Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

দৃষ্টিপাত

কার্ল মার্কসের দর্শন-মেহনতি মানুষের মুক্তির পথ

Advertisement

অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী

অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কার্ল মার্কসের দর্শন-মেহনতি মানুষের মুক্তির পথ

Advertisement

দার্শনিক কার্ল মার্কস মেহনতি মানুষের মুক্তির পথনির্দেশনা দিয়েছিলেন বলেই তিনি আজ এত আলোচিত ও সমালোচিত।

জার্মান সমাজবিজ্ঞানী কার্ল মার্কস ১৮১৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী। তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তবে এগুলোর মধ্যে তার Capital (1867) গ্রন্থটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। তিনি তার কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় প্যারিস ও লন্ডন শহরে অতিবাহিত করেন। লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে তিনি দীর্ঘদিন গবেষণায় রত ছিলেন। মার্কস ও এঙ্গেলস রচিত আরেকটি ছোট পুস্তিকা Communist Manifesto (1848) সমধিক প্রসিদ্ধ ও আলোচিত, যা আন্দোলিত করেছে সমগ্র বিশ্বকে। আজকের পৃথিবীতে মার্কসীয় তত্ত্ব অনুসারীর সংখ্যা অগণিত।

মার্কসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলো ‘ক্যাপিটাল’। এ গ্রন্থে মার্কসের সমাজবাদী অর্থনৈতিক চিন্তাধারার মৌলিক বিষয়গুলোর উল্লেখ রয়েছে। এখানে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা, পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থা এবং তার সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। এ গ্রন্থে পুঁজিবাদের বিকাশের ধারা এবং পুঁজিবাদী শোষণের চিত্র তুলে ধরা হয় এবং তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতির কথা উল্লেখ করা হয়। পুঁজিবাদী সমাজের সমাজতান্ত্রিক সমাজে যুগান্তরের অনিবার্যতার কথাও এ গ্রন্থের একটি প্রধান উপজীব্য বিষয়। ‘ক্যাপিটাল’ মূলত অর্থনীতির গ্রন্থ হলেও এতে মার্কসের দার্শনিক চিন্তাধারাও স্থান পেয়েছে। মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ তত্ত্বের বিশ্লেষণও এখানে রয়েছে। মার্কস প্রথম জীবনে হেগেলের ভাববাদী দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হলেও পরে তিনি হেগেলীয় দর্শনের ভাববাদী প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হন। তারপর তিনি জার্মান বস্তুবাদী দার্শনিক ফয়ারবাখ দ্বারা প্রভাবিত হন এবং ক্রমশ একজন বস্তুবাদী দার্শনিক হিসাবে আবির্ভূত হন।

মার্কস মানব ইতিহাসের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যার ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেন। অর্থনৈতিক উৎপাদনকেই তিনি সমাজ পরিবর্তনের মূল উপাদান হিসাবে চিহ্নিত করেন। মানব ইতিহাসের সব ঘটনাবলির পশ্চাতে রয়েছে অর্থনৈতিক কারণ। সমাজের সব ঘটনার অর্থনৈতিক ব্যাখ্যাই মার্কসের কাছে প্রাধান্য লাভ করে। মার্কস উল্লেখ করেছেন, প্রতিটি সমাজের একটা মৌল অবকাঠামো (Basic Structure) রয়েছে এবং রয়েছে একটি অধিকাঠামো। সমাজের মৌলকাঠামো উৎপাদন সম্পর্ক এবং উৎপাদন শক্তি দ্বারা গঠিত। আর সব আইনগত, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং সব দর্শন ও চিন্তার প্রকৃতি দ্বারা গঠিত সমাজের অধিকাঠামো। অর্থাৎ এককথায় অর্থ-ব্যবস্থাকে মৌলকাঠামো এবং অন্যসব প্রতিষ্ঠান, ধর্ম, রাজনীতি, দর্শন ইত্যাদিকে বলা হয় অধিকাঠামো। মার্কসের মতে, মৌলকাঠামো পরিবর্তনের ফলে অধিকাঠামোতেও পরিবর্তন সংঘটিত হয়। সমাজের মৌলকাঠামো নির্ধারণ করে তার অধিকাঠামোর স্বরূপ। মার্কসের এ তত্ত্বকে সমালোচনা করে ম্যাকসওয়েবার এর বিপরীতে সমাজ পরিবর্তনের সম্পূর্ণ নতুন ব্যাখ্যা প্রদান করেন।

