তিব্বতের বন্যার ভয়াবহ ভিডিও গায়েব, হতাহত নিয়েও ধোঁয়াশা
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
তিব্বতে ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেলেও দুর্গত এলাকার প্রকৃত চিত্র খুব একটা সামনে আসছে না। বন্যার ভয়াবহ মুহূর্তের ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য কিংবা হতাহত ও নিখোঁজদের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশে রয়েছে কড়াকড়ি। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে মূলত উদ্ধার তৎপরতার কিছু ছবি ও ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে।
চীনের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট ব্যবস্থার কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বন্যার দৃশ্য ও প্রত্যক্ষ তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ সীমিত। ফলে তিব্বতের দুর্গত এলাকায় আসলে কী ঘটেছে, কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং নিখোঁজদের কী অবস্থা—এসব প্রশ্নের অনেকটাই এখনো অজানা। খবর বিবিসির।
গত বুধবার নেপাল ও তিব্বতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তপথ গিরং বন্দরে হঠাৎ প্রবল স্রোতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে শত শত মানুষকে দ্রুত এলাকা ছাড়তে দেখা যায়। সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা সেই ভয়াবহ দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও তা প্রকাশিত হয়।
কিন্তু চীনের রাষ্ট্রীয় প্রধান সংবাদ বুলেটিনে ওই ঘটনার একটি স্থিরচিত্র ছাড়া তেমন কোনো দৃশ্য প্রচার করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বন্যার ভিডিওগুলোর অনেকগুলো পরে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বন্যার পর তিব্বতের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছাতে উদ্ধারকারীদের কাদা, পাথর ও ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে যেতে হচ্ছে। কোথাও আবার প্রবল স্রোতের নদী পার হয়ে নিখোঁজদের সন্ধান চালাতে হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে উদ্ধারকর্মীদের ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের সন্ধান এবং দুর্গতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে দেখা গেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংও দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
তবে সরকারি প্রচারে উদ্ধার তৎপরতাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। দুর্গত মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা কিংবা নিখোঁজদের পরিবারের পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বাধীন তথ্য খুব কমই প্রকাশ্যে আসছে।
তিব্বতে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে এমন সীমাবদ্ধতা নতুন নয়। চীনা সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে বিদেশি সাংবাদিকদের সেখানে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ সীমিত। সরকারি অনুমতি ছাড়া অঞ্চলটিতে প্রবেশ করাও কঠিন।
ফলে বড় কোনো দুর্যোগের পর ঘটনাস্থল থেকে স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ করা এবং তা প্রকাশ করা সাংবাদিকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
বন্যার পরও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে মূলত উদ্ধার অভিযানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল পাহাড় ও খাড়া ঢাল বেয়ে দুর্গম এলাকায় যাচ্ছে এবং প্রবল স্রোত উপেক্ষা করে নিখোঁজদের সন্ধান চালাচ্ছে।
কিন্তু কতজনকে উদ্ধার করা হয়েছে, কতজন এখনো নিখোঁজ এবং দুর্গত মানুষের জীবনযাপন কী অবস্থায় রয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
তিব্বত দীর্ঘদিন ধরেই বেইজিংয়ের জন্য অত্যন্ত রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল একটি অঞ্চল। ১৯৫০-এর দশকে তিব্বতে চীনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে সেখানে চীনা শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। এসব আন্দোলন দমনের পাশাপাশি তিব্বতিদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে। তবে চীন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
বন্যার পর স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদেরও উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার পাশাপাশি দুর্গত এলাকায় সামাজিক শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা ও জনগণের আস্থা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, চীনা সরকারের বয়ানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করা কিংবা বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার কারণে তিব্বতিদের আটক বা গ্রেফতার করা হতে পারে। এ কারণে দুর্গত এলাকায় থাকা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের পরিস্থিতি জানাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভিডিও সরানোর অভিযোগ
ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন ফর তিবেট (আইসিটি) উদ্ধারকর্মীদের কাজের প্রশংসা করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বন্যার ভিডিও ও প্রত্যক্ষ তথ্য সরিয়ে ফেলার অভিযোগ করেছে।
সংগঠনটি বন্যায় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ এবং যাচাইযোগ্য তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে।
বন্যায় নেপাল ও তিব্বত—দুই অঞ্চলই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তিব্বতের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্যের ঘাটতি তুলনামূলকভাবে বেশি। চীনা কর্তৃপক্ষ হতাহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে কিছু তথ্য প্রকাশ করলেও দুর্গত মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কিংবা ঘটনাস্থলের স্বাধীন ভিডিও প্রায় নেই।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে সাতজনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া পাঁচ শতাধিক মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ফলে সরকারি বিবৃতি ও উদ্ধার অভিযানের খবরের বাইরে তিব্বতের বন্যার প্রকৃত ভয়াবহতা, হতাহতদের পরিচয় এবং নিখোঁজদের পরিণতি সম্পর্কে স্বাধীন তথ্যের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। আর এ কারণেই প্রশ্ন উঠছে—তিব্বতের বন্যায় প্রকৃত মানবিক বিপর্যয়ের কতটুকুই বা বিশ্বের সামনে আসছে?

