শিক্ষাঙ্গনে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি
Advertisement
মহিউদ্দিন আহমদ
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন একসময় ছিল স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সংগ্রামের উর্বর ভূমি। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-সব ক্ষেত্রেই ছাত্রসমাজ ছিল অগ্রণী; কিন্তু সময়ের প্রবাহে এ শিক্ষাঙ্গনেই জন্ম নিয়েছে এক বিপরীতধর্মী সংস্কৃতি: লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি; যেখানে মতাদর্শের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ক্ষমতার ছায়ায় অবস্থান, সুবিধা লাভের প্রতিযোগিতা এবং দলীয় আনুগত্যের বিনিময়ে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা সুযোগ অর্জন।
এ লেজুড়বৃত্তি শুধু ছাত্ররাজনীতির চরিত্রকেই বদলে দেয়নি; বরং শিক্ষাঙ্গনের একাডেমিক স্বাধীনতা, নৈতিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। গবেষণা, সাহিত্য, ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বের আলোকে আমরা দেখব, লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি কীভাবে গড়ে উঠল, কেন তা টিকে আছে এবং এর সামাজিক-রাজনৈতিক পরিণতি কী।
লেজুড়বৃত্তি বলতে বোঝায় ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রদর্শন; যেখানে নৈতিকতা, যুক্তি বা স্বাধীন চিন্তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সুবিধা লাভের আকাঙ্ক্ষা। রাজনৈতিক সমাজতত্ত্বে এটি প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট সম্পর্ক, ব্রোকারেজ রাজনীতি এবং পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে এ লেজুড়বৃত্তি গড়ে উঠেছে তিনটি প্রধান স্তরে : ১. দলীয় ছাত্র সংগঠন-যেখানে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন আবাসিক হল, ভর্তি, কোটা, চাকরি, এমনকি পরীক্ষার পরিবেশ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে। ২. প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ-যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দলীয় আনুগত্য প্রভাব ফেলে। ৩. সামাজিক-সাংস্কৃতিক চাপ-যেখানে ছাত্রদের নিরাপত্তা, আবাসন, ক্লাসে উপস্থিতি বা সংগঠনে অংশগ্রহণ দলীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে।
এ কাঠামোকে সমর্থন করে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রাজনৈতিকীকরণ নিয়ে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এমন গবেষণা পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয়েছে, একাডেমিক স্বাধীনতা শর্তাধীন, সীমাবদ্ধ ও পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর অবস্থায় রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধীরে ধীরে দলীয় নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, বিশেষ করে যখন সংশ্লিষ্ট দল রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকে। এতে শিক্ষাঙ্গন হয়ে ওঠে রাজনৈতিক সংঘর্ষের ক্ষেত্র, যা বহু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটিয়েছে। ১৯৭৪ থেকে আজ পর্যন্ত ক্যাম্পাসে কয়েক হাজার ছাত্র হতাহত হয়েছেন। এ সহিংসতার ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, লেজুড়বৃত্তি শুধু মতাদর্শগত নয়; এটি ক্ষমতার কাঠামোকে ধরে রাখার একটি কৌশল।
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবাসিক হল হলো ক্ষমতার কেন্দ্র। দলীয় ছাত্র সংগঠন হলের কক্ষ বরাদ্দ, খাবারের মেস, নিরাপত্তা, এমনকি রাতের চলাফেরা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে। এটি গবেষণায় চিহ্নিত হয়েছে, ‘হলভিত্তিক পক্ষপাত, নজরদারি ও দমন’ হিসাবে।