মার্কসের মতে, মানুষ তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা নির্বিশেষে কতগুলো নির্দিষ্ট সম্পর্কে আবদ্ধ হয়। অন্য কথায় বলা যায়, আমরা মানব ইতিহাসের গতি-প্রকৃতি, সমাজকাঠামো, উৎপাদন শক্তি এবং উৎপাদন সম্পর্ক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বুঝতে পারি, ব্যক্তি মানুষ তার পছন্দ-অপছন্দ নির্বিশেষে অনেক সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ থাকে এবং এসব অভিব্যক্তি সামাজিক সম্পর্ক সম্বন্ধে আমাদের চেতনা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া অনুধাবনে সাহায্য করে।

মানব ইতিহাসের অগ্রগতি অর্থাৎ মানবসমাজ বিকাশের কৌশল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মার্কস উৎপাদন শক্তি এবং উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সমাজ বিবর্তনের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে যখন বিদ্যমান উৎপাদন শক্তি বিকশিত হয়, তখন পুরোনো উৎপাদন সম্পর্ক তাকে ধরে রাখতে পারে না এবং তাকে অতিক্রম করে যায়। এ বিকশিত উৎপাদন শক্তি সমাজে পরিবর্তন আনয়ন করে এবং নতুন উৎপাদন সম্পর্ক রচনা করে। এভাবে উৎপাদন শক্তির পুনঃপুনঃ বিকাশ এবং অনুরূপভাবে নতুন নতুন উৎপাদন সম্পর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে মানবসমাজ পরিবর্তিত হয়ে থাকে। উৎপাদন শক্তি বলতে মূলত একটি সমাজের উৎপাদন ক্ষমতাকে বোঝায়; যেমন-বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান, প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি এবং শ্রমিকদের যৌথ শ্রম সংগঠন।

মার্কসের মতে, উৎপাদন সংগঠনে যেসব ব্যক্তি একই ধরনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় বা একই ধরনের ভূমিকা পালন করে, সেসব ব্যক্তির সমষ্টি হলো একটি শ্রেণি। উৎপাদনের উপায়ের মালিকানা এবং অমালিকানার ভিত্তিতে (On basis of ownership and non-ownership of means of production) প্রত্যেক সমাজে মার্কস দুটি মৌলিক শ্রেণির উদ্ভব লক্ষ করেন। এ দুই মৌলিক শ্রেণির মধ্যে শ্রেণিদ্বন্দ্ব সবসময় চলমান-কখনো তা দৃশ্যমান, কখনো অদৃশ্যমান। এক শ্রেণি কর্তৃক অন্য শ্রেণিকে শোষণের এ প্রক্রিয়াকে শ্রেণিশোষণ বলা হয়। মার্কসের দর্শনের এটাই মূল ভিত্তি এবং শ্রেণিসংগ্রামের মধ্য দিয়েই সমাজের পরিবর্তন হয়।

উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন শ্রেণি যে সম্পর্ক রচনা করে, তাকেই উৎপাদন সম্পর্ক বলা হয়। সমাজ বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে উৎপাদন শক্তি এবং উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্বে বিকশিত উৎপাদন শক্তি বিদ্যমান উৎপাদন সম্পর্ককে অতিক্রম করে যায় এবং মার্কসের মতে, সমাজে এভাবেই পরিবর্তন সংঘটিত হয়। উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের এ দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে সমাজে শ্রেণিসংগ্রামের সূচনা হয়। উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের এ দ্বন্দ্বকালীন সমাজ দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে যায়। একটি শ্রেণি পুরোনো উৎপাদন সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চায়; যারা উৎপাদন শক্তির উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পক্ষান্তরে অন্য শ্রেণিটি প্রগতিশীল এবং নতুন উৎপাদন সম্পর্কের প্রতিনিধি হিসাবে উৎপাদন শক্তির সর্বাধিক বিকাশের বাধা না হয়ে বরং এর উন্নয়ন ঘটাতে চায়।

আমরা পুঁজিবাদী সমাজের বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই, বুর্জোয়ারা (পুঁজিপতি শ্রেণি) উৎপাদনের উপায়ের ব্যক্তি মালিকানার সঙ্গে সম্পৃক্ত। অন্যদিকে সর্বহারা শ্রেণি একটি নতুন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, যা পুঁজিবাদী সংগঠন থেকে অধিকতর প্রগতিশীল। এ নতুন সামাজিক সংগঠন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় উৎপাদন শক্তির আরও উন্নয়ন ঘটাবে এবং এটা প্রগতিশীল ইতিহাসের যাত্রাপথের একটি স্তর।

এ ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায় মার্কস শুধু অবকাঠামো (মৌলকাঠামো) ও অধিকাঠামো (উপরি কাঠামো) পৃথক করেননি; সচেতনতা হতে সামাজিক বাস্তবতাকে পৃথক করেছেন। মানুষের সচেতনতাই বাস্তবতা নির্দেশ করে না। পক্ষান্তরে সামাজিক বাস্তবতাই মানুষকে সচেতন করে তোলে। এটি এমন একটি প্রত্যয়, যার মাধ্যমে মানুষের চিন্তাধারার বিশ্লেষণ করা হয় সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তিতে।

মার্কস মানব ইতিহাসের স্তরগুলো বিভিন্ন উৎপাদন পদ্ধতি দ্বারা চিহ্নিত করেছেন। আগস্ট কোঁত যেমন চিন্তাধারার ভিত্তিতে মানব বিবর্তনের কালগুলোকে বিভক্ত করেছিলেন, মার্কসও তেমনি মানব ইতিহাসের স্তরকে বিভক্ত করেছেন অর্থনৈতিক যুগভেদের মাধ্যমে এবং তিনি চারটি উৎপাদন পদ্ধতি নির্ধারণ করেন; যথা-(ক) আদিম উৎপাদন পদ্ধতি (Ancient mode of production); (খ) সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতি (Feudal mode of production); (গ) পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতি (Capitalist mode of production); (ঘ) এশিয়াটিক উৎপাদন পদ্ধতি (Asiatic mode of production)।

এ চারটি উৎপাদন পদ্ধতিকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। একভাগে আদিম উৎপাদন পদ্ধতি, সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতি ও পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতি; যেখানে পাশ্চাত্যের ইতিহাসকে তুলে ধরা হয়েছে। এ তিনটি স্তরেই মানুষও কাজের বৈশিষ্ট্যের দ্বারা নির্ধারিত।

আদিম উৎপাদন পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দাসপ্রথা। সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভূমিদাসপ্রথা এবং পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মজুরি শ্রমপ্রথা। পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতি হচ্ছে শোষণের চরম পর্যায়। এর পরবর্তী সময়ে আসবে সমাজতান্ত্রিক সমাজ, যেখানে সামাজিক শোষণ ও নিপীড়ন থাকবে না। যেখানে শ্রমিকরাও উৎপাদন উপায়ের মালিকানা পাবে এবং তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকবে।

অন্যদিকে এশিয়াটিক উৎপাদন পদ্ধতি পাশ্চাত্যের ইতিহাসকে তুলে ধরে না। এখানেই মার্কসীয় বিশ্লেষণকারীদের মধ্যে বিতর্ক দেখা দিয়েছে, ঐতিহাসিক ঐক্য ও অনৈক্যের ব্যাপারে। এশিয়াটিক উৎপাদন পদ্ধতিতে দাস, ভূমিদাস ও মজুর শ্রকিরা কখনো পাশ্চাত্যের মতো শ্রেণি গড়ে তুলতে পারেনি এবং তারা সবাই ছিলেন রাষ্ট্রের অধীনস্থ। যদি এশিয়াটিক উৎপাদন পদ্ধতির ব্যাখ্যা ঠিক হয়, তাহলে সামাজিক কাঠামোতে পাশ্চাত্যের মতো শ্রেণি দ্বন্দ্বের বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাবে না। এশিয়াটিক উৎপাদন পদ্ধতিতে শ্রেণিসংগ্রামের রূপ কী ছিল, সে সম্পর্কে মার্কস কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করেননি।

মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের তত্ত্বই তার সমগ্র দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের সারকথা হলো-সব বস্তু অথবা প্রপঞ্চের বিকাশ হয় দ্বন্দ্বের কারণে। সমাজ পরিবর্তনের মূল কারণও দ্বন্দ্ব। পুরোনো অবস্থার (নয় বা Thesis) সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলে তার বিপরীত অবস্থার (প্রতিনয় বা Antithesis) এবং এরই ফলে একটি সম্পূর্ণ নতুন অবস্থার সৃষ্টি হয় (সমন্বয় বা Synthesis)। এ Synthesis কালক্রমে পুরোনো অবস্থায় পরিণত হয় এবং তার বিপরীত অবস্থার সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। দ্বন্দ্বের ফলস্বরূপ পুনরায় একটি Synthesis সৃষ্টি হয়। এভাবে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি, বস্তু এবং সমাজের উৎপত্তি, বিকাশ ও পরিবর্তন ঘটে। এটাই হলো মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের তত্ত্ব।

মার্কসের অপর একটি প্রধান তত্ত্ব তার শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্ব। সমগ্র মানব ইতিহাসকে তিনি শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস বলে আখ্যায়িত করেন। তার মতে, মানবসমাজ দুটি বিবদমান শ্রেণিতে বিভক্ত। একটি শ্রেণি উৎপাদন যন্ত্র তথা উৎপাদন উপায়ের মালিক এবং অন্য শ্রেণি উৎপাদন উপায়ের মালিকানা থেকে বঞ্চিত। মার্কস উল্লেখ করেন, সমাজ কখনো মুক্ত মানুষ ও ক্রীতদাস, কখনো অভিজাত এবং সাধারণ মানুষ, আবার কখনো ভূস্বামী ও ভূমিদাস এবং কখনোবা গিল্ড মাস্টার ও কারিগর-এককথায় নিপীড়িত ও নিপীড়ক এ দুশ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজকে তিনি বুর্জোয়া বা পুঁজিপতি এবং সর্বহারা শ্রেণিতে বিভক্ত দেখতে পেয়েছেন। মার্কস মনে করেন, আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজে পুঁজিপতি শ্রেণি কর্তৃক শ্রমিক শ্রেণিকে অত্যধিক শোষণের ফলে এ সমাজে শ্রেণিসংগ্রাম তীব্রতর হবে। এ অবস্থায় সর্বহারা শ্রেণি এক সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিপ্লব সংঘটিত করে বুর্জোয়া রাষ্ট্রের পতন ঘটাবে এবং শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটিয়ে সর্বহারার একনায়কত্ব (Dictatorship of proletariat) কায়েম করবে। পুঁজিবাদী সমাজের গর্ভেই সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্ক পরিপক্ব রূপ লাভ করবে বলে মার্কস বিশ্বাস করেন। যেমন-পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল সামন্ত সমাজের গর্ভে এবং তার মতে, তখন বিপ্লব সংঘটিত হয়। মার্কস মনে করেন, বিপ্লব কোনো রাজনৈতিক দুর্ঘটনা নয়, বরং ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তারই অভিব্যক্তি।

মার্কসের শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হলো তার উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব (Theory of surpolus value)। শ্রমিক যা উৎপাদন করে তার যথার্থ মূল্য সে লাভ করে না। শ্রমিকের শ্রমে উৎপাদিত দ্রব্যমূল্যের এক বিরাট অংশ পুঁজিপতি শ্রেণি তথা উৎপাদন উপায়ের মালিক শ্রেণি আত্মসাৎ করে। মার্কসের মতে, শ্রমই যেহেতু উৎপাদনের একমাত্র উপাদান; অতএব, উৎপাদিত দ্রব্যের সম্পূর্ণ মূল্য শ্রমিকের প্রাপ্য। অথচ প্রকৃতপক্ষে তার শ্রম দ্বারা উৎপন্ন দ্রব্যের প্রকৃত মূল্যের সামান্য অংশই সে পেয়ে থাকে। শ্রমিক যা উৎপাদন করে, তার সর্বমোট মূল্য আর যে মূল্য এ উৎপাদনের জন্য সে লাভ করে-এ দুয়ের ব্যবধানকেই বলা হয় উদ্বৃত্ত মূল্য। মালিক শ্রেণি কর্তৃক এ উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ শ্রেণি-শোষণের একটি রূপ। তাই মার্কসের শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্ব উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। উদ্বৃত্ত মূল্য পুঁজিপতি শ্রেণি কর্তৃক আত্মসাতের ফলে শ্রমিক শ্রেণি তার শ্রমে অর্জিত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় ক্রমশ উৎপাদন এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বলে মার্কস উল্লেখ করেছেন।

মার্কসের আরেকটি অন্যতম সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক প্রত্যয় হলো বিচ্ছিন্নতাবোধ (Alienation)। এটি একটি সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, যে অবস্থায় ব্যক্তি মানুষ নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন মনে করে। এ অবস্থার সৃষ্টি হয় পুঁজিবাদী সমাজে। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রেণি-শোষণ চরম আকার ধারণ করে। এ উৎপাদন ব্যবস্থায় পুঁজিপতি আরও অধিক মুনাফার জন্য অধিক বিনিয়োগ করতে থাকে এবং অধিকহারে শ্রমিকের শ্রম ক্রয় করতে থাকে। এর ফলে শ্রমিক তার শ্রম দিয়ে আরও বেশি বেশি উৎপাদন করতে থাকে। এভাবে উৎপাদন যতই বাড়তে থাকে, পুঁজিপতি শ্রেণি ততই মুনাফা অর্জন করতে থাকে, আর শ্রমিক শ্রেণি ততই নিঃস্ব হতে থাকে। এ অবস্থায় শ্রমিকের শ্রমে উৎপাদিত বস্তু‘ শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। অর্থাৎ যে বস্তু সে উৎপাদন করে, সে বস্তু সে ক্রয় করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় প্রথমে শ্রমিক তার উৎপাদিত বস্তু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়; তারপর সে উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়। কারণ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে তার কোনো স্বার্থ রক্ষা হয় না এবং উৎসাহ থাকে না। সে অনেকটা মেশিনে রূপান্তরিত হয়। এভাবে তার উৎপাদিত বস্তু এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সে আর তার দৈহিক ও মানসিক শক্তির বিকাশ ঘটাতে পারে না এবং এ শোষণ প্রক্রিয়ায় একসময় সে নিজের স্বাধীন অস্তিত্ব অনুভব করতে পারে না। ফলে ধীরে ধীরে শ্রমিক তার নিজ থেকে এবং তার সমাজ থেকেও বিচ্ছিন্ন বোধ করে। এটাই মার্কসের বিচ্ছিন্নতাবোধ তত্ত্বের সারকথা।

পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় শ্রেণি-শোষণের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে-মার্কস একথা বারবার উল্লেখ করেছেন এবং পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় রূপান্তরের ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। মার্কসের মতে, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের পর ব্যক্তিগত মালিকানার বিলোপ সাধন করা হবে। কিন্তু সেখানে শ্রেণি-শোষণের সম্পূর্ণ অবসান হবে না। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ক্রমশ সাম্যবাদের দিকে অগ্রসর হতে থাকবে এবং শুধু সাম্যবাদী সমাজেই শ্রেণি এবং শ্রেণি-শোষণের অবসান হবে। তার মতে, সাম্যবাদী ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের অবলুপ্তি ঘটবে (State will wither away). এভাবে দার্শনিক মার্কস দুনিয়ার সব শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির পথনির্দেশনা দিয়েছিলেন।

ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী : প্রফেসর ইমেরিটাস; সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সাবেক রাষ্ট্রদূত

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

দৃষ্টিপাত সংকট মোকাবিলায় জাগতিক কৃচ্ছ্রসাধন জরুরি

সংকট মোকাবিলায় জাগতিক কৃচ্ছ্রসাধন জরুরি

প্রশ্ন যখন সরকারের ‘অস্তিত্ব’

প্রশ্ন যখন সরকারের ‘অস্তিত্ব’

হৃদরোগকে অবহেলা নয়

হৃদরোগকে অবহেলা নয়

শিক্ষাঙ্গনে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি

শিক্ষাঙ্গনে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম