Logo
Logo
×
   

Advertisement

আন্তর্জাতিক

মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ

ইরান যুদ্ধ যেভাবে গুঁড়িয়ে দিল আমিরাতের অহংকার

Advertisement

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম

ইরান যুদ্ধ যেভাবে গুঁড়িয়ে দিল আমিরাতের অহংকার

শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘লিটল স্পার্টা’ বা মধ্যপ্রাচ্যের অজেয় সামরিক শক্তির উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। গত দুই দশক ধরে একাধারে বন্দর নির্মাণ, বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার, ছায়াযুদ্ধ এবং পরাশক্তিদের সাথে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে নিজেদের ভৌগোলিক দুর্বলতা আড়াল করার যে কৌশল আবুধাবি নিয়েছিল, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তার সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করেছে।

অঞ্চলজুড়ে নিজেদের একটি অপরাজেয় ও শক্তিশালী ‘মিডল পাওয়ার’ বা মধ্যম শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ‘লিটল স্পার্টা’ নামে অভিহিত করা হতো। তবে গত তিন মাসে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ইরানের উপর্যুপরি হামলা আমিরাতের সেই আত্মতুষ্টি এবং বাস্তব নিরাপত্তার মধ্যকার বিশাল ব্যবধানকে সামনে এনেছে। 

সম্প্রতি আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, চরম সংকটের সময়ে তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধুরা পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিবেশীদের একটি আগ্রাসী জোটে টানতে না পারায় আবুধাবি কতটা হতাশ।

এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের অংশ হিসেবে আমিরাতি বিশ্লেষক তারেক আল-ওতাইবা আরব সংহতি এবং বহুপাক্ষিক জোটের নিষ্ক্রিয়তার তীব্র সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত আমিরাতের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ আল-ওতাইবা হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে একটি আন্তর্জাতিক সামরিক অভিযানে শরিক হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এই সমস্ত হুঁশিয়ারির আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে এক নির্মম সত্য। সেটি হলো— বছরের পর বছর ধরে জমানো আন্তর্জাতিক প্রভাব ও বিপুল অর্থসম্পদ কোনোটিই ইরানের প্রকাশ্য আগ্রাসনের মুখে আমিরাতকে একক নিরাপত্তা দিতে পারছে না।

প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের নেতৃত্বে সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্ববাণিজ্য, সার্বভৌম তহবিল, লজিস্টিকস হাব এবং ইয়েমেন থেকে সুদান পর্যন্ত প্রক্সি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নিজেদের একটি অপ্রতিরোধ্য রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) যখন হামলা শুরু করল, তখন আমিরাতের এই বিশাল বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক কোনো কাজে আসেনি। রাশিয়া থেকে আসা বিপুল বিনিয়োগ ও ধনকুবেরদের আশ্রয় দিয়েও আবুধাবি সংকটের সময় মস্কোর সামরিক সহায়তা পায়নি। বেইজিং যথারীতি কেবল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং ওয়াশিংটন মৌখিক আশ্বাস দিলেও ইরানকে দমনে কার্যকর কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি।

মূলত বিশ্ববাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু এবং বৈশ্বিক পুঁজির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হওয়াই আমিরাতকে ইরানের সহজ টার্গেটে পরিণত করেছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী, বীমা কোম্পানি ও প্রবাসী কর্মীদের এটি মনে করিয়ে দেওয়াই ইরানের জন্য যথেষ্ট যে আমিরাতও এই অঞ্চলের অন্যান্য ছোট দেশের মতোই অনিরাপদ।

আমিরাতের জাতীয় অবকাঠামোতে হামলার জবাবে ইরানের ভেতরে আমিরাতি বাহিনীর বিমান হামলাও শক্তির ভারসাম্য ফেরাতে পারেনি, কারণ যুদ্ধ বা ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে ইরানের সহনশীলতা আরব দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। এরপরই মোহাম্মদ বিন জায়েদ ইরানের বিরুদ্ধে একটি যৌথ সামরিক অভিযান চালাতে প্রতিবেশীদের আহ্বান জানান। কিন্তু সৌদি আরবসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো সেই আহ্বানে সাড়া না দেওয়ায় আমিরাত এখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শনের প্রচারণায় নেমেছে। একই সাথে তারা জিসিসি (গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল), আরব লীগ এবং পাকিস্তান বা ওমানের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে তাদের পাশে শক্তভাবে না দাঁড়ানোর অভিযোগ তুলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আবুধাবি দীর্ঘদিন ধরে জিসিসি-কে তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তার চেয়ে নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথে একটি বাধা হিসেবে দেখেছে। কিন্তু এখন বিপদে পড়ে তারা বুঝতে পারছে, যে প্রতিবেশীদের তারা একসময় এড়িয়ে চলতে চেয়েছিল, তাদের ছাড়া নিজেদের অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা অসম্ভব।

আবুধাবির বর্তমান কৌশল হচ্ছে ওয়াশিংটনে জোর লবিং করা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে আরও শক্ত নিরাপত্তা গ্যারান্টি আদায় করা। তবে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল মার্কিন প্রতিরক্ষা কবচ বা ইরানের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক প্রচারণায় নেই। আমিরাতকে এটি মেনে নিতে হবে যে তাদের নিরাপত্তা এককভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিরাপত্তার একমাত্র পথ হলো সৌদি আরব, কাতার, ওমান, কুয়েত এবং বাহরাইনের সাথে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা। ওমান, কাতার বা পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে বিশ্বাসঘাতকতা না ভেবে এটিকে দায়িত্বের বণ্টন হিসেবে দেখতে হবে। একই সাথে সৌদি আরবের দূরদর্শিতা ও সাবধানতাকে দুর্বলতা না ভেবে তাদের ভৌগোলিক ও জ্বালানি শক্তির গুরুত্বকে স্বীকার করতে হবে। ইসরাইলের বর্তমান সুবিধাবাদী সামরিক সহযোগিতাও ইরানের ভৌগোলিক নৈকট্যের ঝুঁকি থেকে আমিরাতকে রক্ষা করতে পারবে না।

আমিরাতের মূল সমস্যা তাদের মধ্যম শক্তি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং তাদের ধারণা ছিল এই সক্রিয়তা দিয়ে নিজেদের ভৌগোলিক দুর্বলতাকে মুছে ফেলা সম্ভব। ‘লিটল স্পার্টা’ একা দাঁড়িয়ে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারবে— এই অলীক কল্পনা বাদ দিয়ে সব উপসাগরীয় দেশকে একসাথে নিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলা করাই হবে আমিরাতের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম