আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার
বাসার আল আসাদের সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত—কে এই আতেফ নাজিব?
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম
সিরিয়ার সাবেক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আতেফ নাজিবকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে দামেস্কের একটি আদালত। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সিরিয়ার ১৪ বছরব্যাপী দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে হত্যা, নির্যাতন ও গুমের মূল রূপকার হিসেবে পরিচিত সাবেক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আতেফ নাজিবকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে দামেস্কের একটি আদালত।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) নাজিবের পাশাপাশি সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ এবং তার ছোট ভাই মাহের আল-আসাদকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।পলাতক থাকায় বাশার ও তার ভাইয়ের অনুপস্থিতিতেই (অনুপস্থিতিতে বিচার) এই রায় ঘোষণা করা হয়। দামেস্কের চতুর্থ ক্রিমিনাল কোর্ট ২০১১ সালে দারা প্রদেশে আসাদ সরকারের সংঘটিত অপরাধগুলোকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করেছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতনের পর সাবেক প্রেসিডেন্ট ও তার পরিবারের সদস্যরা রাশিয়ায় পালিয়ে গেলেও নাজিব ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সিরিয়াতেই বন্দি ছিলেন। বিচার চলাকালে তার বিরুদ্ধে ২০১১ সালে দারায় গণবিক্ষোভ দমনে হত্যা, নির্যাতন, গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধসহ অন্তত ১০টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়।
কে এই আতেফ নাজিব?
৬৬ বছর বয়সি আতেফ নাজিব ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের আপন খালাতো ভাই। তিনি দক্ষিণ সিরিয়ার দারা প্রদেশের রাজনৈতিক নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে সশস্ত্র বিরোধী জোটের আকস্মিক অভিযানে দামেস্কের পতন ঘটে এবং আসাদ সরকারের অবসান হয়। ক্ষমতার পতনের পর থেকে বাশার আল-আসাদ মস্কোতে কঠোর রুশ নজরদারিতে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। বাবার মৃত্যুর পর ২০০০ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা দুই দশকেরও বেশি সময় সিরিয়ার ক্ষমতায় ছিলেন বাশার।
আশির দশকের শুরুতে হোমসের মিলিটারি একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ শেষ করে নাজিব দারা প্রদেশের রাজনৈতিক নিরাপত্তার দায়িত্ব নেন। ২০১১ সালের মার্চে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ ও আসাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থান শুরুর সময়ও তিনি এই পদে ছিলেন। তবে আন্দোলন নির্মমভাবে দমনের অভিযোগে ২০১১ সালের এপ্রিলেই আসাদ সরকার তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেয়।
নাজিবের শাসনামলেই দারা প্রদেশে একটি স্কুলের দেওয়ালে সরকারবিরোধী গ্রাফিতি আঁকার অপরাধে বেশ কয়েকজন কিশোরকে গ্রেফতার ও নির্মম নির্যাতন করা হয়। এই ঘটনাই পরবর্তীতে পুরো দেশে আসাদবিরোধী তীব্র আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।
২০২৪ সালে আসাদ সরকারের পতনের পর নাজিব দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও পরবর্তীতে আবার সিরিয়ায় ফিরে আসেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে লাতাকিয়া প্রদেশে অভিযান চালিয়ে সাধারণ নিরাপত্তা বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে। আসাদ অভ্যুত্থানের সূচনালগ্নে সংবেদনশীল পদে থাকার কারণে নাজিবের গ্রেফতারকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছিল।
দামেস্কের চতুর্থ ক্রিমিনাল কোর্টে গত ২৬ এপ্রিল থেকে এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। আটটি শুনানির পর চূড়ান্ত পর্যালোচনা শেষে আদালত এই রায় দেন।
আদালতের রায়ে বলা হয়, নাজিব শিশুসহ বিপুল সংখ্যক বন্দির ওপর সরাসরি নির্যাতন চালিয়েছেন এবং হেফাজতে থাকা অনেক বন্দির মৃত্যুর জন্য তিনি সরাসরি দায়ী। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে আসাদ আমলের কোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সিরিয়ার আদালতের এটিই প্রথম ঐতিহাসিক রায়।
আদালতের এই সিদ্ধান্তকে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কারণ এই মামলার মূল আসামিদের মধ্যে কেবল আতেফ নাজিবই সশরীরে আদালতে উপস্থিত থেকে বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন, বাকিদের অনুপস্থিতিতেই দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
নাজিবের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগসমূহ
তার বিরুদ্ধে ২০১১ সালের বিক্ষোভ চলাকালীন দারা প্রদেশে দমনপীড়নের মূল নির্দেশদাতা হওয়ার অভিযোগ আনা হয়। আদালতের রায়ে নিশ্চিত করা হয়েছে, তিনি অন্তত ১০টি গুরুতর অপরাধে দোষী, যার মধ্যে রয়েছে হত্যা, নির্যাতন এবং ২০১১ সালের দারা হত্যাকাণ্ড—যাকে আদালত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৭৫ জন ভুক্তভোগী ও বাদী নাজিবের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন এবং বিচারে নিজেদের সাক্ষ্য উপস্থাপন করেন।
এই রায়ের তাৎপর্য কতখানি?
সিরিয়ার নতুন অন্তর্বর্তীকালীন বিচার ব্যবস্থা এবং আসাদ সরকারের আমলে সংঘটিত অপরাধের বিচার করার ক্ষেত্রে এটি ছিল এক বড় পরীক্ষা। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে যাওয়া গৃহযুদ্ধের পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিচার প্রক্রিয়া শুরু করতে দেরি হওয়ায় আহমেদ আল-শারা-র অন্তর্বর্তী সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছিল।
সিরিয়ান নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটস-এর ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, গৃহযুদ্ধ চলাকালে ১ লাখ ৮১ হাজারের বেশি মানুষ গুম ও বেআইনি আটক হন, যার ৯০ শতাংশের জন্যই দায়ী ছিল আসাদ সরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলার আইনি প্রক্রিয়া ও রায় ভবিষ্যতে আসাদ আমলের অন্যান্য অপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে একটি নতুন পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে। রায় ঘোষণার পর দামেস্কের আদালত প্রাঙ্গণ ও রাজপথে সাধারণ মানুষকে উল্লাস ও সন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। প্রায় পাঁচ দশকের একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সিরিয়া এখন এক নতুন সত্য ও বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে।