শিক্ষক নিয়োগ, বিভাগীয় সিদ্ধান্ত, গবেষণা তহবিল-সব ক্ষেত্রেই দলীয় আনুগত্য প্রভাব ফেলে। ফলে মেধা নয়, বরং আনুগত্যই হয়ে ওঠে সাফল্যের চাবিকাঠি। গবেষণা বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একাডেমিক স্বাধীনতা এখন রাজনৈতিক কাঠামোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
বিভিন্ন সময়ের হত্যাকাণ্ড-আবরার ফাহাদ, সাবেকুন নাহার সনি, মাইনুল হাসান রাজু-প্রমাণ করে, দলীয় পরিচয় শিক্ষাঙ্গনে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসন অনেক সময় দলীয় ছাত্র সংগঠনের প্রতি নীরব থাকে বা পরোক্ষ সমর্থন দেয়। ফলে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি আরও শক্তিশালী হয়।
লেজুড়বৃত্তির সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। যেখানে মেধা নয়, আনুগত্যই সাফল্যের মানদণ্ড-সেখানে গবেষণা, সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষাঙ্গন গণতন্ত্রের জন্মভূমি। সেখানে লেজুড়বৃত্তি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে দুর্বল করে এবং রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে অন্ধ আনুগত্যের সংস্কৃতি তৈরি করে। যুবসমাজ রাজনৈতিক পরিচয়ের সংকটে পড়ে। ছাত্ররা রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তোলে ভয়, সুবিধা ও দলীয় চাপের মধ্যে থেকে, যা তাদের নাগরিকত্বের পরিসর সংকুচিত করে। যখন দলীয় পরিচয় নিরাপত্তা নির্ধারণ করে, তখন সহিংসতা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অস্ত্র। এটি শিক্ষাঙ্গনকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি একটি গভীর ও কাঠামোগত সমস্যা। এটি শুধু ছাত্ররাজনীতিকে নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচারকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তবু আশা জাগে-যুবসমাজের নতুন আন্দোলন, একাডেমিক গবেষণার বিস্তার এবং গণমাধ্যমের সাহসী ভূমিকা প্রমাণ করতে পারবে যে, লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি অজেয় নয়। প্রয়োজন শুধু কাঠামোগত সংস্কার, নৈতিক নেতৃত্ব এবং স্বাধীন চিন্তার চর্চা। বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন আবারও হতে পারে মুক্তচিন্তার কেন্দ্র-যদি লেজুড়বৃত্তির রাজনীতিকে সাহসের সঙ্গে প্রতিরোধ করা যায়।
বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন-যে ভূমি একদিন ছিল চিন্তার স্বাধীনতার উন্মুক্ত আকাশ; যেখানে তরুণরা স্বপ্ন দেখত মুক্তির, ন্যায়বিচারের, মানবিকতার-আজ সেই আকাশে যেন অদৃশ্য এক ছায়া নেমে এসেছে। ছায়াটি জাতীয় রাজনীতির; তার দীর্ঘ হাত ছাত্র সংসদের দরজায় এসে ঠেকেছে, আর তরুণদের কণ্ঠে স্বাধীনতার সুরের বদলে শোনা যায় দলীয় আনুগত্যের অনুরণন।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন-যা হওয়া উচিত ছিল শিক্ষাঙ্গনের নিজস্ব গণতন্ত্রের উৎসব; যেখানে ছাত্ররা নিজেদের প্রতিনিধি বেছে নেবে নিজেদের প্রয়োজন, নিজেদের স্বপ্নের ভিত্তিতে-সেই নির্বাচনের ওপর আজ ভর করেছে জাতীয় রাজনীতির ভারী, অচল, অনমনীয় কাঠামো। যেন দূরের কোনো রাজধানী থেকে অদৃশ্য সুতায় বাঁধা থাকে ক্যাম্পাসের প্রতিটি ব্যালটবাক্স, প্রতিটি পোস্টার, প্রতিটি স্লোগান।
জাতীয় রাজনীতির এ অনুপ্রবেশ শিক্ষাঙ্গনের তরুণ মনকে করে তোলে দ্বিধাগ্রস্ত। তারা ভাবতে শেখে-‘আমি কী চাই’ নয়, ‘উপরের লোকেরা কী চায়?’ তাদের স্বপ্নের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় দলীয় রং, দলীয় ভাষা, দলীয় শৃঙ্খলা। যে বয়সে স্বাধীন চিন্তা হওয়া উচিত সবচেয়ে উজ্জ্বল, সবচেয়ে নির্মল-সেই বয়সেই তারা শিখে যায় কীভাবে আনুগত্যের বিনিময়ে সুবিধা পাওয়া যায়, কীভাবে নীরবতার বিনিময়ে নিরাপত্তা পাওয়া যায়।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়ে উঠেছে একটি প্রতীকী যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে তরুণরা লড়াই করে নিজেদের জন্য নয়, বরং সেই শক্তির জন্য, যার ছায়া তাদের ওপর নেমে আসে রাজনৈতিক আকাশের দূরতম প্রান্ত থেকে।
এ অনুপ্রবেশের কুফল গভীর। প্রথমত, মেধার ক্ষয়-যেখানে নেতৃত্বের মানদণ্ড আর যোগ্যতা নয়, বরং দলীয় পরিচয়। দ্বিতীয়ত, সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ-যেখানে মতের ভিন্নতা আর বিতর্ক নয়, বরং সংঘর্ষের কারণ। তৃতীয়ত, গণতান্ত্রিক চর্চার অবক্ষয়-যেখানে নির্বাচন আর অংশগ্রহণ শিক্ষার অংশ নয়, বরং ক্ষমতার অনুশীলন। চতুর্থত, তরুণদের রাজনৈতিক পরিচয়ের সংকোচন-যেখানে তারা নাগরিক নয়, বরং কোনো দলের কর্মী।
এভাবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন জাতীয় রাজনীতির প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে-একটি আয়না, যেখানে আমরা দেখি ক্ষমতার লোভ, আনুগত্যের প্রতিযোগিতা, আর স্বাধীনতার সংকোচন; কিন্তু শিক্ষাঙ্গন তো হওয়া উচিত এ আয়নার বিপরীত দিক-যেখানে তরুণরা শিখবে কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে মতের ভিন্নতা গ্রহণ করতে হয়, কীভাবে নেতৃত্ব মানে সেবা, দায়িত্ব, মানবিকতার আকাঙ্ক্ষা জাগাতে হয়।
তাই আজ প্রয়োজন ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পুনর্বিন্যাস-জাতীয় রাজনীতির ছায়া থেকে মুক্ত হয়ে শিক্ষাঙ্গনের নিজস্ব আলোয় ফিরে আসা। যেখানে নির্বাচন হবে স্বপ্নের, যুক্তির, মানবিকতার প্রতিযোগিতা; যেখানে তরুণরা শিখবে কীভাবে গণতন্ত্রের বীজ বপন করতে হয় নিজেদের হৃদয়ে। বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন আবারও হতে পারে স্বাধীন চিন্তার উন্মুক্ত আকাশ-যদি আমরা সাহস করে জাতীয় রাজনীতির ছায়া সরিয়ে তরুণদের হাতে তুলে দিতে পারি তাদের নিজস্ব ভবিষ্যৎ।
ছাত্র সংসদের নির্বাচনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র প্রতিনিধিত্ব হবে সরাসরি ছাত্রদের ভোটে। তবে সেটি হতে পারে একটি পার্লামেন্টারি পদ্ধতির মতো। ধরা যাক, প্রত্যেক বিভাগের প্রত্যেক ক্লাস থেকে একজন ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হলেন। এভাবে সারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব নির্বাচিত ক্লাস-প্রতিনিধি একটি পার্লামেন্ট গঠন করলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, ক্রীড়া সম্পাদক ইত্যাদি পদে নিয়োগ দলের। আমরা তো আমাদের জাতীয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদে কাউকে ভোট দিই না। তিনি প্রধানমন্ত্রী হন এমপিদের ভোটে।
দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় বিবেচনা করা দরকার। যারা নিয়মিত ছাত্র নন, তারা ভোটে দাঁড়াতে পারবেন না। এক সেমিস্টারে বা ক্লাসে ফেল করে বা পরীক্ষা না দিয়ে ছাত্রত্ব টিকিয়ে রেখে আজীবন রাজনীতি করার খোয়াব একসময় অনেকের মধ্যে দেখেছি। কোনো গুরুতর কারণে একই সেমিস্টারে বা ক্লাসে থেকে যাওয়ার জন্য আমি তাদের ছাত্রত্ব বাতিল করতে বলছি না। আমি বলছি, শুধু নিয়মিত ছাত্ররাই নির্বাচিত প্রতিনিধি হওয়ার যোগ্যতা রাখবেন। তাহলে ছাত্র সংসদ হবে নিয়মিত ছাত্র ও মেধাবীদের সংসদ। সেখানে আদুভাইদের জায়গা হবে না।
জাতীয় রাজনীতিতেও পরিবর্তন আনা দরকার। রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন হিসাবে ছাত্র সংগঠন চালানো পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। এটি খুব সহজ হবে না। আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতাদের সিংহভাগের সন্তানরা ছাত্ররাজনীতি করে না। তারা দেশে-বিদেশে পড়াশোনা করে। এসব নেতা নিজের সন্তানকে নিরাপদে রেখে অন্যের সন্তানকে দিয়ে জিন্দাবাদ-মুর্দাবাদের রাজনীতি করায়। এ কেমন প্রতারণা!
মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক
