সূত্র জানায়, সরকার জানতে পেরেছে, গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে বসে থাকা সুবিধাবাদী কর্মকর্তা ও ‘গুপ্তরা’ নতুন করে তৎপর হয়ে উঠছেন। কর্মরত পুলিশের মিড লেভেল ও কিছু স্পর্শকাতর থানায় পুরোনো নেটওয়ার্কের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এরই একটি বড় উদাহরণ হলো ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি রাকিবুল হাসানের অডিও রেকর্ড। অতি স্পর্শকাতর একটি থানা এলাকায় পুরোনো ব্যবস্থার প্রতি অনুগত মনোভাব বজায় রেখে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন ওসি ও তার ঘনিষ্ঠজনরা।
জানা যায়, কঠোর নিরাপত্তা বলয় এবং পুলিশি চেকপোস্টের ভেতরেও রাজধানীর গুলশান, উত্তরা, পল্টন, ধানমন্ডিসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ দলের ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার তদন্তে দেখা যায়, মাঠপর্যায়ের কিছু পুলিশ সদস্য তথ্য গোপন করেছেন। পুলিশের ভেতরে থাকা ওই ‘গুপ্ত’ সিন্ডিকেট যোগাযোগ রাখছেন নিষিদ্ধ দলের সদস্যদের সঙ্গে। তাদের যোগাযোগ বাড়ছে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পালিয়ে যাওয়া পুলিশের সাবেক শীর্ষ ও মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের সঙ্গেও।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রাজপথের কৌশলের পাশাপাশি ভার্চুয়াল জগতেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো, এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া অডিও-ভিডিও তৈরি করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট করার পাঁয়তারা চলছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সরকার একটি বিশেষ ও স্বতন্ত্র ‘সাইবার ইউনিট’ গঠন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই ইউনিটের মূল কাজ হবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দেশবিরোধী অপপ্রচার এবং গুজব তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত ও প্রতিহত করা। সাইবার অপরাধীদের আইপি অ্যাড্রেস ও মূল উৎস চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেফতার করবে এই ইউনিট। এছাড়া ডিজিটাল সিকিউরিটি সংক্রান্ত আইনি কাঠামো ব্যবহার করে ত্বরিত বিচার নিশ্চিত করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, নতুন সাইবার ইউনিটকে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করা হবে। কারণ, রাজপথের চেয়ে এখন সাইবার স্পেসে বেশি বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। এ ধরনের অপতৎপরতা রুখতে বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন জনবল নিয়োগ ও ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরির জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ‘ফ্যাসিবাদ’ সরকারের সময় অবৈধভাবে গড়ে তোলা সম্পদ থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকার এই অর্থায়নের নেটওয়ার্ক ধ্বংসে কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত পলাতক নেতা ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি বাড়াতে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের ঝটিকা মিছিল এবং গোপন তৎপরতার পেছনে পুলিশের ভেতরে ঘাপটি মারা কিছু সদস্যের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগসাজশের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে। কূটনৈতিক জোন গুলশান বা সংবেদনশীল এলাকায় কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও কীভাবে এসব মিছিল হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশের ভেতরে ঘাপটি মারা চক্র মাঠপর্যায়ের শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং অপরাধ দমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
আরও উঠে এসেছে, ঝটিকা মিছিল বা নাশকতার ঘটনা মাঝেমধ্যে ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রেই আগাম বার্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে পুলিশ। ঘাপটি মারা চক্রটি ইচ্ছাকৃতভাবে গোয়েন্দা নেটওয়ার্কে ব্লক বা অন্ধত্ব তৈরি করছে। উলটো অপরাধীদের আগাম তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে চক্রটি। শুধু তাই নয়; নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে এবং বাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভাঙতে নানা ধরনের অপতথ্য ছড়াচ্ছে। এ কারণে সৎ ও পেশাদার কর্মকর্তারাও এক ধরনের মানসিক অস্বস্তি ও আস্থার সংকটে পড়ছেন। আর এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মাঠপর্যায়ের পুলিশিং কার্যক্রমে।
জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক আইজি আব্দুল কাইয়ুম যুগান্তরকে বলেন, পুলিশবাহিনীতে ঘাপটি মেরে থাকা ‘গুপ্ত’ সিন্ডিকেটের তৎপরতা স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে একটি চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির অডিও-কাণ্ড এবং বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিলের পেছনে পুলিশের অসাধু সদস্যদের যোগসাজশের অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, যখন মাঠপর্যায়ের কোনো পুলিশ সদস্য অপরাধীদের আগাম তথ্য দিয়ে সহায়তা করে, তখন তা কেবল পেশাদারির লঙ্ঘন নয়, এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি। তবে সরকারের বর্তমান হার্ডলাইন নীতি, বিশেষ করে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত এবং স্বতন্ত্র ‘সাইবার ইউনিট’ গঠনের উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুষ্টচক্রের পেছনে থাকা অবৈধ অর্থায়নের নেটওয়ার্ক এবং পলাতক মাস্টারমাইন্ডদের আন্তর্জাতিক সহায়তায় আইনের আওতায় আনতে হবে।
