স্মৃতির মানচিত্রে একজন দুঃসাহসী দেশপ্রেমিক নুরুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৫ এএম
বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশ এমন এক ক্ষণজন্মা মানুষ পেয়েছিল, যিনি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যমুনা শিল্প গ্রুপের মাধ্যমে শুধু কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাই করেননি; দুঃসাহসী দুটি গণমাধ্যমও প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। করোনাকালে দেশ সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অনেক জ্ঞানীগুণী শিল্পপতিকে হারিয়েছি। আমাদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম এমন এক মহান ব্যক্তি ছিলেন, তিনি যখন যে স্বপ্ন দেখতেন তা বাস্তবায়নও করতেন। তার হাত ধরে একে একে গড়ে ওঠে ৪২টি শিল্প প্রতিষ্ঠান।
করোনায় আক্রান্ত হওয়ার কিছু দিন আগে তিনি বলছিলেন, করোনা এসে বুঝিয়ে দিয়েছে দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থা কতটা নাজুক। ওই সময়ে কেউ করোনা আক্রান্ত হলে দেশের বাইরে নেওয়ারও সুযোগ ছিল না। কারণ সারা বিশ্ব আক্রান্ত। নুরুল ইসলাম বলেছিলেন, আল্লাহ হায়াত দিলে দেশে একটা আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল গড়ে তুলব। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেশে সর্ববৃহৎ একটা কবরস্থান গড়ে তোলারও স্বপ্ন ছিল। মানুষের কল্যাণে কাজ করা নুরুল ইসলামের এই স্বপ্ন দুটো পূর্ণতা পায়নি করোনাকালে, তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। তবে তার সহধর্মিণীসহ সুযোগ্য সন্তানরা যমুনা শিল্প গ্রুপের সব অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সচল রাখার পাশাপাশি নুরুল ইসলামের হাসপাতাল গড়ে তোলার স্বপ্ন পূরণে কাজ করছেন। এ ছাড়াও দেশের শিক্ষাখাতে যমুনা গ্রুপ কীভাবে অবদান রাখতে পারে তা নিয়েও কাজ চলছে।
নুরুল ইসলামকে নিয়ে লিখলে তার অবদানের কথা হাজার পৃষ্ঠায়ও সংকুলান হবে না। আমি গণমাধ্যম নিয়ে তার দুঃসাহসী স্বপ্ন এবং এর বাস্তবায়নের দিকটা নিয়ে সামান্য আলোকপাত করছি।
১৯৯৯ সালের শেষের দিকে সব চেয়ে বড় বাজেটে দৈনিক যুগান্তর বাজারে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেন নুরুল ইসলাম। সে মোতাবেক দৈনিক ইত্তেফাক থেকে গোলাম সারওয়ারকে সম্পাদক করে নিয়ে আসেন। বার্তা সম্পাদক হন মনজুরুল আহসান বুলবুল ও চিফ রিপোর্টার সাইফুল আলম। আমিও মানবজমিন ছেড়ে সেই টিমে একজন রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেই। যুগান্তর শুরু থেকেই দেশ ও দশের কল্যাণে দুঃসাহসী কাজ করে।
২০০১ সালে মালিবাগে এমপি ইকবালের মিছিল থেকে গুলি করে বিএনপির নেতাকর্মীদের হত্যার একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে যুগান্তর সারা দেশে আলোড়ন তুলে। সেদিন ছিল হরতাল। আমি এবং আমাদের ফটোগ্রাফার কাজল হাজরা ছিলাম অ্যাসাইনমেন্টে। যুগান্তর সাহস করে রিপোর্টটি প্রকাশ করে। যেখানে দেখা যায়, হরতাল বিরোধী মিছিলের নেতৃত্বে তৎকালীন আওয়ামী দলীয় এমপি ডা. এইচবিএম ইকবালের নেতৃত্বে ওই মিছিল থেকে প্রকাশ্যে গুলি করা হচ্ছে হরতালের সমর্থনে বিএনপির একটি মিছিলে। মূহুর্তে লাশ পড়ে গেল। যুগান্তরে রিপোর্ট প্রকাশের পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চাপ সৃষ্টি শুরু হলো। গোয়েন্দা সংস্থা এই রিপোর্ট প্রকাশের কারণ খুঁজতে শুরু করল।
সম্পাদক সারওয়ার সাহস দেখালেন। দায়িত্ব নিলেন। কারণ যুগান্তর এই এক রিপোর্টে দেশজুড়ে আলোচনার পাশাপাশি পাঠকের কাছে আরও ঘনিষ্ঠ হয়। নুরুল ইসলাম এই রিপোর্টের জন্য ধন্যবাদ দিলেন এবং বললেন, আমি চাই যুগান্তর এমন দুঃসাহসী রিপোর্ট করে মানুষের মন জয় করুক।
মাঝখানে পেরিয়ে গেছে ২৬টি বছর। যুগান্তর অসংখ্য দুঃসাহসী রিপোর্ট করেছে। যুগান্তরের রিপোর্টের জন্য প্রশাসনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। দুর্নীতিবাজদের জেলে যেতে হয়েছে। তার দেখানো পথে, তার নীতি অনুসরণ করেই সত্যের পথ ধরে আজও এগিয়ে যাচ্ছে।
২০০৯ সালে যমুনা টিভির পরীক্ষামূলক সম্প্রচার শুরু হলে তিনি বলেছিলেন, আমি চাই যমুনা টিভি হবে আলজাজিরা টেলিভিশনের মত। ঘটনার নেপথ্যে, আড়ালে থাকা চাপা পড়া সত্য অনুসন্ধান করে বের করবে যমুনা টিভি। ইনভেস্টিগেশন এডিটর হিসেবে সেভাবেই সব প্রস্তুতি নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম আমরা। দেশের স্বার্থে তার স্বপ্ন পূরণে টেলিভিশনে অনুসন্ধান সেল গঠন করা হয় এবং মেধাবী পেশাদার রিপোর্টারদের মাধ্যমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির কাজও শুরু হয়। তৎকালীন সরকার নুরুল ইসলামের এই উদ্যোগে ভয় পেয়ে ২০০৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর পরীক্ষামূলক সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। কিন্তু তিনি থেমে যাননি। আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে ২০১৩ সালের শেষের দিকে আবার পরীক্ষামূলক সম্প্রচারে আসে যমুনা টিভি। ২০১৪ সালের ৫ এপ্রিল পূর্ণাঙ্গ সম্প্রচারে আসে।
নুরুল ইসলাম সাহসী সাংবাদিকতাকে সমীহ করতেন। সম্মান করতেন। সাহস আর অনুপ্রেরণা যোগাতেন। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে সর্বোচ্চ সাপোর্ট দিতেন। রিপোর্ট করার পর কোনো ধরনের চাপ এলে তিনি সত্যের পথে অবিচল পাশে দাঁড়াতেন।
ঘটনা–১: র্যাবের ক্রস ফায়ার: ‘বিচার বহির্ভূত খুনের মিছিল’ শিরোনামে ২০০৬ সালে যুগান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর গোয়েন্দা সংস্থা থেকে চাপ আসে। আমার নামে রিপোর্ট হওয়ায় খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। উপসম্পাদক শাহজাহান সরদার বিষয়টি নুরুল ইসলামকে জানান। তখন তিনি সাহস দিয়ে বলেছিলেন, জনগণের পক্ষে আরও লেখ। দুয়েক দিন অফিসে না আসার কথাও বলেন। পরে তিনি বিষয়টি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ে কথা বলেন। পরে আর তেমন সমস্যা হয়নি।
ঘটনা-২: সম্প্রচারে আসার পর তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী হাছান মাহমুদের বিরুদ্ধে যমুনা টিভিতে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচারিত হয়। থ্রি-সিক্সটি ডিগ্রির ওই এপিসোডে দেখানো হয় মন্ত্রী তার শশুর বাড়ির লোকের নামে কীভাবে জলবায়ু তহবিলের অর্থ তছরূপ করেছেন। পার্বত্য এলাকায় ঘর নির্মাণ দেখিয়ে টাকা আত্মসাত করেছেন। প্রায় ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পে নয়ছয় নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরির সময় মন্ত্রীর বক্তব্য নিতে গেলে তিনি যমুনা টিভির ক্যামেরা ভেঙে ফেলেন। রিপোর্টারকে হেনস্থা করেন। ভয়ভীতি দেখান। যমুনা গ্রুপকে দেখে নেবেন বলে হুমকি দেন। আমি ইনভেস্টিগেশন এডিটর হিসেবে বিষয়টি নুরুল ইসলামকে জানাই। তিনি বলেন, দুর্নীতির সঙ্গে কোনো আপোষ হবে না। রিপোর্ট অন-এয়ার করো। আমরা সেই রিপোর্ট অন-এয়ার করলাম। পরে নুরুল ইসলাম বলেন, এরকম সাহসী কাজ চালিয়ে যাও। আমি দেখব কারা বাঁধা দিতে আসে।
ঘটনা-৩: ২০১৯ সালের ১৪ জানুয়ারি যুগান্তরে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিতে গভর্নর আতিউরসহ আটজনের জড়িত থাকার বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশের পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে চাপ আসতে থাকে। আমি যেহেতু রিপোর্ট করেছি, ফলে আমার ওপর ছিল ক্ষোভ। নানারকম হয়রানি। ১৭ জানুয়ারি যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আমাকে ফোন করে বলেন, রিপোর্ট যে করেছি সব কাগজপত্র ঠিক আছে কিনা। আমি বললাম আছে। তিনি সেই ডকুমেন্টস নিয়ে নুরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি সন্ধ্যায় আমাকে ফোন করে বলেন, তোমার আসতে হবে। আমি গেলাম। একজন কর্মকর্তা প্রায় ঘণ্টখানেক ভিতরের অলিগলি ঘুরিয়ে মূল ভবনের ভিতর নির্দিষ্ট কক্ষে নিয়ে গেলেন। সেখানে আমার সঙ্গে খারপ আচরণ করা হয়, সেটি ছিল অত্যন্ত ভয় ও আতংকের। বিএনপির সঙ্গে যোগসাজশ করে রিপোর্ট করা হয়েছে, আমি নাকি সুবিধা পেয়েছি! আরও অনেক অপ্রিয় প্রশ্ন। গভীর রাতে সেখান থেকে ছাড়া পেয়ে পরের দিন অসুস্থ হয়ে যায়।
যাই হোক, নুরুল ইসলাম আমাকে ডাকলেন। বললেন, তুমি কি জানো সকালে আমাকেও ডাকা হয়েছিল। ডিজি অনেক বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। আমি বলেছি, রিপোর্টার তার বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের ভিত্তিতে রিপোর্ট করেছে। রিপোর্ট করার আগে আমি এ বিষয়টি জানতাম কিনা সে প্রশ্নও করেছে। আমি বলেছি না। জানতাম না। এক পর্যায়ে নুরুল ইসলামকে বলা হয়, আপনার সাংবাদিক বিএনপির কাছ থেকে ১৫০ কোটি টাকা খেয়ে এই রিপোর্ট করেছে। নুরুল ইসলাম তীব্র প্রতিবাদ করেন। বলেন, এটা আষাঢ়ে গল্প। আমার রিপোর্টার দেড়শ কেন দেড় কোটির জন্যও এই অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেনি। এটা গ্যারেন্টি।
নুরুল ইসলাম গিয়েছেন তা তাকেও গোপন রাখতে বলা হয়েছিল। পরে তিনি বিষয়টি আমাকে জানান।
এখানে নুরুল ইসলামের সাহসী ভূমিকার তিনটি ঘটনার সামান্য আলোকপাত করলাম। তিনি আমার বা আমাদের রিপোর্টারদের পক্ষ না নিলেও পারতেন। তার এতো বড় শিল্প গ্রুপ, তিনি সেগুলো রক্ষায় এড়িয়ে গিয়ে রিপোর্টারের ওপর চটে গিয়ে তাকেই উলটো চাকরি ছেড়ে দিতে বলতে পারতেন। কিন্তু তিনি ঝুঁকি নিয়েছেন। যে কারণে যুগান্তর-যমুনা সাহসী রিপোর্ট করার পথটি কখনো ভুলে যায়নি। জনগণের ভালোবাসার কাছে ঋণী হয়ে আছে। তার মতো সাহসী মানুষ সত্যিই মিডিয়ার জন্য দরকার। ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে নুরুল ইসলামের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
লেখক: নগর সম্পাদক, যুগান্তর।
সাবেক ইনভেস্টিগেশন এডিটর, যমুনা টেলিভিশন।


