ইউনিসেফের প্রতিবেদন
অনলাইনে যৌন নির্যাতনের শিকার ২ কোটি শিশু
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম
প্রায় ২ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশু অনলাইনে যৌন নির্যাতন বা শোষণের শিকার হয়েছে। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্বের ২১টি দেশে এক বছরে প্রায় ২ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশু অনলাইনে যৌন নির্যাতন বা শোষণের শিকার হয়েছে। বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও পূর্ব ইউরোপের ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনে একজনের বেশি অনলাইনে অন্তত একবার যৌন নির্যাতন বা শোষণের অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছে।
২১টি দেশে চালানো এই জরিপে উঠে এসেছে—
- প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ শিশু অনলাইনে অনিচ্ছাকৃত যৌন কনটেন্টের মুখোমুখি হয়েছে।
- প্রায় ৯০ লাখ শিশু যৌন কথোপকথন বা যৌন ছবি পাঠাতে চাপের শিকার হয়েছে।
- প্রায় ৪০ লাখ শিশুর যৌন ছবি তাদের অনুমতি ছাড়াই ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইউনিসেফ বলছে, বিশ্বব্যাপী এমন নির্যাতনের শিকার শিশুর সংখ্যা কয়েক কোটি ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইউনিসেফের মতে, এটি এ ধরনের সবচেয়ে বড় গবেষণাগুলোর একটি। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ২১টি দেশে প্রায় ২১ হাজার ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুর ওপর চালানো জাতীয় পর্যায়ের জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এসব দেশের মধ্যে কেনিয়া, পাকিস্তান, ব্রাজিল ও সার্বিয়াও রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই বেশি নির্যাতন
গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইনে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের প্রায় ৬০ শতাংশ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটেছে। এসব ঘটনার ক্ষেত্রে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট ও টিকটকের নাম উঠে এসেছে।
আর প্রায় ১৪ শতাংশ ঘটনা অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মে ঘটেছে।
ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রামের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটা জানিয়েছে, ইউনিসেফের জরিপের কিছু তথ্য ২০২০ সালের, অর্থাৎ শিশুদের সুরক্ষায় নতুন কিছু ব্যবস্থা চালুর আগের সময়ের।
স্ন্যাপচ্যাট ও টিকটকও জানিয়েছে, শিশু ও কিশোরদের নিরাপত্তার জন্য তারা বিভিন্ন সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছে। এর মধ্যে সন্দেহজনক আচরণ শনাক্ত করা, ক্ষতিকর অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের অ্যাকাউন্টে বাড়তি গোপনীয়তা নিশ্চিত করার মতো পদক্ষেপ রয়েছে।
অপরাধী অনেক সময় পরিচিত মানুষ
প্রতিবেদনটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যগুলোর একটি হলো, অর্ধেকের বেশি ঘটনায় শিশুর পরিচিত কেউ জড়িত ছিল। তাদের মধ্যে বন্ধু, আত্মীয় কিংবা প্রেমিক-প্রেমিকার মতো ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাও ছিলেন।
প্রায় ৩৮ শতাংশ শিশু প্রথমবার অপরাধীর সঙ্গে অনলাইনে পরিচিত হয়েছিল।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, শিশুদের ওপর ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার ১ শতাংশেরও কম পুলিশ, সমাজকর্মী বা সহায়তা সংস্থার কাছে জানানো হয়েছে।
এআই নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে শিশুদের যৌন ছবি বা ভিডিও তৈরি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
নয়টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে ইউনিসেফ অনুমান করেছে, প্রায় ১১ লাখ শিশু জানিয়েছে—এআই ব্যবহার করে তাদের ছবি বা ভিডিওকে যৌন কনটেন্টে রূপান্তর করা হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রযুক্তির মাধ্যমে যৌন নির্যাতন বা শোষণের শিকার শিশুরা অন্য শিশুদের তুলনায় আত্মহত্যার চিন্তা বা আত্মক্ষতির প্রবণতার কথা প্রায় চার গুণ বেশি জানিয়েছে। তাদের মধ্যে উদ্বেগের মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, এসব অভিজ্ঞতা শিশুদের মধ্যে গভীর মানসিক ও আবেগীয় কষ্ট তৈরি করে। অনেক শিশু বিষয়গুলো কাউকে না জানিয়ে নীরবে কষ্ট সহ্য করে এবং কোথায় সাহায্য চাইবে তা বুঝতে পারে না।
কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান ইউনিসেফের
শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ।
সংস্থাটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, এআই দিয়ে তৈরি যৌন কনটেন্টসহ নতুন ধরনের নির্যাতন মোকাবিলায় আইন হালনাগাদ এবং শিশুদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ ও সুরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়েছে।


