যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা নুরুল ইসলামের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ
সৃষ্টিতেই যার সার্থক জীবন
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
নুরুল ইসলাম (৩ মে ১৯৪৬-১৩ জুলাই ২০২০)
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্বপ্ন সবাই দেখেন; কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সক্ষমতা বিরল। বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে তিনি শুধু একটি শিল্পগোষ্ঠী গড়ে তোলেননি, গড়ে তুলেছিলেন আত্মবিশ্বাস, কর্মসংস্থান এবং দেশীয় শিল্পের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা। সেই বিশ্বাসকেই আজীবন ধারণ করেছিলেন কর্মে, চিন্তায় ও সৃষ্টিতে। এজন্য সফল সৃষ্টিতেই তার জীবন সত্যিই সার্থক।
যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পোদ্যোক্তা নুরুল ইসলামের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ। করোনা মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে ২০২০ সালের ১৩ জুলাই তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরদিন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাজধানীর বনানী কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়। তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। জীবনাবসান হলেও তার কর্মযজ্ঞ থেমে নেই। এই কীর্তিমান মানুষটির হাতে গড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আজও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কর্মসংস্থান, উৎপাদন, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো-বহুমাত্রিক অবদানের মধ্য দিয়ে তিনি আজও সবার মাঝে বেঁচে আছেন।
নুরুল ইসলামের কর্মই তাকে অমর করেছে। ১৯৭১ সালে অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে।
স্বাধীনতার পর সেই একই নিষ্ঠা নিয়ে শুরু করেছিলেন অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম। তার কাছে শিল্প ছিল শুধু ব্যবসা নয়, দেশ গড়ার এক মহৎ অঙ্গীকার। আর দেশপ্রেম ছিল সবার ওপরে। এভাবে সততা, মেধা, কঠোর পরিশ্রম ও দূরদর্শিতার সমন্বয়ে একে একে গড়ে তোলেন ৪২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অর্ধলক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেন।
নুরুল ইসলাম ছিলেন আপসহীন নীতিবান উদ্যোক্তা। দুর্নীতি, অনিয়ম ও অন্যায়ের সঙ্গে কখনো আপস করেননি। নির্দ্বিধায় কালোকে কালো, সাদাকে সাদা বলেছেন। নীতির প্রশ্নে কোনো চাপ কিংবা রক্তচক্ষুর কাছে তিনি কখনো মাথানত করেননি। রাষ্ট্রের যে কোনো ব্যক্তির মুখের ওপর সত্যটা বলে দিতে এতটুকু দ্বিধা করতেন না। এজন্য তাকে জেল-জুলুম, হয়রানি এবং আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখিও হতে হয়েছে। তবু তিনি পথ বদলাননি। তিনি তার যোগ্য প্রতিনিধি হিসাবে স্ত্রী, এক ছেলে ও তিন মেয়েসহ অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। তার স্ত্রী সালমা ইসলাম বর্তমানে যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং দৈনিক যুগান্তরের প্রকাশক। ছেলে মো. শামীম ইসলাম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিন মেয়ে-সোনিয়া সারিয়াত, মনিকা ইসলাম এবং সুমাইয়া রোজালিন ইসলাম পরিচালক হিসাবে অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠাতার স্বপ্ন ও দর্শনকে ধারণ করেই তারা শিল্পগোষ্ঠীর অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছেন। নুরুল ইসলামের জীবন ছিল এক অনন্য অভিযাত্রা। জন্ম ১৯৪৬ সালের ৩ মে, ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার চুড়াইন ইউনিয়নের কামারখোলা গ্রামে। বাবা আমজাদ হোসেন ও মা জোমিলা খাতুন। মায়ের প্রতি তার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কথা তিনি প্রায়ই বলতেন। বিশ্বাস করতেন, জীবনের প্রতিটি সাফল্যের পেছনে রয়েছে মায়ের দোয়া।
কর্মজীবনের শুরু সেনাবাহিনীতে। পরে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ। স্বাধীনতার পর ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। শুরুটা ছোট পরিসরে হলেও স্বপ্ন ছিল বিশাল। সেই স্বপ্নের ভিত্তিতেই ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন যমুনা গ্রুপ। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ক্রমেই তিনি গড়ে তোলেন দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী। ইলেকট্রনিক্স, টেক্সটাইল, কেমিক্যাল, লেদার, গার্মেন্ট, বেভারেজ, টয়লেট্রিজ, মোটরসাইকেল, আবাসন-প্রায় প্রতিটি খাতেই সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। তার প্রতিষ্ঠিত যমুনা ফিউচার পার্ক এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ শপিংমল হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। যমুনা ইলেকট্রনিক্সও দেশীয় ব্র্যান্ড হিসাবে মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। শুরু থেকে ঢাকার পাশে গাজীপুর জেলায় গড়ে উঠেছে যমুনা শিল্পগ্রুপের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া পরবর্তী সময়ে হবিগঞ্জের মাধবপুরে বিশাল জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, যা এখন দেশের জন্যও বড় গৌরবের। শিল্পোদ্যোক্তা নুরুল ইসলামের কাছে ব্যবসা মানে শুধু মুনাফা নয়, ছিল মানুষের জীবনমান উন্নয়নের দায়িত্ব। তিনি বলতেন, একটি কারখানা শুধু পণ্য উৎপাদন করে না, একটি পরিবারের স্বপ্নও বাঁচিয়ে রাখে। সেই বিশ্বাস থেকেই যমুনা গ্রুপ আজ দেশের অন্যতম বৃহৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।
দেশীয় শিল্পের বিকাশ ছিল তার আজীবনের অঙ্গীকার। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তাই চিন্তার কেন্দ্রে ছিল ‘মেড ইন বাংলাদেশ’। যমুনা ফ্যান, অ্যারোমেটিক সাবান, পেগাসাস কেডসসহ নানা দেশীয় ব্র্যান্ডের বিকাশে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। শুধু পোশাকশিল্প নয়, ইলেকট্রনিক্স, মোটরসাইকেল, গৃহস্থালি পণ্য, রাসায়নিক ও নির্মাণসামগ্রীসহ বহু খাতে দেশীয় উৎপাদনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন তিনি। পণ্যের গুণগতমানের প্রশ্নে কখনো আপস করেননি। তার বিশ্বাস ছিল, ভালো মানই একটি ব্র্যান্ডের সবচেয়ে বড় পরিচয়। শিল্পের পাশাপাশি গণমাধ্যমেও ছিল তার সুদূরপ্রসারী ভাবনা। সংবাদপত্র ও টেলিভিশনকে তিনি শুধু ব্যবসা হিসাবে দেখেননি। দেখেছিলেন জনস্বার্থ ও গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসাবে। ২৬ বছর আগে প্রতিষ্ঠা করেন দৈনিক যুগান্তর। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠা করেন যমুনা টেলিভিশন। বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী সাংবাদিকতার মাধ্যমে দুটি প্রতিষ্ঠানই দেশের গণমাধ্যমে শীর্ষ অবস্থান তৈরি করেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় যমুনা টেলিভিশনের পেশাদার ও দায়িত্বশীল ভূমিকা দেশজুড়ে প্রশংসিত হয়।
নুরুল ইসলাম স্বপ্ন দেখার পর আর থেমে থাকতেন না। বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত নিরলস পরিশ্রম করতেন। সপ্তাহের সাত দিনই কাজ ছিল তার নিত্যসঙ্গী। শুক্রবারের ছুটির দিনও নিজে সড়কপথে বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শনে যেতেন। কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতেন, উৎপাদন দেখতেন, সমস্যা শুনতেন। নেতৃত্ব তার কাছে ছিল সামনে থেকে পথ দেখানোর নাম। ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন পরিচ্ছন্ন ও নীতিনিষ্ঠ ব্যবসায়ী।
দেশের বাইরে অর্থ পাচার কিংবা খেলাপি ঋণের সঙ্গে তার নাম কখনো জড়ায়নি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কোনো ব্যাংকে তিনি ঋণখেলাপি ছিলেন না। বরং ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমও সেই অবস্থান দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছে।
২০২০ সালের ১৪ জুন তার শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। সেদিনই তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসার জন্য গঠন করা হয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড। দেশি চিকিৎসকদের পাশাপাশি চীন ও সিঙ্গাপুরের বিশেষজ্ঞরাও অনলাইনে চিকিৎসা-পরামর্শ দেন। কিন্তু সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি ১৩ জুলাই না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
তার এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, দেশের শিল্প ও ব্যবসা অঙ্গনের জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনে। তবে সময় প্রমাণ করেছে, স্বপ্নদ্রষ্টারা কখনো হারিয়ে যান না। তারা বেঁচে থাকেন তাদের সৃষ্টি, কর্ম ও আদর্শে। নুরুল ইসলামও তেমনই একজন মানুষ। তার প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান, দেশীয় ব্র্যান্ড, গণমাধ্যম এবং শিল্পায়নের দর্শন আজও নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের অনুপ্রাণিত করে। মানুষের জীবন সীমিত। কিন্তু সৃষ্টির আয়ু অনেক দীর্ঘ। তাই নুরুল ইসলামের জীবনাবসান হলেও থেমে নেই তার স্বপ্নের অভিযাত্রা। তিনি নেই; কিন্তু তার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিদিন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে, দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
মৃত্যুবার্ষিকীর কর্মসূচি : এই বীর মুক্তিযোদ্ধার ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে যুগান্তর ও যমুনা পরিবার আজ স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। সকাল ৮টায় যমুনা ফিউচার পার্ক এরিয়ায় অবস্থিত মসজিদে পবিত্র কুরআন খতম এবং সকাল ৯টায় বনানী কবরস্থানে কবর জিয়ারত করা হবে। দুপুর ১২টায় যমুনা টেলিভিশন ভবনে অনুষ্ঠিত হবে স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল। সভায় উপস্থিত থাকবেন যমুনা গ্রুপের বর্তমান চেয়ারম্যান যুগান্তর প্রকাশক সালমা ইসলাম, যমুনা গ্রুপের গ্রুপ পরিচালকবৃন্দ, যুগান্তর সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার এবং যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদসহ যুগান্তর-যমুনা পরিবারের সদস্যবৃন্দ। এছাড়াও সারা দেশে যুগান্তর ও যমুনা টেলিভিশনের ব্যুরো, জেলা ও থানা পর্যায়ে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হবে।
