Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

সুষ্ঠু নির্বাচনের নেপথ্যে সেনাবাহিনী

Advertisement

Icon

সিরাজুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৬ পিএম

সুষ্ঠু নির্বাচনের নেপথ্যে সেনাবাহিনী

Advertisement

গণতন্ত্রের শক্তি কেবল সংবিধানের পৃষ্ঠায় নয়, তা নির্ভর করে ভোটের দিনের বাস্তবতায়। একজন সাধারণ ভোটার যখন ভোরে ঘুম থেকে উঠে কেন্দ্রের পথে হাঁটেন, তার মনে একাধিক প্রশ্ন থাকে—ভোট দিতে পারব তো? কোনো ঝামেলা হবে না তো? আমার ভোটের মূল্য থাকবে তো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনেকাংশেই নির্ধারিত হয় নির্বাচনি পরিবেশ কতটা শান্ত ও নিরাপদ তার ওপর। সাম্প্রতিক নির্বাচনে সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে কাঠামো কাজ করেছে, সেখানে সেনাবাহিনীর ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে।

নির্বাচন মানেই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন তীব্র হয়, তখন উত্তেজনাও বাড়ে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচনকে ঘিরে অতীতে সহিংসতার নজির আছে। ফলে ভোটের আগে জনমনে শঙ্কা তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। এই প্রেক্ষাপটে সেনা মোতায়েনকে কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি ছিল এক ধরনের প্রতিরোধমূলক আস্থা-ব্যবস্থা। দৃশ্যমান উপস্থিতি অনেক সময় সম্ভাব্য সংঘাতের আগুন জ্বলে ওঠার আগেই নিভিয়ে দেয়।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রকৃতি। তারা নির্বাচন পরিচালনা করেনি, ব্যালট স্পর্শ করেনি, ফল নির্ধারণ করেনি। তাদের কাজ ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া। এই সীমারেখা বজায় রাখাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। এবারের নির্বাচনে সেই ভারসাম্য রক্ষার প্রয়াস ছিল দৃশ্যমান।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদার আচরণ। দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, অবকাঠামো সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে যে শৃঙ্খলা ও সংযম তৈরি করেছে, তার প্রতিফলন নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনে দেখা গেছে। ভোটকেন্দ্রের নির্দিষ্ট দূরত্বে অবস্থান, অযথা হস্তক্ষেপ না করা, তবে প্রয়োজনে দ্রুত উপস্থিত হওয়া—এই নীতিই কার্যকর ছিল।

নির্বাচনের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো গুজব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি ভিত্তিহীন খবর মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে পারে। কোথাও ‘দখল’ বা ‘সংঘর্ষ’-এর খবর ছড়িয়ে পড়লে পাশের এলাকাতেও উত্তেজনা তৈরি হয়। সেনাবাহিনীর টহল ও প্রস্তুতি এই গুজব-সৃষ্ট অস্থিরতা প্রশমনে ভূমিকা রেখেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা হলেও তা বড় আকার নেওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এতে বোঝা যায়, কেবল উপস্থিতিই নয়—পরিকল্পনাও ছিল সুসংগঠিত।

তবে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার মানদণ্ড শুধু সহিংসতামুক্ত থাকা নয়; ভোটারদের অংশগ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গ্রাম থেকে শহর—অনেক নারী, প্রবীণ ও প্রথমবারের ভোটার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে দ্বিধায় থাকেন। ভোটের দিন যখন তারা কেন্দ্রে গিয়ে দেখেছেন শৃঙ্খলাবদ্ধ নিরাপত্তা বলয়, তখন সেই দ্বিধা অনেকাংশে কেটেছে। ভোটদানে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের পেছনে নিরাপদ পরিবেশ বড় ভূমিকা রাখে—এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই।

এখানে একটি বাস্তব প্রশ্নও রয়েছে। একটি সুস্থ গণতন্ত্রে কি প্রতিটি নির্বাচনে সেনা মোতায়েন প্রয়োজন? আদর্শ পরিস্থিতিতে হয়তো নয়। বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা কাঠামোই যথেষ্ট হওয়ার কথা। কিন্তু যখন রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র হয়, পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ে, তখন অতিরিক্ত নিরাপত্তা স্তর জনমনে আশ্বাস জোগায়। এবারের নির্বাচনে সেই আশ্বাসের প্রয়োজন ছিল—এবং তা কার্যকর হয়েছে বলেই বড় ধরনের সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলার ঘটনা সীমিত ছিল।

নির্বাচন-পরবর্তী সময়ও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফল ঘোষণার পর প্রায়ই ক্ষোভ বা উচ্ছ্বাস সংঘাতে রূপ নেয়। এবারের প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা যায়নি। এটি সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনার ধারাবাহিকতার ফল। সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর সমন্বিত উপস্থিতি একটি বার্তা দিয়েছে—আইন নিজের পথে চলবে, কোনো পক্ষই বিশৃঙ্খলার সুযোগ পাবে না।

তবে প্রশংসার পাশাপাশি একটি সতর্কতাও জরুরি। সেনাবাহিনীর সহায়ক ভূমিকা যেন কখনো বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার স্থায়ী বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও পুলিশকে আরও সক্ষম ও নিরপেক্ষ হতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী গণতন্ত্র গড়তে হলে রাজনৈতিক সংস্কৃতি উন্নত করা, সহনশীলতা বাড়ানো এবং আইন প্রয়োগে সমতা নিশ্চিত করাই মুখ্য। সেনাবাহিনীর উপস্থিতি তখন হবে কেবল অতিরিক্ত নিশ্চয়তা, নিয়ম নয়।

সবশেষে বলা যায়, নির্বাচন একটি সামষ্টিক আয়োজন। এখানে সবার ভূমিকা আছে—ভোটার, প্রার্থী, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। এবারের নির্বাচনে সেনাবাহিনী যে সংযত ও পেশাদার ভূমিকা পালন করেছে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তারা দেখিয়েছে, সশস্ত্র বাহিনী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে—প্রভাবক হিসেবে নয়।

গণতন্ত্রের শক্তি পরীক্ষা হয় সংকটের মুহূর্তে। সেই পরীক্ষায় যদি শৃঙ্খলা বজায় থাকে, নাগরিক নিরাপদে ভোট দিতে পারেন এবং ফল ঘোষণার পর দেশ স্বাভাবিক থাকে—তবে তা একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতকরণে সেনাবাহিনীর অবদান তাই কেবল একটি দায়িত্বপালনের ঘটনা নয়; এটি ছিল আস্থা পুনর্গঠনের একটি বাস্তব প্রয়াস। ভবিষ্যতে বেসামরিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হোক—তবু প্রয়োজন হলে একই সংযম ও পেশাদারিত্ব নিয়ে তারা পাশে থাকবে, এ বিশ্বাসই গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল রাখে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

সেনাপ্রধানের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া সেনাবাহিনীর উপপ্রধানের সাক্ষাৎ

সেনাপ্রধানের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া সেনাবাহিনীর উপপ্রধানের সাক্ষাৎ

মির্জা ফয়সাল নাকি শামারুহ, কে হচ্ছেন ফখরুলের আসনের কাণ্ডারী?

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন মির্জা ফয়সাল নাকি শামারুহ, কে হচ্ছেন ফখরুলের আসনের কাণ্ডারী?

চট্টগ্রামে ট্যাংক থেকে গো'লাবর্ষণের সময় উড়ে গেল ২ সেনা

চট্টগ্রামে ট্যাংক থেকে গো'লাবর্ষণের সময় উড়ে গেল ২ সেনা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রথমবারের মতো মির্জা আব্বাস

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রথমবারের মতো মির্জা আব্বাস

এসএসসি পাশেই সেনাবাহিনীতে চাকরি

এসএসসি পাশেই সেনাবাহিনীতে চাকরি

উপসাগরীয় নিরাপত্তায় পাকিস্তানের প্রভাব কি বাড়ছে?

কুয়েতের সঙ্গে নতুন চুক্তি উপসাগরীয় নিরাপত্তায় পাকিস্তানের প্রভাব কি বাড়ছে?

আরও পড়ুন

ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন ও Culinary Tourism-এর প্রভাব!

ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন ও Culinary Tourism-এর প্রভাব!

রেমিট্যান্সের হিসাব আছে, প্রবাসীর জীবনের হিসাব কোথায়?

রেমিট্যান্সের হিসাব আছে, প্রবাসীর জীবনের হিসাব কোথায়?

একটি বিরলপ্রজ ভাষণে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর

একটি বিরলপ্রজ ভাষণে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর

বিলুপ্তির পথে উচ্চ মাধ্যমিকের ব্যবসায় শিক্ষা শাখা

বিলুপ্তির পথে উচ্চ মাধ্যমিকের ব্যবসায় শিক্ষা শাখা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম