সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক চুক্তি সই, কেন এতো বিতর্ক?
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০২:০২ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরব একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার ফলে দেশটি বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলার সুযোগ পেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয় এই চুক্তিকে একটি শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা সৌদি আরবের পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচিতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করবে। তবে এই চুক্তিতে কী আছে সেটি পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ করা হয়নি। খবর বিবিসির।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ হবে এবং ইতোমধ্যে অস্থিতিশীল একটি অঞ্চলে ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, সহযোগিতা চুক্তির পাশাপাশি একটি 'দ্বিপক্ষীয় সুরক্ষা চুক্তি'ও স্বাক্ষরিত হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই দুটি চুক্তি একসঙ্গে কয়েক দশকব্যাপী বহু বিলিয়ন ডলারের অংশীদারত্বের জন্য আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধসহ একাধিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্যকে এগিয়ে নেবে।
সৌদি সরকারও একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, এই চুক্তি জ্বালানি খাতে দুই দেশের বিদ্যমান সহযোগিতারই একটি সম্প্রসারণ। একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, গত নভেম্বরে সৌদি নেতার ওয়াশিংটন সফরের পর এই চুক্তি সম্পন্ন হলো।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটেই এই ঘোষণাটি এলো।
এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শত শত কোটি ডলারের ব্যবসার সুযোগ এনে দিতে পারে। কারণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কেন্দ্র নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো যুক্ত থাকবে। এই ইউরেনিয়াম বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়, আবার পারমাণবিক বোমা তৈরির কাজেও প্রয়োজন হয়।
এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেছেন, নিশ্চিত থাকুন, এই চুক্তিগুলো পারমাণবিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র বিস্তার রোধের সর্বোচ্চ মানদণ্ড বজায় রাখবে। একইসঙ্গে বিশ্বের সেরা পারমাণবিক প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানীদের ওপর আস্থা রাখা হয়েছে যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রেই উদ্ভাবিত হয়েছে।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, এই চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা দুইটিকেই এগিয়ে নিয়ে যাবে।
একইসঙ্গে পারমাণবিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের উচ্চমান বজায় রাখার পাশাপাশি বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে শক্তিশালী করবে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র ইসরাইলের পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, এই পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
যদিও অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এই পথ বাস্তবায়নে কয়েক দশক সময় লাগতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে তীব্র বিরোধিতাও আসতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ-এর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক পরিচালক রোজমেরি কেলানিক বলেছেন, এই চুক্তিতে যদি সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকে তবে সেটি হবে বেশ চমকপ্রদ।
এই চুক্তির বিরোধিতা করেছেন এমন বেশ কয়েকজন ডেমোক্রেট সদস্য উল্লেখ করেছেন, রুবিও সেনেটর থাকার সময় নিজেই 'নো নিউক্লিয়ার ওয়পনস ফর সৌদি অ্যারাবিয়া অ্যাক্ট' অর্থাৎ সৌদি আরবের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র নয় - এমন একটি আইনের জোরালো সমর্থন করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই চুক্তির শর্ত হিসেবে এই দাবিটি বাতিল করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
হোয়াইট হাউসে থাকার সময় ট্রাম্প সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে কাজ করেছেন। এই চুক্তির মাধ্যমে সম্ভাব্য কৌশলগত ও বাণিজ্যিক লাভের পাশাপাশি বর্তমানে এটি হওয়ার অন্যতম একটা কারণ হতে পারে, রাশিয়া এবং চীন একই ধরনের বিষয়ে আলোচনা করেছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সেটি হাতছাড়া করতে চায়নি।
এই চুক্তিটি সৌদি আরবের জন্য একটি বড় বিজয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠনে এটির সক্ষমতা রয়েছে। যদিও এটা সঙ্গে সঙ্গে হবে না, হয়তো কয়েক বছর অথবা আরও বেশি সময় লেগে যেতে পারে।
কয়েক মাস ধরে চলমান যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের যুদ্ধের প্রধান কারণ পারমাণবিক ইস্যুটি।
পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে প্রতিরোধ করাই ছিল ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর হামলার অন্যতম কারণ, এমন দাবি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল করলেও তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির এমন পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করে আসছে।
সৌদি আরবের ডি ফ্যাক্টো বা কার্যত শাসক, ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ২০১৮ সালে সিবিএস নিউজকে বলেছিলেন, তার দেশ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করছে না।
কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই যদি ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করে তাহলে আমরাও যত দ্রুত সম্ভব একই পথে হাঁটব।
সূত্র: বিবিসি

