Logo
Logo
×
   

আন্তর্জাতিক

ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়া, কৌশলগত বাধ্যবাধকতা নাকি ঐতিহাসিক ভুল

শিহাব উদ্দিন

শিহাব উদ্দিন

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬, ০৪:৪১ এএম

ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়া, কৌশলগত বাধ্যবাধকতা নাকি ঐতিহাসিক ভুল

প্রতীকী ছবি

বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার সরাসরি সংঘাত এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক নতুন ও জটিল সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। এই ঘটনাপ্রবাহকে কেবল একটি সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদী পররাষ্ট্রনীতির এক অগ্নিপরীক্ষা। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া কি কেবলই দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরাইলের প্রতি দায়বদ্ধতা, নাকি এটি এমন এক কৌশলগত চোরাবালি যা ভবিষ্যতে তাদের বৈশ্বিক আধিপত্যকে খর্ব করতে পারে—এই প্রশ্নটিই এখন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঐতিহাসিক ও কৌশলগত দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলে সোভিয়েত প্রভাব রোধ এবং পরবর্তীতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসরাইল ছিল ওয়াশিংটনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার। বর্তমান সংঘাতে ইরান যখন সরাসরি ইসরাইলকে লক্ষ্যবস্তু করছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র যদি নিষ্ক্রিয় থাকতো, তবে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব বলয় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি ছিল। সেদিক থেকে বিচার করলে, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ একটি ‘কৌশলগত বাধ্যবাধকতা’। মিত্রকে রক্ষা করতে না পারলে সৌদি আরব বা জর্ডানের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে ওয়াশিংটনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতো, যা চীন বা রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির জন্য নতুন দুয়ার খুলে দিত।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠে তাকালে একে একটি ‘ঐতিহাসিক ভুল’ হিসেবে চিহ্নিত করার যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। ভিয়েতনাম, ইরাক বা আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যখন ‘এশিয়া প্যাসিফিক’ অঞ্চলে নিজেদের মনোযোগ সরিয়ে নিতে চেয়েছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের এই অন্তহীন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া তাদের বৃহত্তর কৌশলের পথে একটি বড় বাধা। ইরান কোনো ছোট বা দুর্বল রাষ্ট্র নয়; তাদের বিশাল ভৌগোলিক আয়তন, কৌশলগত অবস্থান এবং শক্তিশালী ছায়া বাহিনী (প্রক্সি নেটওয়ার্ক) মার্কিন বাহিনীকে এক দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি ইরানে আঘাত হানার ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যে অস্থিরতা তৈরি হবে, তা বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানি তেলের বাজারে ধস নামাতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে খোদ মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে।

তাছাড়া, আন্তর্জাতিক আইনের নৈতিকতার প্রশ্নেও যুক্তরাষ্ট্র এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একদিকে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের সামরিক অভিযানে নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়া—এই দ্বিমুখী অবস্থান গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে ওয়াশিংটনের নৈতিক কর্তৃত্বকে দুর্বল করেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আলোচনার মাধ্যমে একটি টেকসই সমাধান খোঁজার চেয়ে সামরিক পথে হাঁটলে তা মধ্যপ্রাচ্যে উগ্রবাদের নতুন জোয়ার তৈরি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

পরিশেষে বলা যায়, ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম সুতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এটি যদি কেবল প্রতিরক্ষা এবং দ্রুত যুদ্ধবিরতি কার্যকরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা কৌশলগতভাবে সফল হতে পারে। কিন্তু যদি এই সংঘাত সরাসরি শাসনের পরিবর্তন বা ইরানের ভূখণ্ড দখলের মতো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে তা একবিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বিপর্যয়কর ঐতিহাসিক ভুল হিসেবে বিবেচিত হবে। ওয়াশিংটনকে এখন একদিকে মিত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং অন্যদিকে সরাসরি যুদ্ধের ফাঁদ এড়িয়ে চলতে হবে—যা অত্যন্ত দক্ষ ও দূরদর্শী কূটনীতির দাবি রাখে।


Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম