|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কথিত ‘বান্ধবী’ অ্যাডভোকেট তৌফিকা করিম তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে নিয়ে চাঁদাবাজির একটি চক্র গড়ে তুলেছিলেন। নানা কৌশলে তিনি শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তার চাঁদাবাজির কৌশল ছিল ভিন্ন। কখনো আইনি সংস্থা বা ল’ ফার্মের আড়ালে, আবার কখনো মানবাধিকার সংস্থা খুলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা চাঁদা নিয়েছেন। এর মধ্যে প্রেরণা ফাউন্ডেশন, ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ফাউন্ডেশন, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া গেছে। তাকে এ অপরাধে সহায়তা করতেন সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য।
এদিকে তৌফিকা ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ১১৪ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৬৫৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেনের তথ্য পেয়েছে সিআইডি। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তৌফিকা করিমের নিজ নামে ২৬টি অ্যাকাউন্টে থাকা ২৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা ফ্রিজ করা হয়েছে।
জুলাই বিপ্লবের পর তৌফিকা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। তিনি প্রথমে ভারত ও পরে কানাডায় ছেলের কাছে আশ্রয় নেন। তার এসব অপকর্মের অনেক সহযোগী এখনো দেশে বহাল তবিয়েত রয়েছেন বলে জানা গেছে। এই তালিকায় একটি ব্যাংকের সিইও রয়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তৌফিকা করিম অসহায় বন্দি এবং দরিদ্র ব্যক্তিদের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেওয়ার নামে ‘লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স টু হেল্পলেস প্রিজনার অ্যান্ড পারসনস’ (এলএএইচপি) নামে একটি মানবাধিকার সংস্থা গড়ে তোলে। সংস্থাটির ব্যানারে তিন বছরে ২৪ কোটি টাকার বেশি চাঁদা তোলা হয়েছে।
এছাড়া ‘সিরাজুল হক অ্যাসোসিয়েট’ নামে একটি ল’ ফার্ম খুলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ২১ কোটি টাকা চাঁদা নেয় তৌফিকার চক্রটি। এসব চাঁদার বৈধতা দিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আইনি সহায়তা প্রদানের নাম সর্বস্ব চুক্তি করা হয়। এ চক্রটি শুধু ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান থেকেই ১০ কোটি ৮১ লাখের বেশি টাকা নিয়েছে। ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের এক শীর্ষ কর্তাও ছিল চাঁদাবাজ চক্রে।
জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলে তৌফিকা করিমের বিষয়ে অনুসন্ধানে নামে সিআইডির ফাইনান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট। সিআইডির অনুসন্ধানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ টাকা অর্জনের তথ্য মেলায় গত ১১ জানুয়ারি ডিএমপির ভাটারা থানায় অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনে সিআইডির এসআই মো. মনিরুজ্জামান বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন-সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, তৌফিকা করিম, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের কান্ট্রি ম্যানেজার ও সিইও মো. কামরুজ্জামান, আনিসুল হকের পিএস মো. রাশেদুল কাউসার। মামলার এজাহারে তৌফিকা করিমের নিজস্ব ২৬ অ্যাকাউন্টে চাঁদাবাজির ২৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা ফ্রিজ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) মুহাম্মদ বাছির উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ‘অ্যাডভোকেট তৌফিকা করিমের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনে মামলার তদন্ত চলমান আছে। তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো ফ্রিজ করা হয়েছে।
