শঙ্কিত কুমিল্লার বাসিন্দারা
কোটবাড়ীতে বেপরোয়া ২০ কিশোর গ্যাং
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কুমিল্লার লালমাই পাহাড় ও সংলগ্ন কোটবাড়ী এলাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ২০টির বেশি কিশোর গ্যাং। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অপহরণ-খুন, ধর্ষণ ও ইভটিজিংয়ে জড়িত এসব গ্যাং-এর সদস্যরা। টিকটক, ফেসবুক ও মাদকে আসক্ত তারা। পর্যটনকেন্দ্র ও নির্জন পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ার সুযোগে প্রতিনিয়ত নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে এসব গ্যাং। এতে স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও পর্যটকদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি লালমাই পাহাড় ও পর্যটনসমৃদ্ধ কোটবাড়ী এলাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ২০টির বেশি কিশোর গ্যাং। খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার এবং যৌন নিপীড়নের মতো ঘটনার সঙ্গে জড়িত গ্যাং-এর সদস্যরা। ওই এলাকায় প্রায়ই পর্যটক কিংবা শিক্ষার্থীদের একা পেয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা হয়। পরে তাদের কাছ থেকে টাকা, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
শুধু তাই নয়, নির্জনতার সুযোগে নৃশংস অপরাধ ঘটাচ্ছে গ্যাং সদস্যরা। সম্প্রতি ওই এলাকায় ঘুরতে গিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন এক কিশোরী, যা ওই এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। অপরাধীচক্রের সদস্যরা মাদক কেনাবেচা ও সেবনের পাশাপাশি ভয়ভীতি প্রদর্শনে দেশীয় ধারালো অস্ত্র, লাইটার বা ডামি পিস্তল ব্যবহার করে থাকে।
স্থানীয়রা জানান, লালমাই পাহাড় ও কোটবাড়ী এলাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সিফাত গ্রুপ। এ কিশোর গ্যাংটির ওই এলাকায় বেশ প্রভাব রয়েছে। সম্প্রতি এদের প্রধান লিডার সিফাতসহ বেশ কয়েকজন সদস্যকে পুলিশ দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেফতার করেছে।
জিসান গ্রুপ : সিফাত গ্রুপের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে প্রায়ই আধিপত্যের লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ছে গ্যাংটি। কোটবাড়ী এলাকায় গ্রুপটি বেশ সক্রিয়।
ক্রাইম সেটাপ : এটি বেশ ভয়ংকর একটি গ্যাং, যারা কোটবাড়ী, লালমাই পাহাড়সহ আশপাশের এলাকায় কার্যক্রম চালাচ্ছে। শক্তি-সামর্থ্য জানান দিতে প্রায়ই অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয় এই গ্রুপ। চাঞ্চল্যকর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এই গ্যাং-এর সদস্যরা।
ঈগল গ্রুপ : কুমিল্লার অন্যতম একটি বড় গ্যাং, যার সদস্যরা কোটবাড়ী ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধমূলক কাজ করে থাকে।
রতন গ্রুপ : নগর পেরিয়ে সালমানপুর, লালমাই পাহাড় ও শালবনবিহার এলাকায় ক্রাইমে জড়িত।
এছাড়া কোটবাড়ী-লালমাই পাহাড় এলাকায় গ্যাং তৎপরতা চালাচ্ছে ফ্লাইং বার্ড, ব্ল্যাক বস, ইয়াং স্টার, রোড স্টার, স্মার্ট বয়, র্যাক্স, এক্স, এলআরএন, সিবিক, মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজসহ ২০টি গ্যাং। ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে সংগঠিত হচ্ছে এরা। এসব নামে তাদের ফেসবুক আইডি রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে লালমাই পাহাড়ের বিশাল বিস্তৃত ও নির্জন এলাকা অপরাধীরা গোপন আস্তানা হিসাবে ব্যবহার করে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আশপাশের বেশ কয়েকটি বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এবং প্রতিদিন আগত পর্যটকরাই এসব গ্যাং-এর প্রধান টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন।
১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার পর এসব গ্যাং নিয়ে আলোচনা চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোটবাড়ী-লালমাই পাহাড় এলাকায় টহল জোরদার করেছে বলে জানা গেছে।
সালমানপুর এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, ২০-২২টি কিশোর গ্যাং এ এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এমন কোনো অপরাধ নেই তারা করছে না। সানন্দা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, আমরা পাহাড়ের নিরীহ বাসিন্দা। চোখের সামনে কত অপকর্ম দেখি। কিন্তু বলার সাহস পাই না। লালমাই পাহাড় এবং কোটবাড়ী এলাকায় কিশোর গ্যাংগুলো খুন, অপহরণ, ধর্ষণ, ইভটিজিং, মাদকসেবনসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত।
কুমিল্লার নাগরিক অধিকার ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শাহজাদা এমরান বলেন, নগরী এবং শহরতলিতে কিশোর গ্যাং-এর তৎপরতা বেড়েছে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। লালমাই পাহাড় ও কোটবাড়ী এলাকার কিশোর গ্যাং সদস্যরা নানা ভয়ংকর অপরাধে লিপ্ত রয়েছে।
কুমিল্লা ডিবির ওসি মোহাম্মদ শামছুল আলম শাহ বলেন, লালমাই পাহাড় ও কোটবাড়ী এলাকার কিশোর গ্যাংসহ সব অপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযান চলমান। এসব সন্ত্রাসীকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। সব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হবে।

