Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বাইফোকাল লেন্স

অগ্নিসন্ত্রাস কি অব্যাহত থাকবে

Advertisement

Icon

একেএম শামসুদ্দিন

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অগ্নিসন্ত্রাস কি অব্যাহত থাকবে

Advertisement

এ মাসের গোড়া থেকেই দেশব্যাপী কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, মলোটভ ককটেল বিস্ফোরণ এবং রেল-বাসে যে অগ্নিসংযোগের ঘটনা শুরু হয়েছিল; বিগত কয়েকদিন ধরে পরিস্থিতি শান্ত বলে মনে হচ্ছে। তবে দেশজুড়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তার জন্য শুধু পুলিশকে দায়ী করলে চলবে না; সরকারের যেসয সংস্থার আগাম তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার কথা, সেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশের নিরাপত্তা বিষয়ে এ সংস্থাগুলোর মূল কাজই হলো ঘটনা ঘটার আগে তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করা; ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর নয়। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, সেই দায়িত্ব পালনে তারা তাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারেনি। গুলশানের ঝটিকা মিছিল এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির সেলফোনের স্পর্শকাতর কথোপকথন ফাঁস হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সবার টনক নড়েছে। তারপরই পুলিশ তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করায় বেশকিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এর মধ্যে চমকপ্রদ যে তথ্য বেরিয়ে এসেছে তা হলো, ৫ থেকে ১০ হাজার টাকায় বিনিময়ে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তা ভিডিও ধারণ করা এবং নির্ধারিত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠিয়ে দেওয়া।

গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যমতে, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ কয়েকজন নেতা এ নাশকতার মূল পরিকল্পনাকারী হিসাবে কাজ করছেন। তাদের সেলফোন চেক করে ভারতীয় নম্বর ব্যবহার করে খোলা বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টেরও সন্ধান পাওয়া গেছে।

এ প্রসঙ্গে আমার একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। সময় ২০১৩-১৪ সাল; শেখ হাসিনার শাসনামল। তখন আমি সেনাবাহিনীতে কর্মরত। ইতঃপূর্বে সেনাবাহিনীর কিছু স্পর্শকাতর পদে চাকরির সুবাদে আমার পুরোনো এক সূত্রের মারফত জানতে পারি, বাংলাদেশের যেসব কুখ্যাত সন্ত্রাসী পার্শ্ববর্তী দেশে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের (সবাইকে নয়) সে দেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশে বেশকিছু গোপন (Hidden mission) কার্যক্রমে ব্যবহার করছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিরপুরের কুখ্যাত সন্ত্রাসী শাহদাত কথিত গোয়েন্দা সংস্থাটির আশ্রয়ে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁয়ে অবস্থান করছে। শাহদাতের সঙ্গে ওই গোয়েন্দা সংস্থার ঢাকা অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ আছে। প্রয়োজনে ওই কর্মকর্তা ঢাকা থেকে শাহদাতকে জানান; শাহদাত ঢাকায় তার সন্ত্রাসী সদস্যদের দিয়ে তাদের সেই কাজ করে দেয়। তাতে গোয়েন্দা সংস্থাটির সুবিধা হলো, যদি তারা ধরা পড়ে, তাহলে সবাই জানল সন্ত্রাসী শাহদাতের লোক ধরা পড়েছে। তাদের সম্পৃক্ততার কথা আর প্রকাশ পেল না।

শুধু তাই নয়, আরও কিছু সুবিধা তারা নিয়েছে। তা হলো, শাহদাতের মতো একজন সন্ত্রাসী নেতাকে আশ্রয় দিয়ে ওই সন্ত্রাসীর পুরো গ্রুপকে তারা তাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারছে। তাদের আরও কিছু সুবিধা ছিল, বাংলাদেশে গোপন মিশন চালানোর জন্য নতুন করে কোনো সদস্যকে রিক্রুট করতে হচ্ছে না। তাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র দিতেও হচ্ছে না। কেবল একজন সন্ত্রাসী নেতাকে আশ্রয় দিয়েই কাজ করিয়ে নিতে পারছে। তাতে তাদের অনেক অর্থের সাশ্রয়ও হয়েছে। এ গোপন তথ্যটি পাওয়ার পর আমাদের একটি গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত আমার পূর্বপরিচিত এক কর্মকর্তাকে তা জানাই। পরে খবর নিয়ে জেনেছি তিনিও তার কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। তবে কোনো কাজ হয়েছে বলে মনে হয়নি। সম্প্রতি অগ্নিসন্ত্রাস চালাতে গিয়ে আওয়ামী লীগও মাদকাসক্ত ও ভবঘুরে মানুষদের ব্যবহার করে একইরকম সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছে।

অগ্নিসন্ত্রাসের নেপথ্য পরিকল্পনাকারী হিসাবে ভারতে পলাতক আওয়ামী লীগের কিছু নেতার কথা শোনা যাচ্ছে। যদিও ডিবি তাদের পরিচয় প্রকাশ করেনি। তবে হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর জাহাঙ্গীর কবির নানককে বেশ সক্রিয় হতে দেখা গেছে। তার ভাইরাল হওয়া কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, হাসিনার ফিরে আসা উপলক্ষ্যে তিনি স্থানীয় নেতাকর্মীদের নানারকম নির্দেশনা দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগের এ নেতার অতীতের রেকর্ড খুব বেশি ভালো নয়। এ নেতার বিরুদ্ধে ২০০৪ সালের ৫ জুন আওয়ামী লীগের দেশব্যাপী ২৪ ঘণ্টার ডাকা হরতালের আগের দিন সন্ধ্যায় তৎকালীন শেরাটন হোটেলের সামনে দোতালা বিআরটিসি বাসে গানপাউডার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়ে মানুষ হত্যার অভিযোগ আছে। ওয়ান-ইলেভেনের পর তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল করিম সেলিম জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেন জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজমের পরিকল্পনায় বাসটিতে আগুন দেওয়া হয়েছিল। ঘটনাক্রমে এ তিনজনই এখন ভারতের নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছেন।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কাছে দেশের জনগণ ফ্যাক্টর নয়। জনগণের সমর্থন বা মনোভাব তাদের কাছে খুব কমই গুরুত্ব পায়। তা না হলে তাদের শাসনামলে জনগণের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে গুম-খুন করে, গুলি করে পাখির মতো শিশুসহ সহস্রাধিক মানুষ হত্যা করেও ক্ষমা চাওয়া তো দূরে থাক, ন্যূনতম অনুশোচনার বিন্দুমাত্র লক্ষণও তাদের কারও ভেতর দেখা যাচ্ছে না; বরং মানুষ হত্যার দায়িত্ব অন্যের ওপর চাপিয়ে নির্লজ্জের মতো এখনো নিজেদের নির্দোষ দাবি করছেন।

ওদিকে হাসিনা এত মানুষ হত্যার পরও দেশের সাধারণ মানুষ নতুন করে আবার তাকে গ্রহণ করবে কী করবে না, সে বিবেচনা তার মধ্যে নেই। যেসব নেতাকর্মীকে দেশব্যাপী অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে রেখে নিজ বংশ ও পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন, সেই নেতাকর্মীদেরই তিনি আবার অগ্নিসন্ত্রাসে নামিয়ে দিয়ে দেশজুড়ে চরম বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করছেন।

বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত মনে হলেও আওয়ামী লীগ কিন্তু বসে নেই। হাসিনা ও তার নেতাকর্মীরা যে করেই হোক, দেশের অভ্যন্তরে এমন অরাজকতা সৃষ্টি করবে, যাতে সেই পরিস্থিতির একটা সুযোগ নেওয়া যায়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর হাসিনা ঘোষণা দিয়েছিলেন, বেগম খালেদা জিয়াকে তিনি এক মুহূর্তও শান্তিতে থাকতে দেবেন না এবং তিনি তাই করেছিলেন। সে সময় পতিত স্বৈরাচার ও স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আঁতাত করে দেশব্যাপী অবর্ণনীয় জ্বালাও-পোড়াও করেছিলেন। ২০০১ সালে নির্বাচনে পরাজয়ের পরও সরকারবিরোধী আন্দোলনের নামে হাসিনা দেশকে কোন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, তা বলার প্রয়োজন নেই। ২০০৬ সালের অক্টোবরে এ আওয়ামী লীগের কর্মীরাই প্রকাশ্যে হাসিনার ধরিয়ে দেওয়া ‘লগি-বৈঠা’ দিয়ে পিটিয়ে কী নির্মমভাবে মানুষ হত্যা করেছে, সেই স্মৃতি এখনো মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি। কাজেই নিজস্ব স্বার্থে তারা যে কতটা নৃশংস হতে পারে, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে অনেকে হয়তো মনে করতে পারেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তাৎক্ষণিক কিছু কার্যক্রমের ফলে অগ্নিসন্ত্রাস স্তিমিত হয়ে পড়েছে। তবে এটা ঠিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ও গোয়েন্দা সদস্যদের এখন আগের চেয়ে তৎপর দেখা যাচ্ছে। এ কারণে মনে হতেই পারে, বোমাবাজি কিংবা অগ্নিসংযোগের ঘটনা হয়তো তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। এ অনুমান কতটুকু বাস্তবসম্মত, তা হয়তো আগামী দিনগুলোতেই বোঝা যাবে। তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, বর্তমানে ‘লাল পিরিয়ড’ চলছে। সেনাবাহিনীতে এ শব্দটি বেশি প্রচলিত। একটি ব্যাটল শেষে পরবর্তী ব্যাটলের প্রস্তুতির জন্য সাময়িক যে যুদ্ধবিরতি চলে, তাকেই ‘লাল পিরিয়ড’ বলে। আওয়ামী লীগের এখন হয়তো সেই ‘লাল পিরিয়ড’ চলছে। চলতি মাসের ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা তাদের ট্রায়াল হতে পারে। অর্থাৎ প্রাথমিক এ অগ্নিসন্ত্রাসের ফলে জনগণ, সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা এবং সে প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করেই হয়তো তারা তাদের পরবর্তী কোর্স অফ অ্যাকশন নির্ধারণ করবে।

শেখ হাসিনা ও তার পলাতক শীর্ষ নেতারা জানেন, সহজ পথে রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ তাদের জন্য খুবই ক্ষীণ। কাজেই ঘোষিত ডিসেম্বরকে টার্গেট করে এমন কর্মসূচি নিয়েই তারা মাঠে নামবেন, যাতে ফিরে আসার সহায়ক কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এমনও হতে পারে, এ অক্টোবরের গোড়াতেই তাদের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়ে যেতে পারে। তাদের উদ্দেশ্য কতটুকু সফল হবে, তা এ মুহূর্তে না বলা গেলেও আগামী দুই মাস যে তারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটানোর সব চেষ্টাই করে যাবে, তেমন ইঙ্গিতই যেন পাওয়া যাচ্ছে। কাজেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও সে কথা বিবেচনায় নিয়েই করণীয় ঠিক করতে হবে।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, কলাম লেখক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

শিক্ষাঙ্গনে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি

শিক্ষাঙ্গনে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি

বাইফোকাল লেন্স অগ্নিসন্ত্রাস কি অব্যাহত থাকবে

অগ্নিসন্ত্রাস কি অব্যাহত থাকবে

ফ্রান্সের অভিবাসন নীতি এবং দ্বিপক্ষীয় সমীকরণ

ফ্রান্সের অভিবাসন নীতি এবং দ্বিপক্ষীয় সমীকরণ

উত্তরাধিকার ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা

উত্তরাধিকার ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম