Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

ফ্রান্সের অভিবাসন নীতি এবং দ্বিপক্ষীয় সমীকরণ

Advertisement

Icon

হাসান ইলিয়াস তানিম

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ফ্রান্সের অভিবাসন নীতি এবং দ্বিপক্ষীয় সমীকরণ

Advertisement

ফ্রান্সের রাজনীতি আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। ২০২৭ সালে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে ফরাসি রাজনীতির মূলস্রোত থেকে প্রান্তিক ডানপন্থি সব শিবিরেই এখন একক এবং সবচেয়ে জোরালো আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে অভিবাসন। কয়েক বছর ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতে অভিবাসন একটি সংবেদনশীল ও রূপান্তরকামী ইস্যু হয়ে উঠেছে। সীমান্ত সুরক্ষা শিথিল থাকা বা বহুত্ববাদী উদার নীতির দিন শেষ করে ফ্রান্স এখন কঠোর জাতীয় সুরক্ষাবাদ ও শৃঙ্খলার যুগে প্রবেশ করছে। আর এই পুরো রাজনৈতিক বয়ানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মারিন লোপেনের নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি দল ন্যাশনাল র‌্যালি বা আরএন। ফরাসি নির্বাচনি ময়দানে এখন মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের কড়া থেকে কড়া উপায় নিয়ে। একপক্ষ বলছে অভিবাসনকে কঠোর আইনি কাঠামোর মধ্যে নামিয়ে আনতে হবে, অন্যপক্ষ চাচ্ছে অভিবাসীদের সামাজিক সুযোগ সুবিধা ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা বা কল্যাণমূলক সুবিধাগুলো একপ্রকার বন্ধ বা সীমিত করে দিতে। আবার মারিন লোপেনের দল আরও এক ধাপ এগিয়ে অপরাধী অভিবাসীদের দ্রুত নিজ দেশে ডিপোর্ট করা এবং অভিবাসনপ্রবাহকে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার কথা জোরালোভাবে প্রচার করছে।

ইউরোপের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ফরাসি গবেষণা প্রতিষ্ঠান টলুনা হ্যারিস ইন্টারঅ্যাক্টিভ এবং আইফপ প্রকাশিত জনমত জরিপগুলো এক চাঞ্চল্যকর চিত্র তুলে ধরেছে। জরিপ অনুযায়ী, ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডে মারিন লোপেন বা তার দলের পক্ষে ৩৩ থেকে ৩৬ শতাংশ ভোটার সমর্থন করেছেন। ক্লাস্টার সেভেনটিন বা অন্যান্য রাজনৈতিক গবেষণাও ইঙ্গিত দিচ্ছে, ঐতিহ্যগত দলগুলোর গ্রহণযোগ্যতা কমায় মারিন লোপেন বা কট্টর ডানপন্থি শিবির বর্তমানে যে কোনো প্রতিপক্ষের তুলনায় শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ফরাসি রাজনৈতিক অঙ্গনে বর্তমানে অভিবাসন ও কড়া নিরাপত্তার পক্ষে সবচেয়ে সোচ্চার রয়েছে মারিন লোপেন এবং জর্ডান বারদেলার ন্যাশনাল র‌্যালি। অন্যদিকে, এর বিপরীতে বামপন্থি দল লা ফ্রান্স ইনবাউড বা এলএফআই নেতা জ্যঁ ল্যঁ মেলশোঁর নেতৃত্বাধীন শিবির অভিবাসীদের পক্ষে তুলনামূলক নমনীয় ও সামাজিক অধিকারের কথা বললেও, মধ্যপন্থি রেনেসাঁ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী এদুয়ার ফিলিপের নেতৃত্বাধীন মধ্য ডানপন্থিরা অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার পক্ষে কড়া আইন প্রণয়নের পক্ষপাতী। তবে কট্টর ডানপন্থিদের অভিবাসনবিরোধী অবস্থান সমাজের সব মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

তবে মারিন লোপেন বা কট্টর ডানপন্থিদের এই নির্বাচনি প্রচারণার উত্তাপের মাঝেও প্রবাসীদের জন্য আশার অনেক বড় এবং শক্ত আইনি সুরক্ষা রয়েছে। প্রথমত, ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতির হাতে সব ক্ষমতা থাকে না; ফরাসি শাসনব্যবস্থায় ভারসাম্য ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ রয়েছে। যারা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন বা আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আওতায় রয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কনভেনশন এবং কঠোর আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য। চাইলেই কোনো সরকার রাতারাতি সেই আন্তর্জাতিক চুক্তি বা বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করতে পারে না। দ্বিতীয়ত, ফ্রান্সের স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, সাংবিধানিক আদালত এবং শক্তিশালী মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আইনি মারপ্যাঁচ ও নজরদারি খুবই প্রখর। ডানপন্থি দলগুলো চাইলেও কঠোরতর আইন বা অভিবাসনবিরোধী বিল পার্লামেন্টে এককভাবে পাশ করাতে পারবে না কিংবা পাশ হলেও তা ফরাসি আদালতের সাংবিধানিক পর্যালোচনায় আটকে যাবে। আইনের গ্যাঁড়াকলে পড়ে তাদের বহু উগ্র ইচ্ছা ও নীতি পথেই থমকে দাঁড়াবে। ফ্রান্সের আইনি কাঠামো এবং বিভিন্ন সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠনের জোরালো অবস্থানের কারণে ঢালাওভাবে বা ইচ্ছামতো সব অভিবাসীর বিরুদ্ধে আইনবহির্ভূত বা অমানবিক ব্যবস্থা নেওয়া অসম্ভব। আইনসিদ্ধ পন্থায় লড়াই করলে অভিবাসীদের অধিকার খর্ব করা অত সহজ নয়।

এই অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাইরেও বৈদেশিক সম্পর্ক এবং বড় ধরনের ভূরাজনীতির মারপ্যাঁচ ফ্রান্সের নীতি নির্ধারণে খুবই শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক সময়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য ফ্রান্সের কাছ থেকে এয়ারবাস কেনার আলোচনা এবং পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি থেকেও বিমান ক্রয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে কূটনৈতিক মহলে বেশ আলোচনা চলছে। এ প্রসঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ মার্ক সেরে শারলে সম্প্রতি ডিপ্লোমেটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ বা ডিক্যাব আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, ইউরোপের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব ও সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এয়ারবাস কেনার বিষয়টি একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরীক্ষা। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি নিয়ে ফ্রান্স বা ইউরোপ বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন নয়, কারণ তারা কোনো কিছু জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার যেখানে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রায় আটচল্লিশ শতাংশই ইউরোপীয় বাজারে যায় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যায় মাত্র সতেরো শতাংশ (যা প্রায় তিনগুণ কম), তখন অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ আলোচনার ভবিষ্যৎ সুদৃঢ় রাখতে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। ফরাসি রাষ্ট্রদূত আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সম্পূর্ণ কারিগরি ও ব্যবসায়িক যৌক্তিকতার ভিত্তিতেই এয়ারবাসকে পছন্দ করেছিল এবং এ বিষয়ে আলোচনা এখনো সঠিক পথেই এগোচ্ছে। বাণিজ্য ও ভূরাজনীতির এই সূক্ষ্ম সমীকরণগুলো দিনশেষে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার গতিপ্রকৃতি এবং পরোক্ষভাবে প্রবাসী সাধারণ মানুষের ভাগ্য ও নিরাপত্তার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে।

এই সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক এবং আইনি বাস্তবতার সরাসরি আঁচ গিয়ে পড়বে ফ্রান্সে বসবাসরত দক্ষিণ এশীয় প্রবাসীদের ওপর, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রায় এক লাখ বিশ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি। প্যারিসসহ ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ বিভিন্ন ধাপে জীবন কাটাচ্ছেন, কেউ দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর নথিভুক্ত, কেউ বা অনথিভুক্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। পরিবার পরিজন নিয়ে যারা দীর্ঘমেয়াদি থিতু হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের জন্য ডানপন্থিদের উত্থান একধরনের উদ্বেগের হলেও আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনি সুরক্ষা তাদের বড় ভরসা। কট্টর জাতীয়তাবাদী পরিবেশের কিছু প্রভাব সমাজে পড়লেও সাধারণ খেটে খাওয়া প্রবাসীরা তাদের শ্রম ও মেধার জোরে ফরাসি অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে নিজেদের অপরিহার্য করে তুলেছেন। আর প্রবাসীরা বৈধ বা অবৈধ যেভাবেই থাকুন না কেন, তাদের পাঠানো কষ্টের উপার্জিত রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক বিশাল ভূমিকা রাখছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই রেমিট্যান্সের অবদান অনস্বীকার্য।

এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা অত্যন্ত জোরালো করা জরুরি। ফ্রান্স এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, শ্রমবাজারের সুরক্ষা এবং নিয়মিতকরণের প্রক্রিয়াকে টিকিয়ে রাখতে ঢাকা ও প্যারিসের মধ্যকার কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও উচ্চ পর্যায়ে নিতে হবে। এয়ারবাস ও বাণিজ্য কূটনীতির সঠিক সুরাহা করে ইউরোপের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক বজায় রাখা আবশ্যক, যাতে যে কোনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে। ফ্রান্সের ২০২৭ সালের নির্বাচন কেবল ফরাসিদের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি পুরো ইউরোপের ভবিষ্যৎ অভিবাসন নীতির দিকনির্দেশক। পরিবর্তনের এই হাওয়ায় টিকে থাকতে হলে শুধু আতঙ্কিত না হয়ে, বরং বাস্তবসম্মত প্রজ্ঞা, আইনের সঠিক ব্যবহার এবং সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক কৌশলেই ফরাসি সমাজের এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।

হাসান ইলিয়াস তানিম : সাংবাদিক এবং মানবাধিকারকর্মী; সদস্য, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গ্লোবাল কমিউনিটি ফ্রান্স

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

শিক্ষাঙ্গনে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি

শিক্ষাঙ্গনে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি

বাইফোকাল লেন্স অগ্নিসন্ত্রাস কি অব্যাহত থাকবে

অগ্নিসন্ত্রাস কি অব্যাহত থাকবে

ফ্রান্সের অভিবাসন নীতি এবং দ্বিপক্ষীয় সমীকরণ

ফ্রান্সের অভিবাসন নীতি এবং দ্বিপক্ষীয় সমীকরণ

উত্তরাধিকার ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা

উত্তরাধিকার ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম