রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা
ওসি সংযুক্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে ঊর্ধ্বতনরা
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুরের ঘটনায় ডিএমপির শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে ডিএমপির কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত (ক্লোজড) করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে হামলা, ভাঙচুরের সময় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি প্রমাণিত হলো। তবে এ ঘটনায় ডিএমপির সংশ্লিষ্ট জোনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেলেন।
সূত্র জানিয়েছে, ওসি ছাড়াও এসি (সহকারী পুলিশ কমিশনার), এডিসি (অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার) ও ডিসি (উপকমিশনার) কোনোভাবেই দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। জানতে চাইলে ডিএমপি (ঢাকা মহানগর পুলিশ) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. আকতার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রশাসনিক কারণে শাহ আলী থানার ওসিকে সংযুক্ত করা হয়েছে।’ ডিএমপির সংশ্লিষ্ট বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে জানা নেই।’
পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের একাংশের এক নেতা যুগান্তরকে বলেন, ‘মিরপুরে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের বাইরে কিছু করার ক্ষমতা পুলিশের নেই। বিষয়টি সিনিয়র স্যাররা জানেন। তাছাড়া শুধু ওসি কেন প্রত্যাহার হবে। ওসি দায়ী হলে ডিসি, এডিসি ও এসিও দায়ী।’ রোববার ডিএমপি সদর দপ্তরের আদেশে শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রত্যাহারের আদেশে বলা হয়েছে, নিরস্ত্র পুলিশ পরিদর্শক জাহাঙ্গীরকে ‘প্রশাসনিক কারণে’ প্রত্যাহার করে ডিএমপির সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলায় জড়িতদের মধ্যে রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। তবে প্রতিবেদনে কী উঠে এসেছে, এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানি যায়নি। তদন্ত কমিটির প্রধান ডিএমপির মিরপুর বিভাগের দারুসসালাম জোনের এডিসি সালেহ মুহম্মদ জাকারিয়া যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা শনিবার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।’ এ ঘটনায় কারা দায়ী-জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিবেদনটি অত্যন্ত গোপনীয়। এ বিষয়ে কিছু বলার সুযোগ নেই।’
এদিকে ধ্বংসস্তূপের সামনে রোববার দ্বিতীয় দিন দেওয়া হয়েছে চিকিৎসাসেবা। তবে যন্ত্রপাতি ও ওষুধের অভাবে সবাই চিকিৎসা নিতে পারেননি। রোববার স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির অবস্থা দেখতে আসেন অনেকে। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে এটি ধ্বংসে জড়িতদের গ্রেফতারের দাবি জানান। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ঢাকায় আমি যদি আমার বাড়িও ভাঙতে চাই এক্সকেভেটর দিয়ে, পুলিশের অনুমতি নিতে হয়, সিটি করপোরেশনের অনুমতি নিতে হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে সেটি নিশ্চিত করেছে-যারা মবতন্ত্র করবে, তারা যেন নিরাপদে মবতন্ত্র কায়েম করতে পারে-সেটাই নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রশাসন যদি এ ঘটনার দ্রুত বিচার ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তবে দেশবাসী মনে করবে, এর সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে সবাই অবগত এবং সবাই এটার ভাগ পাবেন।
রাড্ডা সেন্টার পরিদর্শন শেষে চিকিৎসক ও রাজনীতিক তাসনিম জারা বলেছেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ভেঙে দেওয়ার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তার প্রশ্ন, কয়েক ঘণ্টা ভাঙচুর চলার পরও পুলিশ কেন তা ঠেকাতে পারেনি? এমন পরিস্থিতি থাকলে মানুষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর কীভাবে আস্থা রাখবে? জারা বলেন, এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে রাড্ডা বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা সেন্টার গুঁড়িয়ে দেয় একদল দুর্বৃত্ত। হামলাকারীরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দুই নিরাপত্তাকর্মীকে বেঁধে মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, টিকা, টাকাসহ অন্যান্য মালপত্র লুট করে। কয়েক ঘণ্টা চলে ধ্বংসযজ্ঞ। হামলার সময় এক্সকেভেটর দিয়ে একটি পাকা, তিনটি আধা-পাকা ভবনসহ স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দিয়ে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নাম লেখা দুটি সাইনবোর্ড ও দুটি ব্যানার টানিয়ে দেয় হামলাকারীরা। পরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির পক্ষ থেকে শাহ আলী থানায় ২৫০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। শাহ আলী থানার ইনস্পেকটর (তদন্ত) রেজাউল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারে অভিযান চলমান।’
ধ্বংসস্তূপের সামনেই চিকিৎসাসেবা : এদিকে ধ্বংসস্তূপের সামনে বসেই কর্মীরা রোববার দ্বিতীয় দিন স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছেন। সকাল থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ৩৭ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয় আরও অন্তত ১৫ জনকে। স্বাভাবিকভাবে দিনে কেন্দ্রটি থেকে গড়ে ১২০-১৫০ জনকে সেবা দেওয়া হয়। এখন যন্ত্রপাতি নষ্ট করায় এবং পর্যাপ্ত ওষুধ না থাকায় সেবাদান ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেছেন, ‘আমাদের একটাই দাবি, যে বিলবোর্ডটি টাঙানো হয়েছিল, সরকার যেন সেটাকে ধরেই বিচার করে।’
