রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি
ঐতিহ্য হারিয়ে ধুঁকছে পাঠকখরায়
Advertisement
মাহবুব রহমান, রংপুর ব্যুরো
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
দেড়শ বছরের অধিক সময়ের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে রংপুরের ‘রঙ্গপুর পাবলিক লাইব্রেরি’। অবহেলা আর সংস্কারের অভাবে লাইব্রেরিটি ঐতিহ্য হারাতে বসেছে -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বইপাগল মানুষের ভিড়ে আগে মুখর থাকত সবসময়। প্রচুর মূল্যবান বই ছিল। চলত সাহিত্য পাঠ, সাংস্কৃতিক চর্চা ও গবেষণামূলক লেখালেখি। কালক্রমে সেই জ্ঞানের আধারে নেমে এসেছে অন্ধকার। বলছি রংপুর পাবলিক লাইব্রেরির কথা। দেড় শতাধিক বছরের পুরোনো এই গ্রন্থগৃহ এখন অনেকটাই অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। অনেক মূল্যবান বই চুরি হয়ে গেছে। অবহেলা আর সংস্কারের অভাবে সবকিছু নষ্ট হচ্ছে। ভবনের ছাদসহ দেওয়ালের বিভিন্ন অংশের পলেস্তারা খসে পড়ছে। নানা সংকটে ঐতিহ্য হারিয়ে গ্রন্থালয়টি এখন পাঠকখরায় ধুঁকছে।
রংপুরে ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতির অনুসন্ধান করতে গেলে ঘুরেফিরে আসে পাবলিক লাইব্রেরির নাম। এর প্রাচীন স্থাপত্যরীতি আলাদা মনোযোগ দাবি করে।
১৯৩২ সালে কয়েকজন জমিদারের উদ্যোগে এ পাঠাগারের জন্ম। প্রথমে এর নাম ছিল ‘রংপুর বুক ক্লাব’। উনিশ শতকের শেষদিকে ব্রিটিশ সরকার পৌরসভার পাশে জমি দান করে এবং ওই জমির পাশে আইনজীবী শ্রী অতুল গুপ্তের বাবা শ্রী উমেশ চন্দ্র গুপ্ত কিছু জমি দান করেন। চাঁদা সংগ্রহের মাধ্যমে ১৯০১ সালে খড়ের একটি দোচালা নির্মিত হয়। নামকরণ করা হয় ‘রঙ্গপুর পাবলিক লাইব্রেরি’। ১৯০৩ সালে অগ্নিকাণ্ডে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর এর ভবন নির্মাণের জন্য ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জের অভিষেক অনুষ্ঠানের তহবিল থেকে ১৫ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়। ১৯০৮ সালে গ্রিক স্থাপত্যে নির্মিত হয় রঙ্গপুর পাবলিক লাইব্রেরি ভবন। এটি অবিভক্ত ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম পাবলিক লাইব্রেরি ছিল। এ পাঠাগার ঘিরে ওই অঞ্চলে সাহিত্য পাঠ, সাংস্কৃতিক চর্চা, লেখালেখিসহ নানা গবেষণামূলক কাজ চলে আসছিল। বইপাগল মানুষের ভিড়ে মুখর থাকত এর প্রাঙ্গণ। প্রচুর মূল্যবান বই ছিল। এখন সে বইগুলো নেই। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে অনেক বই লুট হয়ে যাওয়ার পরও বইয়ের সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার।
রংপুরে একটি জাদুঘর স্থাপনের জন্য লাইব্রেরির মূল অংশ এরশাদ সরকার আমলে প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগকে দেওয়া হয়। এর পরে ২০০৯ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক এর একটি অংশ চাইনিজ রেস্টুরেন্ট হিসাবে ভাড়া দিয়েছিলেন। সে সময়ে এর বই পাঠের কক্ষগুলো রেস্টুরেন্টের আদলে পরিবর্তন করা হয়েছিল। এর ফলে এই পাবলিক লাইব্রেরি ঘিরে রংপুরে যে পাঠক সমাজ গড়ে ওঠেছিল ও সাহিত্য চর্চা চলছিল তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পাঠক ও সদস্যদের দাবিতে লাইব্রেরিটিকে অবমুক্ত করা হলেও সেই পাঠক সমাজ আর গড়ে ওঠেনি। এখন এর একটি অংশে রংপুর ফাউন্ডেশন নামে একটি সংগঠনের কার্যালয় করা হয়েছে। বর্তমানে লাইব্রেরিতে ছয় হাজারের মতো বই আছে।
আগে এটি একটি কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হলেও প্রায় দেড় যুগ ধরে এর রক্ষণাবেক্ষণ করছে জেলা প্রশাসন। তবে কোনো নিয়মিত কমিটি নেই। সংস্কারেরও কোনো উদ্যোগ নেই।
রংপুর পাবলিক লাইব্রেরির আজীবন সদস্য শিক্ষাবিদ ড. শাশ্বত ভট্টাচার্য বলেন, আমরা আশির দশকেও দেখেছি কারমাইকেল কলেজ, রংপুর কলেজসহ নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ভিড় থাকত এই লাইব্রেরিতে। আগে এটি যখন বেসরকারি উদ্যোগে কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হতো, তখন সব ঠিকমতো চলছিল। এখন ভবনটির ভগ্নদশা, পরিচালনা পরিষদের ব্যর্থতা ও মালিকানার দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে প্রতিষ্ঠানটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। একই রকম মন্তব্য করেছেন রংপুর প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মাহবুব রহমান।
রংপুর পাবলিক লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান আজিজুল ইসলাম সানু মূল্যবান বইপত্র কিছু খোয়া যাওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, এ সম্পর্কে যারা যখন পরিচালনা পরিষদে ছিলেন তারাই এ বিষয়ে জানবেন। এখন লাইব্রেরিতে পুরাতন মূল্যবান বইপত্রের তালিকাও সংরক্ষিত নেই।
রংপুর জেলা প্রশাসক ও রংপুর পাবলিক লাইব্রেরির আহ্বায়ক ইসরাত জাহান বলেন, আমি নতুন এসেছি। এই প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো দেখে বুঝেছি এটি একটি প্রাচীন স্থাপনা। আমি শুনেছি নানা সমস্যা আছে। খোঁজখবর নিয়ে নথিপত্র দেখে একটি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেব। সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করব।
