তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নতুন রূপরেখা
প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের প্রস্তাব উচ্চকক্ষ থেকে
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কোন প্রক্রিয়ায় গঠন হবে, সে বিষয়ে নতুন রূপরেখা দিয়েছেন দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী। তাদের কেউ কেউ জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা নিয়োগের প্রস্তাব করেছেন। আবার কেউ কেউ সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতিতে উচ্চকক্ষে স্পিকার নির্বাচিত হলে, তাকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের কথা বলেছেন। বিগত দিনে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের যে বিধান ছিল, সেই বিধান পুনরায় যাতে ফিরিয়ে আনা না হয়, সেই পরামর্শও দিয়েছেন কেউ কেউ।
শনিবার জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির বৈঠকে এসব প্রস্তাব উঠে আসে। এ বৈঠকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনের শিক্ষক ও উচ্চ আদালতের আইনজীবীরা অংশ নেন। তাদের অনেকের বক্তব্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ধারণের পরামর্শ উঠে আসে।
বৈঠক শেষে বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ওইসব প্রস্তাবের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া ও কর্মপরিধি নিয়ে লিখিত মতামত দিতে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাব এলে সেগুলোও কমিটির প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। জুলাই সনদে বিএনপি যেসব বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল, বিরোধী দল চাইলে সেগুলোর কিছু কিছু শিথিল হতে পারে বলেও জানান তিনি। তবে, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ নিয়ে এসব বিষয়ে বিরোধী দলকে প্রস্তাব দিতে হবে বলে শর্ত দেন তিনি।
সংবিধান সংশোধনে অংশীজনদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে মতামত নিচ্ছে বিশেষ এ কমিটি। এরই অংশ হিসাবে গতকাল এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বেলা ১১টায় শুরু হয়ে মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতি দিয়ে বিকাল ৫টার পরও চলে এ বৈঠক। এতে ৪৪ জন অংশ নেন। বৈঠকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংসদ-সদস্যদের ভোটাধিকারের এখতিয়ার বাড়ানো, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে স্বচ্ছতা ও পৃথক আইন প্রণয়ন, বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সংসদের নিুকক্ষের মেয়াদ চার বছর ও উচ্চকক্ষের মেয়াদ ছয় বছর করাসহ বিভিন্ন প্রস্তাব উঠে আসে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও মানবাধিকার কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দেওয়া এবং মৌলিক অধিকারের পরিধি বাড়ানোর বিষয়েও মতামত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আলোচনা হয় গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়েও। কেউ কেউ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষে ৫০টি আসন এবং বাকি ৫০টি প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে বণ্টনের বিধান করার প্রস্তাব দেন।
বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে আলোচনার বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি গঠনের প্রক্রিয়া এবং তার কর্মপরিধি ইত্যাদি নিয়ে বিস্তারিত আলাপ হয়েছে। অনেকে এ বিষয়ে আইডিয়া দিয়েছেন। বলা হয়েছে-উচ্চকক্ষ গঠিত হলে সংসদের সঙ্গে একই মেয়াদে উচ্চকক্ষ ভেঙে না দিয়ে সেখান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া রাখা যায় কি না। একজনের প্রস্তাব-যদি উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃজন করা হয় এবং তাকে উচ্চকক্ষের স্পিকারের দায়িত্ব দেওয়া যায়। অথবা যদি বিকল্প থাকে সে ক্ষেত্রে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচিত হলে সে স্পিকারকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করা যায় কি না, সেই আলোচনা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্য উপদেষ্টাদেরও সরকারি ও বিরোধী দলের সম্মতিতে উচ্চকক্ষ থেকে নিযুক্ত করার বিধান থাকতে পারে। এরকম মতামত এসেছে। এটিও বিবেচনা করা যায়। তিনি বলেন, আরও প্রস্তাব এলে কমিটি তাদের প্রতিবেদনে সেগুলো তুলে ধরবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে জুডিশিয়ারির এখতিয়ার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কিভাবে কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে বক্তব্য এসেছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে সংসদ-সদস্যদের কিছুটা সীমাবদ্ধতা আছে, সেই সীমাবদ্ধতা কিভাবে কমিয়ে আনা যায়, এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার বিষয়ে কথা হয়েছে। বিচারক নিয়োগের আইন এবং সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কথা হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য কিছু বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একটি নতুন ডেফিনেশন তারা দিতে চেয়েছেন যে, ‘স্ট্যাটিউটরি কনস্টিটিউশনাল বোর্ড’। স্ট্যাটিউটরি অর্গান থাকবে; কিন্তু তার গঠন এবং কর্মপরিধি নিয়ে তারা কিভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সেরকম কোনো চিন্তাভাবনা করা যায় কি না-তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সূত্র জানায়, বৈঠকে সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকর করার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। সরকারি হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠানবিষয়ক কমিটির পাশাপাশি পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোট, সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা বাড়াতে সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন প্রণয়ন এবং নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের জন্য নিরপেক্ষ বাছাই কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন অংশগ্রহণকারীরা। অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব বিচার বিভাগের হাতে ন্যস্ত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
তবে বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। উচ্চকক্ষের পরিবর্তে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রস্তাবও এসেছে। উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে সংবিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশোধিত হয় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
এ বৈঠকে অংশ নিয়ে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় নিয়ে সর্বোচ্চ অর্জন নিশ্চিত করতে সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির কাছে আহ্বান জানান সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। বৈঠক শেষে বেরিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নেতৃত্বে যে সংসদীয় সংবিধান সংশোধন কমিটির মিটিং হয়েছিল, সেখানেও আমন্ত্রিত হয়ে কথা (পরামর্শ) বলেছিলাম। সেখানে আমরা অনেক প্রত্যাশা নিয়ে গিয়েছিলাম; কিন্তু পরে প্রতারিত হয়েছি। পরে দেখলাম, খুবই নিন্দিত একটি সংশোধনী (পঞ্চদশ সংশোধনী) পাশ হয়েছে। এ আইনজ্ঞ বলেন, আমরা আশা করব, সংবিধান যে পর্যায়ে আছে এখন, তার চেয়ে যেন আমরা অনেক অ্যাডভান্সড একটি সংবিধান পাই। এবং যতটুক অর্জন হবে, সেটিই আমাদের লাভ, তবে আমরা চাইব সর্বোচ্চ অর্জন যেন হয়।
আলোচনায় আসিফ নজরুল সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে কার্যকর করা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ পদ্ধতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, নির্বাচনব্যবস্থা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা জানান। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগ আইন এবং সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় আইন বাদ দেওয়ায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেছেন। তার ভাষ্য-বিএনপির নিজস্ব অঙ্গীকারেও এসব আইন প্রণয়নের বিষয়টি ছিল। তবে আইনমন্ত্রী তাকে জানিয়েছেন, পরবর্তী সময়ে এসব আইন করা হবে। অর্থাৎ বিষয়গুলো পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়নি বলে তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে মতভেদ প্রসঙ্গে আসিফ নজরুল বলেন, এটি যেহেতু অত্যন্ত কন্টেনশিয়াস (তর্ক-বিতর্কের) ইস্যু এবং জুলাই সনদে আমি খেয়াল করে দেখেছি, ৯টি পদ্ধতি আছে, তার মধ্যে ৮টির ব্যাপারেই সমস্ত দলের ঐকমত্য আছে। তো একটি ব্যাপারে মতভেদ আছে, এটি তো এমন কোনো বড় ব্যাপার নয়। বৈঠকে আমি বলেছি, অন্তত এটি যেন যতগুলো বিরোধী দল আছে, তাদের সঙ্গে মতক্যৈর ভিত্তিতে করা হয়। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে, কমিটির পক্ষ থেকে আমাদের বলা হয়েছে, তারা অনেক রকম চেষ্টা করেছেন।
গণভোট ও সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে আসিফ নজরুল বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কী চাওয়া হয়েছিল, তা আইন পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়। তবে বিষয়টি রাজনৈতিক বিরোধ ও বিতর্কে পরিণত হয়েছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ হবে, নাকি সংশোধন কমিটির মাধ্যমে পরিবর্তন আনা হবে-এ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, সংবিধানের যেকোনো পরিবর্তন ইতিবাচক হলে সেটিই সংস্কার। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করা গেছে কি না, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কী প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হলো, তার চেয়ে লক্ষ্য অর্জনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এ ধরনের বিরোধ কাম্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আসিফ নজরুলের আশঙ্কার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ওই সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করা ঠিক হবে না। প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নেতৃত্বাধীন কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার বিষয়ে একমত হলেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর (শেখ হাসিনা) সঙ্গে সাক্ষাতের পর তা বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত জানানো হয়। সে সময় একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও অবৈধভাবে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, বর্তমান সরকারের পরিস্থিতি তার সঙ্গে মেলে না।
বৈঠকের পর সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিচারপতি নিয়োগ আইন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যসহ বেশ কিছু বিষয়ে আলোচনা এসেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেকে প্রথম ধাপেই বিচার বিভাগকে সম্পৃক্ত না করার কথা বলেছেন। সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলকে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারে বিএনপি। জনগণ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। ২১৪ আসন পেয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এসে তাদের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে-বিরোধী দল এমন আশা করতে পারে না।