মামলার এজাহার ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক মন্ত্রী হওয়ার পর তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী তৌফিকা করিম ও মো. রাশেদুল কাওসার ভূঞা জীবনকে ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) হিসাবে নিয়োগ দেন। বাংলাদেশে বিনা বিচারে আটকে থাকা অসহায় বন্দি এবং দরিদ্র ব্যক্তিদের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দিতে এলএএইচপি নামের একটি বেসরকারি সংস্থা গঠন করেন আনিসুল হক। ওই প্রতিষ্ঠানে তৌফিকা করিমকে চেয়ারম্যান, মো. রাশেদুল কাওসার ভূঞা জীবনকে সেক্রেটারি জেনারেল এবং আনিসুল হক নিজে ট্রেজারার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এলএএইচপি’র নামে সোনালী ব্যাংকের সুপ্রিমকোর্ট শাখার একটি অ্যাকাউন্টে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিতভাবে চাঁদার টাকা আদায় করা হতো। ২০১৫ সালের ১১ মার্চ থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ওই এলএএইচপি’র মাধ্যমে ২৪ কোটি ৫৩ লাখ ৬৯ হাজার টাকা চাঁদা আদায়ের তথ্য পেয়েছে সিআইডি।
জানা গেছে, চক্রটি চেকের মাধ্যমে ২০২২ সালের ৭ এপ্রিল আবু হোসেন খানের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ফিনফ্লিক্সিয়া থেকে ত্রিশ লাখ টাকা, ২০২১ সালের ২৫ মার্চ প্রেরণা ফাউন্ডেশন থেকে ত্রিশ লাখ, ২০১৬ সালের ১৮ এপ্রিল ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট প্রা. লি. থেকে দশ লাখ টাকা, ২০২১ সালের ১৬ মে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ফাউন্ডেশন থেকে ১৫ লাখ টাকা নেয়। একই বছরের ২৩ মার্চ দুটি চেকের মাধ্যমে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ফাউন্ডেশন থেকে আরও তিন কোটি টাকা নেয় চক্রটি। ‘এলএএইচপি’র কর্মচারী অঞ্জন কর বিভিন্ন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির থেকেও নগদ টাকা আনেন। ওইসব টাকা ‘এলএএইচপি’র চলতি হিসাবে জমা করেছে। এর মধ্যে ২০১৯ সালের ৩১ জুলাই ২৫ লাখ, ২০১৮ সালের ১৮ জুলাই ২ লাখ, ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই ৮ লাখ টাকা জমার তথ্য মিলেছে।
তৌফিকা করিম ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান থেকে প্রতিমাসে ১০ লাখ করে মোট ১০ কোটি ৮০ লাখ টাকা নিয়েছেন।
ব্যাংকের আইনি পরামর্শ ও লোন রিকভারির জন্য ‘সিরাজুল হক অ্যাসোসিয়েট’-এর সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের একটি চুক্তির মাধ্যমে এ টাকা নেন তিনি। চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তৌফিকা করিম ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের কান্ট্রি ম্যানেজার ও সিইও মো. কামরুজ্জামান।
চুক্তিনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের সঙ্গে অতীতে কোনো ল’ ফার্মের চুক্তির প্রয়োজন ছিল না এবং ‘সিরাজুল হক অ্যাসোসিয়েট’ ও তার সহযোগীরা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পালিয়ে যাওয়ার পরও কোনো ল’ ফার্মের সঙ্গে আইনি পরামর্শের জন্য নতুন চুক্তির প্রয়োজন হয়নি। সিআইডির অনুসন্ধান প্রতিবেদন সূত্রে আরও জানা যায়, মো. কামরুজ্জামান ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের এমডি হিসাবে ২০১৫ সালে যোগদান করেন। যোগদানের পর তিনি তৌফিকা করিমের ল’ ফার্ম ‘সিরাজুল হক অ্যাসোসিয়েটস’- এর সঙ্গে নামমাত্র চুক্তি করেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের কান্ট্রি ম্যানেজার ও সিইও মো. কামরুজ্জামান বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘লোন রিকভারির জন্য ল’ ফার্মের সঙ্গে এমন চুক্তির প্রয়োজন রয়েছে।’ ২০১৫ সালের ২৩ আগস্টের আগে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো ল’ ফার্মের চুক্তি ছিল না বলেও স্বীকার করেন তিনি।

