Logo
Logo
×
   

আন্তর্জাতিক

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বদলে দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত সমীকরণ

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৩:১২ পিএম

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বদলে দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত সমীকরণ

পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক।  এর মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের তিনটি প্রভাবশালী দেশ একটি যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোর অধীনে একত্রিত হয়েছে।  নতুন এই  নিরাপত্তা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত মানচিত্রে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। 

শুক্রবার (৭ আগস্ট) পবিত্র মক্কা নগরীতে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের কোনো একটিতে আঘাত হানা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে এই চুক্তির মিল আছে। ফলে চুক্তিটি তাৎক্ষণিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করেছে। যদিও যৌথ বিবৃতিতে নির্দিষ্ট সামরিক প্রতিশ্রুতিগুলো পরিষ্কার করে বলা হয়নি।

বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম দেশ পাকিস্তানের জন্য এই চুক্তি আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দীর্ঘদিনের সতর্ক অবস্থান থেকে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের পাশে দাঁড়িয়ে ইসলামাবাদ তার সামরিক বাহিনীকে দক্ষিণ এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে গড়ে ওঠা একটি সম্ভাব্য নতুন নিরাপত্তা বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে।


চুক্তিটি সম্ভাব্য বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুদ্ধ ও পরিবর্তিত জোটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা যখন ক্রমেই চাপে পড়ছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের পারমাণবিক ও প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা নতুন একটি ভিত্তি বা নিরাপত্তার স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নজিরবিহীন চাপের সময়েই এই চুক্তি হয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ আঞ্চলিক কৌশলগত পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে।  হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর—দুই পথেই বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

অঞ্চলটির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী এক পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘আরও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো তিন দেশেরই অভিন্ন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থ। শেষ পর্যন্ত এটিই তাদের চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করেছে।’

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরবের জ্বালানি ও সার সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। আমদানিনির্ভর পাকিস্তান ও তুরস্ক এ সংকটে বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।


তবে নিরাপত্তার বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব ও তুরস্ক—দুই দেশই বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হামলার শিকার হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত থাকায় সীমান্ত অস্থিতিশীলতা নিজেদের ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা নিয়ে ইসলামাবাদ ও আঙ্কারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

তুরস্কের জন্য আরও একটি নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে। বাইরের শক্তিগুলো যদি ইরানি কুর্দি মিলিশিয়াদের অস্ত্র সরবরাহ করে, তাহলে তুরস্কের কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকে-এর সঙ্গে বহু কষ্টে গড়ে ওঠা নাজুক শান্তি প্রক্রিয়া ভেঙে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।

বৃহত্তর এই সংঘাত ইরান ও ইয়েমেনে তাদের মিত্র হুথিদেরও আরও সক্রিয় করেছে। তারা সৌদি ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা বাড়িয়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের কাছে এসব হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ব্যর্থ হওয়ায় ওয়াশিংটন কতটা নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা অংশীদার—তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ফলে আঞ্চলিক শক্তিধর দেশগুলো বাইরের শক্তির নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর কম নির্ভর করে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে জোর দিচ্ছে।

পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি এই চুক্তিকে ‘উদীয়মান আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর প্রথম বাস্তব ভিত্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এটি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের দায়িত্ব নেওয়ার দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত।

এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দুররানি লিখেছেন, ‘এই গতি অব্যাহত থাকলে কয়েক দশক ধরে চলা সংঘাতগুলো—এর মধ্যে দীর্ঘদিনের ফিলিস্তিন সমস্যাও রয়েছে—আরও আঞ্চলিক নেতৃত্বে সমাধানের পথ খুলে দিতে পারে।’

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই চুক্তি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং তিন দেশের মধ্যে গত কয়েক মাসে বাড়তে থাকা সহযোগিতারই ধারাবাহিক ফল।


আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান চুক্তিটিকে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তিন দেশের মধ্যে গভীরতর নিরাপত্তা সম্পর্কের ‘স্বাভাবিক পরিণতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এর পেছনে আগে থেকেই কিছু ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। ২০২৫ সালের শেষ দিকে রিয়াদ ও ইসলামাবাদ একটি দ্বিপক্ষীয় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। এর আওতায় প্রায় ৮ হাজার পাকিস্তানি সেনা, যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৌদি আরবে মোতায়েন করা হয়। অন্যদিকে, তুরস্ক দুই দেশকেই বড় পরিসরে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করে আসছে।

