সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক
নিয়োগে অনিশ্চয়তা শাহবাগে বিক্ষোভ
চূড়ান্ত সুপারিশের পরও আড়াই হাজার প্রার্থী নিয়ে জটিলতা * সুপারিশপ্রাপ্ত প্রত্যেককে নিয়োগ দিতে হবে : বঞ্চিত প্রার্থী * নিয়োগের সঙ্গে শুধু প্রার্থী নয়, পরিবারের ভবিষ্যতও জড়িত : অধ্যাপক মনজুর * অনেকের ঠিকানা সঠিক না থাকায় নিয়োগপত্র পৌঁছাতে পারেনি : শিক্ষামন্ত্রী
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সহকারী প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগপত্রের দাবিতে রোববার রাজধানীর শাহবাগে বঞ্চিতদের অবস্থান -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশের পরও নিয়োগপত্র না পাওয়ায় অনিশ্চয়তায় পড়েছেন আড়াই হাজারের মতো প্রার্থী। মেধা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও যৌক্তিক কারণ ছাড়া তাদের বাদ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলে বঞ্চিত প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন। এর প্রতিবাদে তারা রোববার শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। বেলা ১১টা থেকে শুরু হওয়া কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা দুই শতাধিক প্রার্থী অংশ নেন। এর আগে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হয়ে মিছিল নিয়ে শাহবাগে যান। সেখানে তারা রাত ৮টা পর্যন্ত অবস্থান করেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আজও তারা এ কর্মসূচি পালন করবেন। এমন পরিস্থিতিতে কোনো কোনো জেলায় বঞ্চিতদের নিয়োগপত্র দেওয়া হচ্ছে বলেও জানা গেছে।
এদিকে আন্দোলনকারীদের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রোববার প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলেও তাদের দেখা হয়নি। পরে তারা শাহবাগে ফিরে এসে আন্দোলনে যোগ দেন। প্রতিনিধিদলের অন্যতম সদস্য আমানুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, সুপারিশপ্রাপ্ত প্রত্যেককে নিয়োগ দিতে হবে। কাউকে বাদ দেওয়া যাবে না। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা কর্মসূচি চালিয়ে যাব।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল নিয়োগে বৈষম্যের অবসান। চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের নিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত করা কোনোভাবেই উচিত নয়। প্রশাসনিক বা তথ্যগত ভুল থাকলে সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে। আর নিয়োগ না দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ থাকলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট করতে হবে। কারণ এর সঙ্গে শুধু প্রার্থী নয়, তার পরিবারের ভবিষ্যৎও জড়িত। তিনি বলেন, কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধের প্রমাণ থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ বা পারিবারিক সম্পৃক্ততার কারণে কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে সরকারি চাকরি থেকে বাদ দেওয়া ন্যায়সঙ্গত নয়।
সরেজমিন দেখা গেছে, আন্দোলনে যোগ দিতে ভোলা থেকে ঢাকায় এসেছেন মিতু রানী দাস। তার কোলে রয়েছে দেড় বছরের সন্তান। তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পেলেও নিয়োগপত্র এখনো হাতে পাননি। সন্তানকে সঙ্গে নিয়েই তিনি শাহবাগের অবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দেন। মিতুর মতো দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শত শত সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী নিয়োগপত্রের দাবিতে শাহবাগে অবস্থান নেন।
জানা যায়, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের এই প্রক্রিয়ায় মোট ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীকে চূড়ান্তভাবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। প্রার্থীদের অভিযোগ-ভেরিফিকেশন বা প্রশাসনিক যাচাই-বাছাইয়ের পর আড়াই হাজারের বেশি প্রার্থী নিয়োগপত্র থেকে বাদ পড়েছেন। তাদের প্রশ্ন, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও কেন তারা নিয়োগপত্র পাচ্ছেন না। বিশেষ করে কোনো প্রার্থীর নিজের বিরুদ্ধে অপরাধ বা অযোগ্যতার প্রমাণ না থাকলে রাজনৈতিক বা পারিবারিক পরিচয়ের ভিত্তিতে তাকে নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে কি না, এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কাউকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়নি। এ প্রসঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন যুগান্তরকে বলেন, আমরা এখনো কাউকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেইনি। অনেকের ঠিকানা সঠিক না থাকায় নিয়োগপত্র পৌঁছাতে পারেনি। তবে আগামী ১ অক্টোবরের পর কতজন নিয়োগপত্র পাননি, আমরা দেখব। তাদের নিয়ে ফের কাজ শুরু করব। আন্দোলনকারীদের অভিযোগের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কাউকে নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করছি-এর প্রমাণ তাদের কাছে নেই। আমরা কেন নিয়োগপত্র পৌঁছায়নি, তা যাচাই-বাছাই করছি।
প্রার্থীদের দেওয়া বিস্তারিত জেলাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৬১ জেলায় মোট দুই হাজার ৪৬১ জনের নিয়োগপত্র না পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিয়োগ বঞ্চিত হয়েছেন সুনামগঞ্জে ১৩০ জন। এরপর কুমিল্লায় ১০২, বরিশালে ৯২, দিনাজপুরে ৮৭, মৌলভীবাজারে ৮৫ এবং ভোলায় ৮৪ জন রয়েছেন। এ ছাড়া খুলনায় ৭৬, চট্টগ্রামে ৭৫, পঞ্চগড়ে ৭৪, নওগাঁয় ৬৯, পাবনায় ৪৫, ঝিনাইদহে ৪৮, রাজবাড়ীতে ৪০, কিশোরগঞ্জে ৩৭, ময়মনসিংহে ৩৬, মাগুরায় ৩৫, নাটোরে ৩৪ এবং ফেনীতে ৩২ জন বাদ পড়েছেন বলে প্রার্থীদের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে-ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া প্রত্যেক প্রার্থীর নথি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনরায় যাচাই, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া, প্রশাসনিক আপিলের ব্যবস্থা, প্রশাসনিক ভুল ও অসঙ্গতি সংশোধন এবং চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের বিষয়ে দ্রুত ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া। এ ছাড়া কী কারণে এত সংখ্যক চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী নিয়োগপত্র থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাও প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রার্থীরা বলছেন, তারা কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আন্দোলনে নামেননি। মেধা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পাওয়ার পর তাদের একমাত্র দাবি নিয়োগপত্র পাওয়া। এ দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
নিয়োগ বঞ্চিতদের অবস্থান কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান। এছাড়া মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিতের দাবিতে রোববার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও জাতীয় ছাত্রশক্তি।
যশোরে নিয়োগ পেলেন ৯২ জন : যশোর ব্যুরো জানায়, প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েও বাদ পড়া যশোরের ৯২ জনকে অবশেষে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। রোববার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জিএম আলমগীর কবীর পৃথক চিঠিতে তাদের নিয়োগপত্র ইস্যু করেছেন। শনিবার যশোর জেলার চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত ১০৬ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি দাবি করে প্রার্থীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অবস্থান নেন। এক দিন পরই তাদের মধ্যে ৯২ জনের নামে নিয়োগপত্র ইস্যু করা হলো।
