মন্তব্য প্রতিবেদন
গণতন্ত্রের মশাল জ্বেলে বিদায় নিলেন ‘আপসহীন’ নক্ষত্র
Advertisement
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপাসন বেগম খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সবাইকে কাঁদিয়ে সত্যিই চলে গেলেন বেগম খালেদা জিয়া! একেবারে না ফেরার দেশে। মঙ্গলবার ভোরের বাতাস ভারী করে বিষাদের খবরটি যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষও হতবিহ্বল। শোকে স্তব্ধ পুরো জাতি। এভারকেয়ারের পথে মানুষের ঢল। চারদিকে কান্না, আহাজারি। দলমতনির্বিশেষে অনেকের চোখের কোনায় পানি ছলছল। বুকটা কেমন যেন হাহাকার করে ওঠে সবার। মনের গহিনে বইছে ডুকরে কেঁদে ওঠার অজস্র ঢেউ।
দুই.
‘আপসহীন’ একটি শব্দ। খালেদা জিয়া একটি নাম। অথচ আপসহীন নেত্রী বললেই বাকিটুকু বলা নিষ্প্রয়োজন। এটি এখন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নামের সমার্থক শব্দ। একজন রাজনীতিকের জন্য এর চেয়ে বিশেষ অর্জন আর কী হতে পারে।
তিন.
‘রাজনীতির অভিভাবক’। দুটি শব্দ। অথচ এখানেও সেই হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালার নাম। প্রাসঙ্গিক শুধু নয়, প্রণিধানযোগ্য। তিনি আর কেউ নন-বেগম খালেদা জিয়া। দেশের যে কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়-বাংলাদেশের রাজনীতির অভিভাবক কে? তার চরম শত্রু হলেও খালেদা জিয়ার নাম উচ্চারণ করতে একটুও দ্বিধা করবেন না।
চার.
‘জাতীয় ঐক্যের প্রতীক’। তিনটি শব্দ। এখানেও সেই দেশপ্রেমিকের নাম। তিনি হলেন দলমতনির্বিশেষে সবার প্রিয় বেগম খালেদা জিয়া। গণতন্ত্রের লড়াই-সংগ্রামে অংশ নেওয়া অসংখ্য মজলুম রাজনীতিকও এমন কথা বলে আসছেন অনেক আগে থেকে। আর চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাস্তবিক অর্থে তাকে শুধু একটি দলের চেয়ারপারসনের ফ্রেমে আটকে রাখা সম্ভব হয়নি। তিনি হয়ে ওঠেন সব মানুষের ‘মুক্তির নেতা’। শত নির্যাতন, নিপীড়ন, বিপ্লব-বিদ্রোহে টিকে থাকা-অনুপ্রেরণার এক আইকন। শুধু প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নন, বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা খালেদা জিয়াকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক বলে সম্মানজনক এমন অভিবাদন জানিয়েছেন বহুবার।
পাঁচ. দেশপ্রেমিক। একটি শব্দ। এটি হয়তো অনেকের জন্য প্রযোজ্য। নানা স্বার্থের কারণেও বীরত্বের এ শব্দটিকে আজকাল অনেকে আবার সুবিধাজনকভাবে ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু খালেদা জিয়া একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক। এমনটি নিজে কখনো দাবি করেননি। বরং কেউ বললে বিব্রতবোধ করতেন। কিন্তু দেশ এবং দেশের মানুষের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা তাকে এমন স্থানে নিয়ে এসেছে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে নির্মমভাবে শাহাদতবরণ করেন। এরপর খালেদা জিয়া ওই বিশেষ পরিস্থিতিতে শোক কাটিয়ে উঠে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন। বাকিটা ইতিহাস।
শত লোভ-লালসাকে পায়ে পিষে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘জনতার প্রধান সেনাপতি’। অদম্য সাহস ও ত্যাগ তাকে এনে দেয় জনতার বিজয়। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করেন। রাজনীতিতে আসার মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে ১৯৯১ সালে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে গৌরবোজ্জ্বল রেকর্ড অর্জন করেন।
ছয়. ১৯৮২ থেকে ২০২৫ সাল-৪৩ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে খলেদা জিয়া রাজপথে কিংবা নির্বাচনে কখনো পরাজিত হননি। প্রথম গ্রেফতার হন ১৯৮৩ সালে। ১৯৮৪ সালে আবার গ্রেফতার হন। ১৯৮৭ সালে গৃহবন্দি ছিলেন। এর মধ্যে ১৯৮৪ সালে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
তবে ১৯৮৬ সালে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন গৌরবোজ্জ্বল মোড়ে বাঁক নেয়। ওই সময় এরশাদের অধীনে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত নির্বাচনে অংশ নিলেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন জোট তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। এভাবে দীর্ঘ নয় বছরের আন্দোলনে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে ওঠেন ‘আপসহীন নেত্রী’। এদিকে ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় পুরো জিয়া পরিবারের ওপর জেল-জুলুমের স্টিমরোলার নেমে আসে। খালেদা জিয়া গ্রেফতার হওয়ার আগে বড় ছেলে তারেক রহমান এবং ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকেও গ্রেফতার করা হয়। ওই সময় জিয়া পরিবারকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার ফর্মুলা অনুযায়ী অনেকটা জোর করে হলেও খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর সব চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি যাননি। বরং সাফ জানিয়ে দেন-‘দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই, এটাই আমার ঠিকানা। এই দেশে, এই দেশের মাটি ও মানুষই আমার সবকিছু। কাজেই আমি দেশের বাইরে যাব না।’ এটি ছিল খালেদা জিয়ার দেশপ্রেমের শ্রেষ্ঠ উক্তি।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও ফের জিয়া পরিবারকে রাজনীতি থেকে বিদায় করে দেওয়ার সব অপচেষ্টা অব্যাহত ছিল। ওই সময় উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনার মধ্যে ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। ওই বাড়িতে তিনি ২৮ বছর ছিলেন। কিন্তু ভেঙে পড়েননি। আল্লাহর কাছে বিচার দেন এবং জনগণের অধিকার আদায়ে আরও শক্তভাবে মাঠে নামেন। ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো চিকিৎসাধীন অবস্থায় মালয়েশিয়ায় মারা যান। বড় ছেলে তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে এবং ছোট ছেলে কোকোর এমন অকালমৃত্যু খালেদা জিয়াকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। কিন্তু তিনি দেশের মানুষ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই থেকে তিল পরিমাণ পিছু হটেননি।
এদিকে অভিযোগ আছে-চরম প্রতিহিংসায় বুঁদ হয়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার মিথ্যা মামলায় জেল দিয়ে খালেদা জিয়াকে কারাগারের মধ্যেই তিলে তিলে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। বরং যারা তাকে দুনিয়াছাড়া করতে চেয়েছিলেন, তারা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সদলবলে দেশছাড়া হয়েছেন। মাইনাস হয়েছেন সবকিছু থেকে। এটিই মহাপরিকল্পনাকারী মহান আল্লাহর ফয়সালা।
সাত. যার জীবন আছে, তার মৃত্যুও আছে। এর স্বাদ প্রত্যেককে গ্রহণ করতেই হবে। তবে দিনক্ষণ একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের হাতে। এক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার মৃত্যু খুবই অর্থবহ। যদি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে তার সারমর্ম দাঁড়ায়-দল এবং দেশের মানুষের হাতে গণতন্ত্রের মশাল জ্বেলে তিনি বিজয়ের হাসি হেসে চিরবিদায় নিয়েছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মুমূর্ষু অবস্থায় একবার খালেদা জিয়াকে এভয়ারকেয়ারে ভর্তি করা হয়েছিল। তৎকালীন সরকার তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার অনুমতি দেয়নি। তখন একদিন রাতে অনেকটা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন তিনি। কিন্তু রাখে আল্লাহ, মারে কে। মহান সৃষ্টিকর্তা তাকে বাঁচিয়ে রেখে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। হাসপাতালে থাকাবস্থায় তিনি জানতে পারেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশত্যাগ করেছেন। এরপর গত ষোলো মাসে দেশ এবং রাজনৈতিক নানা সংকটে অভিভাবকের মতো ছায়া দিয়ে তিনি দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় সবাইকে সাহস জুগিয়েছেন। এর মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের তফসিলও হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও নানা সংকট উতরে অবশেষে বিজয়ী বীরের বেশে ১৭ বছর পর গত সপ্তাহে দেশে ফিরেছেন। দেশে ফিরে পেয়েছেন অভূতপূর্ব প্রায় ৩০ লাখ লোকের ঐতিহাসিক সংবর্ধনা। পেয়েছেন চিকিৎসাধীন মায়ের সান্নিধ্য।
খালেদা জিয়ার চলে যাওয়ার আগের দিন শেষ হলো নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দেওয়া। আর মাত্র ৪৩ দিন পর জাতীয় নির্বাচন। এর মধ্যে তারেক রহমানও কাঙ্ক্ষিত নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে উঠেছেন আপন যোগ্যতায়। বলতে গেলে, নির্বাচনের আগেই পরোক্ষভাবে দল ও দেশের অনেকখানি ভার তার কাঁধের ওপর। ফলে এ কথা তো নির্দ্বিধায় বলা যায়, ‘আপসহীন অভিভাবক’ বেগম খালেদা জিয়া যাওয়ার আগে সবার হাতে গণতন্ত্রের মশাল প্রজ্বালন করে গেছেন, যা থাকবে চির অম্লান। এটিই এই মহীয়সীর ৮০ বছরের মহাকাব্যিক জীবনের অসীম সার্থকতা। এমন জীবন, এমন গৌরবমাখা রাষ্ট্রীয় সম্মানের মৃত্যু কতজনইবা পান। আজ তার জানাজায় মানুষের ঢল নামবে। রেকর্ডভাঙা ঐতিহাসিক এক জানাজার সাক্ষী হবে বাংলাদেশ।
শেষকথা, আপসহীন বিদায়ের নক্ষত্র ‘জনতার অভিভাবক’ যেন জনগণের কাছেই থাকেন চিরকাল। দলমতনির্বিশেষে বেগম খালেদা জিয়াকে সবাই যেন শ্রদ্ধাভরে আজীবন স্মরণ করতে পারেন। তাকে শুধু কোনো দলের সম্পদ যেন মনে করা না হয়। অতীতে এমন নজির যারা সৃষ্টি করতে চেয়েছেন, তারা সবদিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ফলে খালেদা জিয়া সবার, কোনো দলের নয়-দেশের, সারা দেশের সব মানুষের।
লেখক : যুগ্মসম্পাদক, দৈনিক যুগান্তর