ওয়াশিংটনের জন্যও চুক্তিটি স্বস্তির হতে পারে

কুগেলম্যান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, ইরানকে সামনে রেখে সম্মিলিত আঞ্চলিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলায় জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনে এটিকে ভালোভাবেই নেওয়া হবে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র তার গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের কাছ থেকে নিরাপত্তার দায়িত্ব আরও বেশি ভাগ করে নেওয়া দেখতে চায়। 

সামরিক পোশাকে অর্থনৈতিক সহায়তার পথ

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের জন্য এই চুক্তি শুধু ভূরাজনীতি নিয়ে নয়। দেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতার সঙ্গেও এটি গভীরভাবে সম্পর্কিত।

ইসলামাবাদের জন্য চুক্তিটি একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাকিস্তান নিজেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সেতু হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছিল।

জুনে আঞ্চলিক সংঘাত সাময়িকভাবে থামাতে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ তৈরিতে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সংঘাত আরও বাড়ায় পাকিস্তানের নিরপেক্ষ অবস্থান সংকুচিত হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক সংকটে থাকা সরকারের জন্য এখন কৌশলগত প্রতিরক্ষা নীতি ক্রমেই অর্থনৈতিক প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে।


ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তান তার সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করে অর্থনৈতিক সহায়তা আদায় করেছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের কাছ থেকে।

নতুন এই যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামো সেই মডেলকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। যৌথ প্রশিক্ষণ, সেনা মোতায়েন ও অস্ত্র রপ্তানির মতো সামরিক সক্ষমতার বিনিময়ে ইসলামাবাদ গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় বিনিয়োগ, জ্বালানি খাতে সুবিধা ও কূটনৈতিক সমর্থন পাওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।

রিয়াদের জন্য পাকিস্তান কয়েক দশকের যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একটি বড় ও দক্ষ সামরিক বাহিনীর সুবিধা দিচ্ছে। আর ইসলামাবাদের জন্য সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগিতা বিনিয়োগ, আর্থিক সহায়তা এবং অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী দেশের সঙ্গে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্কের সুযোগ তৈরি করছে।

ওই পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘এই অর্থে পাকিস্তানের সামরিক শক্তি কেবল কৌশলগত সম্পদ নয়, অর্থনৈতিক সম্পদেও পরিণত হচ্ছে।’

সৌদির অর্থ, তুরস্কের প্রযুক্তি, পাকিস্তানের সামরিক শক্তি

উদীয়মান এই অংশীদারত্বে তিন ধরনের আলাদা কৌশলগত শক্তি এক জায়গায় মিলছে।  পাকিস্তানের আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শহরিয়ার খান বলেন, এই সমন্বয়ে ‘সৌদি আরব দিচ্ছে অর্থনৈতিক শক্তি, তুরস্ক দিচ্ছে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং পাকিস্তান দিচ্ছে মূল সামরিক সক্ষমতা। ‘

তিনি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘একসঙ্গে এই তিন দেশ এমন একটি নিরাপত্তা অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারে, যার সক্ষমতা প্রচলিত সেনা মোতায়েনের সীমা ছাড়িয়ে যাবে।’

প্রতিটি দেশই অন্যদের পরিপূরক কিছু সক্ষমতা নিয়ে আসছে।


সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল অর্থ, জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান।  ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী পরিচালনাকারী তুরস্কের রয়েছে উন্নত ও ক্রমেই স্বনির্ভর হয়ে ওঠা প্রতিরক্ষা শিল্প। এর মধ্যে ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং নির্ভুলভাবে লক্ষ্যভেদী অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। ফলে বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর তুরস্কের নির্ভরতা কমছে।  আর  পাকিস্তান দিচ্ছে বড় আকারের, যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সেনাবাহিনী এবং মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা।

ফাঁদে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি পাকিস্তানের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকিও তৈরি করছে।  ইরান ইতোমধ্যে দ্রুত ও কঠোর ভাষায় এই চুক্তির সমালোচনা করেছে।

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সদস্য ইব্রাহিম রেজায়ি এক্সে লেখেন, ‘সৌদি আরবের  জানা উচিত, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে কাগজে করা একটি চুক্তি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। যেমন বছরের পর বছর একতরফাভাবে আমেরিকার কাছ থেকে সুবিধা নেওয়াও তাদের নিরাপত্তা এনে দেয়নি।’

ইরানের এই প্রতিক্রিয়া পাকিস্তানের মৌলিক সংকটটিকে সামনে এনেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হলে তেহরানের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিশ্লেষকেরা ‘ফাঁদে আটকে পড়ার’ ঝুঁকির কথা বলছেন। অর্থাৎ, এমন বিদেশি সংঘাতে পাকিস্তান জড়িয়ে পড়তে পারে, যা তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির দ্বন্দ্বে সরাসরি জড়িয়ে পড়া এড়িয়ে চলেছে। ২০১৫ সালে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক উদ্বেগের কারণে সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেন জোটে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব পাকিস্তানের পার্লামেন্ট প্রত্যাখ্যান করেছিল।

পাকিস্তানে বড় একটি শিয়া জনগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের কেউ কেউ ইরানের ধর্মীয় নেতাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পথপ্রদর্শক হিসেবে মনে করেন। তাই সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পাকিস্তানের অভ্যন্তরে যেন ইরানবিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখা না হয়, সেদিকে ইসলামাবাদকে সতর্ক থাকতে হবে। তা না হলে দেশের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও তীব্র হতে পারে।

 ‘মুসলিম নিরাপত্তা জোট’?

এই চুক্তি ভবিষ্যতে মুসলিম বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশকে নিয়ে একটি বৃহত্তর নিরাপত্তা জোটে পরিণত হতে পারে কি না, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা মুহাম্মদ সাঈদ মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি মুসলিম দেশ এবং সম্ভবত এর বাইরের কিছু দেশও ভবিষ্যতে এই কাঠামোয় যোগ দিতে পারে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে এ ধরনের জোটের সাফল্য নিশ্চিত হবে না।

এক্সে তিনি লেখেন, ‘মুসলিম দেশগুলোর প্রকৃত ও সম্মিলিত শক্তি শুধু সামরিক সক্ষমতা থেকে আসবে না। বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, জ্ঞান, উদ্ভাবন, শৃঙ্খলা, চরিত্র এবং সাম্প্রদায়িক অনুভূতির প্রতি সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গির ওপর সহযোগিতাই হবে মূল শক্তি।’

আরও শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ নিরাপত্তা জোটের সম্ভাবনা ইসরাইলের মধ্যেও ইতোমধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।


ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছিলেন, পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে সঙ্গে নিয়ে তুরস্ক যেন ইসরাইলকে ঘিরে ‘শত্রুভাবাপন্ন একটি অক্ষ’ গড়ে তুলতে না পারে।

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থান এই চুক্তিকে ঘিরে কৌশলগত হিসাব-নিকাশে অনিবার্যভাবেই বড় পরিবর্তন আনছে।

সৌদি আরবের জন্য ইসলামাবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ইরানের হুমকির মুখে অতিরিক্ত প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে রিয়াদকে।

ভারতও প্রভাবিত হবে

এই চুক্তির প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও অনেক দূর যেতে পারে। পাকিস্তানের জন্য সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ভারতের বিপরীতে একটি কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।

সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতের ব্যাপক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও নতুন এই যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্কতার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা বলেছে, ‘নয়াদিল্লি ‘ঘটনাপ্রবাহ ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।’ তবে ভারতীয় জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বিষয়টি নিয়ে ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছেন।

নয়াদিল্লিভিত্তিক থিংকট্যাংক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক কবির তানেজা এক্সে লিখেছেন, ‘বেশিরভাগ মানুষ অবশ্যই বিষয়টিকে মধ্যপ্রাচ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। কিন্তু এর প্রভাব অন্যান্য ক্ষেত্রেও পড়বে। আর সবার আগে রয়েছে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সংঘাতপূর্ণ সম্পর্ক।’

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব কানওয়াল সিবাল এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এই চুক্তিকে ‘ভারতের স্বার্থের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, ভারত যেন সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইসরাইল, গ্রিস, সাইপ্রাস ও আফগানিস্তানের সঙ্গে নিজেদের কৌশলগত বিকল্প আরও বিস্তৃত করে।

তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম